ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ৩ কার্তিক ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৮ অক্টোবর ২০১৯

কোরআন হাদিসের বর্ণনায় জান্নাতের নেয়ামত
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
প্রকাশ: রোববার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার ও সৎকর্মশীল মানুষদের জন্য জান্নাতে তৈরি করে রেখেছেন এমন অনিঃশেষ ঐশ্বর্য ভান্ডার, যা মানবজাতির জন্য কল্পনারও ঊর্ধ্বে। যাদের নেকির পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম এবং তারাই এর উপযুক্ততা লাভ করবেন। নেককার নারী-পুরুষ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন, দুই লাইন হয়ে ৭০ হাজার ফেরেশতা তাদের অভ্যর্থনা জানাবেন। ফেরেশতাগণ তাদের জান্নাতের নিয়ামতসমূহ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখাবেন। (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব: ৪/৫০০; হিলয়াতুল আওলিয়া : ২/২৫২; হাদিউল আরওয়াহ : ২০১)
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি জান্নাতে খেজুর ও আঙুরের বাগান তৈরি করেছি, যাতে তারা ফল খেতে পারে এবং তাতে কিছু ঝর্নাধারা প্রবাহিত করেছি। জান্নাতের পাদদেশে রেখেছি প্রবহমান নদী। মুমিনগণ প্রবেশ করবে চিরস্থায়ী জান্নাতে। যেখানে তাদেরকে স্বর্ণের কাঁকন ও মুক্তা ধারা অলঙ্কৃত করা হবে এবং সেখানে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ হবে রেশমের। জান্নাতিগণ এমন জমকালো, দৃষ্টিনন্দন ও নিরাপত্তা ঘেরা প্রাসাদে অবস্থান করবেন যেখানে ফেরেশতা পর্যন্ত বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সুরা হাজ : ২৩; সুরা হাদিদ : ১২; সুরা ইয়াসিন :
৩৪-৩৫; আল্লামা সুয়ূতী, বুদুরুস সাফেরা ফি উমুরিল আখিরাহ : ২১৪৮)
জান্নাতিদের নানা উপাদেয় খাবার রেডিমেড সরবরাহ করা হবে। যদি কেউ শখের বশে চাষাবাদ করতে আগ্রহী হন আল্লাহ তায়ালা তার ইচ্ছেও অপূর্ণ রাখবেন না। চাষাবাদের অনুমতি প্রার্থনা করলে আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি যা চাও তা পাচ্ছ না? জান্নাতি ব্যক্তি জবাব দিবেন, জি হ্যাঁ, পাচ্ছি। তবে আমি চাষাবাদের ইচ্ছে পোষণ করি। তখন তিনি জান্নাতের মাটিতে বীজ বপন করবেন। মুহূর্তের মধ্যে চারা গজাবে, গাছ বড় হবে, ফল ধরবে, কাটতে পারবেন। (বুখারি : ২১৯৪)
জান্নাতবাসীদের প্রদত্ত প্রাসাদে চারটি ফটক থাকবে। একটি দিয়ে ফেরেশতগণ প্রবেশ করবেন। দ্বিতীয় ফটক দিয়ে নীলনয়না হুরগণ প্রবেশ করবেন। তৃতীয় ফটক দিয়ে জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করা যাবে। তবে এটা বন্ধ থাকবে। ইচ্ছে করলেই খুলে দেওয়া হবে। চতুর্থ ফটক দিয়ে দারুসসালাম যাওয়া যাবে। সেখান থেকে যেকোনো সময় আল্লাহ তায়ালার দিদার নসিব হবে। (আবু নুয়াইম, সিফাতুল জান্নাহ : ১৭৪)। জান্নাতের প্রাসাদে প্রবেশের জন্য চাবির প্রয়োজন হবে না। সামনে দাঁড়ালেই গেট ও দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে। পার্থিব জীবনে যারা কালিমার শাহাদাত দিয়েছেন, অজু করেছেন, নামাজ আদায় করেছেন, আল্লাহর পথে জিহাদে শরিক হয়েছেন, দরিদ্র ও দুস্থদের যারা ভালোবাসেন এবং নিয়মিত ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ জিকির করেছেন, এই নেক আমলগুলোই জান্নাতের চাবি। (মুসনাদে আহমদ : ২/২৪২; সিফাতুল জান্নাহ : ২/৪০; তাজকিরাহ আল কুরতুবি : ২/৫২১) 

স্বীয় নেককার স্ত্রীদের নিয়ে সফলকাম ব্যক্তিগণ জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আল্লাহ তায়ালা জান্নাতিদের জন্য বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। অপূর্ব সুন্দরী ডাগরচোখা হুরগণ সবুজ বালিশ ও মনোমুগ্ধকর কারুকার্যখচিত গালিচার ওপর হেলান দেওয়া অবস্থায় থাকবে যাদেরকে ইতোপূর্বে কোনো মানব বা জিন স্পর্শ করেনি। তাদের সঙ্গে জান্নাতিদের বিয়ে হবে। প্রবাহিত ঝর্নাধারার মদিরপূর্ণ পানপাত্র নিয়ে তারা উপস্থিত থাকবে। তা পানে না তাদের মাথা ব্যথা করবে, আর না মাতাল হবেন। পাখির গোশত ও পছন্দের ফলমূল নিয়ে হুরগণ ঘোরাফেরা করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি হুরদের বিশেষভাবে জান্নাতিদের জন্য তৈরি করেছি। তারা হবে কুমারী, সোহাগিনী ও সুরক্ষিত মুক্তার মতো দৃষ্টিনন্দন। (সুরা ওয়াকিয়া : ১৬-৩৮; সুরা আর রহমান : ৭৫-৭৬; সুরা তূর : ২০)
জান্নাতে নাশিদ, গীত, কবিতাপাঠ ও আবৃত্তির আসর বসবে। হুরগণ সুরের লহরি তুলে এগুলো পরিবেশন করবে। তারা গাইবে, ‘আমরা চিরদিন তোমাদের কাছে থাকব, কখনও ধ্বংস হব না। আমরা চির আনন্দে থাকব, কখনও দুর্দশায় পড়ব না। আমরা সর্বদা সন্তুষ্ট থাকব, কখনও সন্দিগ্ধ হব না। সুতরাং ধন্য ওই ব্যক্তি যে আমাদের পাবে এবং আমার যাকে পাব।’ জান্নাতের হুরদের মাসিক রজঃস্রাব নেই। মুখে দুর্গন্ধ ও পেটে ময়লা নেই। এরা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন। জাফরান ও গোলাপ থেকে আল্লাহ তায়ালা তাদের তৈরি করেন। জান্নাতের ভাষা হবে আরবি। পুরুষের মুখে দাড়ি, বগল ও নাভির নিচে পশম থাকবে না।’ (তিরমিজি : ২৭৬৩; তারিখে বাগদাদ : ৭/৯৯; ইবন আবিদ্দুনিয়া : ৩৪৮; মুসনাদে আহমদ : ৫/২৪৩)
জান্নাতে রয়েছে নেয়ামতের বিভিন্ন স্তর ও সুযোগ-সুবিধা। সম্মানিত নবী, রাসুল, সাহাবায়ে-কেরাম, আল্লাহর পথের শহীদ, মুজাহিদীনে ইসলাম ও সত্যবাদীগণ উচ্চতর মর্যাদার নেয়ামত লাভ করবেন। অতঃপর ওলামা, ফকিহ, মুহাদ্দিস, পীর-মাশায়েখ, বুজুর্গানে দ্বীন ও নেককার বান্দাগণকে তাদের মরতবা অনুযায়ী জান্নাতের নেয়ামত প্রদান করা হবে। নিম্নস্তরের জান্নাতিকে প্রদান করা হবে পৃথিবী সমান জায়গা। যেখানে পূর্বদিকে সূর্য উদিত হতো আর পশ্চিমে সূর্য অস্ত যেত। আশি হাজার সেবক ও ৭২টি হুর প্রদান করা হবে। মণি-মুক্তার তৈরি প্রাসাদ দেওয়া হবে সাতটি। যা খেতে চাইবেন ইশারা করার সঙ্গে সঙ্গে পেশ করা হবে। (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ : ১০/৪০১; তাজকিরাহ আল কুরতুবি : ৪৯১; ইবনে হিব্বান : ৭৩৫৮) নিম্নস্তরের জান্নাতি যদি এই নেয়ামত ভোগ করে তাহলে উচ্চস্তরের জান্নাতবাসীর নেয়ামতের কী তুলনা হতে পারে?
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গণি এমইএস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম

আগামী সপ্তাহে পড়ুন- ‘যে আমলে জান্নাতে প্রাসাদ তৈরি হবে’







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ।
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]