ই-পেপার রোববার ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৭ নভেম্বর ২০১৯

মতিঝিলের ত্রাস আজাদ
টোকাই থেকে কোটিপতি
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৪.১০.২০১৯ ৩:০৪ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 540

মতিঝিলের ত্রাস আজাদ

মতিঝিলের ত্রাস আজাদ

মতিঝিলে নিজস্ব বাহিনী,
প্রতিবাদ করলেই চলে নির্যাতন
অফিসে চলে মাদকসেবন,
নতুন ভবন তুললেই চাঁদা দাবি
আজাদের ভাই সোহেল চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী

মতিঝিলের ত্রাস শ্রমিক লীগের নেতা আবুল কালাম আজাদ। তার কথাতেই সব হয়। তাকে চাঁদা না দিলে কেউ কিছুই করতে পারে না। নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন দোকান চালু ও ফুটপাথে দোকান বসাতে চাইলে তাকে নজরানা দিতে হয়। সঠিক সময়ে তার লোকজন গিয়ে হাজির হয়। দিতে হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা। চাঁদা তোলার জন্য রয়েছে তার নিজস্ব একটি বাহিনী। যাদের কাজই হলো কোথায় নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে, দোকান বসছে এসব তদারকি করা ও চাঁদা তোলা। তার লোকজনকে চাঁদা না দিলেই বিপদ। প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। আর এসব চলছে দীর্ঘদিন থেকে। মতিঝিলের ত্রাস ও হকারদের কাছে আতঙ্ক আজাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। আজাদ শুধু চাঁদাবাজিই নয়, ওই এলাকায় ছিনতাই-চুরি ও মাদক ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করে।

আজাদ বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৮নং ওয়ার্ডের শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছে। এক সময় টোকাই ছিল এই আজাদ। রাস্তায় প্লাস্টিক বোতল কুড়িয়ে বেড়াত। তা বিক্রি করে যা পেত তাতেই চলত তার খাওয়া-দাওয়া। ঘুমাতও রাস্তায়। করত ছিঁচকে চুরি ও ছিনতাই। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে শ্রমিক লীগ নেতা হয়ে সে এখন কোটিপতি বনে গেছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় জমি কিনে করেছে দোতলা বাড়ি। ব্যাংকেও রয়েছে তার কোটি কোটি টাকা। মূলত মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করে গড়েছে টাকার পাহাড়।

আবুল কালাম আজাদের উত্থান : মতিঝিলে এখনও আজাদকে সবাই টোকাই আজাদ ও চোরা আজাদ হিসেবেই বেশি চিনে থাকে। আজাদ এক সময় মতিঝিল শ্রমিক লীগের নেতা হারুনের পেছনে ঘুরত। পরবর্তী সময়ে তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আজাদের উত্থান হয়। হারুনকে হত্যার পর চাপ প্রয়োগ করে তার স্ত্রীকে বিয়েও করে। এ ছাড়াও তার একাধিক স্ত্রী রয়েছে বলে জানা গেছে। এখন সেই আজাদের প্রতি মাসে কোটি টাকা আয় আর লাখ টাকা ব্যয়।

শ্রমিক লীগের কার্যালয়ে মাদকের আখড়া : বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে তার একটি নিজস্ব অফিস রয়েছে। সেই অফিসেই তার নেতাকর্মী ও বিভিন্ন সন্ত্রাসীকে নিয়ে আড্ডা দেয় এবং সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় মাদকসেবন। সেখানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা ছাড়াও কথিত সাংবাদিকও গিয়ে সেখানে মাদকসেব করে।

মতিঝিল থানার এক পুলিশ সদস্য জানায়ন, মতিঝিলের বিভিন্ন অলিগলিতে মাদক বাড়ছে। কিন্তু আজাদের কারণে সেটি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তাকে কিছু বললেই সে ওপর লেভেলের নেতাদের নিয়ে চাপ দেয়। আজাদ মাদক ব্যবসা না করলেও তার ছোটভাই সোহেলকে দিয়ে তা চালায়। সোহেল মতিঝিলের সবধরনের মাদক সরবরাহের প্রধান এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। সোহেলের হাত ধরেই মতিঝিলের প্রতিটি এলাকায় ইয়াবা ও মদ সরবরাহ করা হয়।

ভবন নির্মাণ হলেই চাঁদা দিতে হয় আজাদকে : মতিঝিল এলাকায় ছিনতাই, চুরি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অন্যতম হোতা এই আজাদ। মতিঝিলের ব্যাংকপাড়ায় প্রতিটি ব্যাংকের টেন্ডার হওয়ার সময় ঠিকাদারকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে আজাদ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে একটি ভবন নির্মাণ হচ্ছে। সেটি আজাদ দেখভাল করছে। তবে মতিঝিলপাড়ায় কোনো ভবন নির্মাণ হলেই তার লোকজন সেখানে গিয়ে ভিড় জমায় এবং চাঁদা না দিলে ভবন নির্মাণ করতে দেয় না। আজাদ মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনো চালানোর নেপথ্যে কাজ করত। এসব নিয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও কেউ কিছু বললে পাত্তা দিত না।

মতিঝিলবাসী অনেকে বলেছে, আজাদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ তারা। মতিঝিল এলাকায় কোনো নতুন ভবনের কাজ চালু হলে বা নতুন দোকান চালু হলেই তাকে এককালীন চাঁদা দিতে হয়। শ্রমিকের ফান্ডের টাকা বলে এসব টাকা তোলা হয়। বিষয়গুলো মতিঝিল ও গোপীবাগ এলাকায় ওপেন সিক্রেট। কিন্তু কেউ ভয়ে কথা বলে না। কারণ তার সঙ্গে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও সম্রাটের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কেউ কিছু বললেই সে তাকে নানাভাবে হয়রানি করে। ৮নং ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় অভিযানের পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছে। তবে কোথায় আছে তার দলের নেতাকর্মীরা তা জানাতে পারেনি। এক সময় টোকাই থাকলেও পরে সে চুরিতে জড়িয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগে মতিঝিল থেকে দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকার এক ফটোসাংবাদিকের মোটরসাইকেল চুরি করে আজাদ। পরে সিসি টিভিতে সেই চুরির দৃশ্য ধরা পড়ে।

ফুটপাথ, বাজার ও লেগুনায় চাঁদাবাজি : আজাদ মতিঝিলের হকারদের কাছে আতঙ্ক। মতিঝিলপাড়ার মুরগি ও সবজি বিক্রেতাদের কাছ থেকে জোর করে মুরগি ও সবজি নিয়ে যায় সে। এসব দিয়ে নৌকাঘাঁটিতে প্রতিদিন চলে ভুঁড়িভোজ। এই ভুঁড়িভোজে অংশ নেয় তার দলের নেতাকর্মীরা। জোর করে সবজি ও মুরগি নিয়ে আসায় কেউ বাধা দিলে তাকে ধরে নিয়ে যায় মতিঝিলের শ্রমিক লীগের অফিসে। এরপর সেখানে ঢুকিয়ে প্রচণ্ড মারধর করে ছেড়ে দেওয়া হয়। মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষিণদিকে বসা মাছের বাজার থেকে প্রতিদিন চাঁদা তোলে তার লোকজন। আর এটি চলছে প্রায় ৯ বছর ধরে। প্রতি দোকান থেকে ৫০০-৭০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। প্রতি মাসে মাছের বাজার ও কাঁচাবাজার থেকেই অন্তত ৫ লাখের বেশি টাকা ওঠানো হয়। আজাদ মূলত মতিঝিল এলাকার প্রতিটি সরকারি ভবন, ব্যাংক কলোনি, সেনাকল্যাণ ভবনের সামনের ফুটপাথ ও লেগুনার স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি করেই চলে। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করে প্লাবন সরকার নামে এক যুবক। সেই মূলত এসব চাঁদার টাকা তাকে তুলে দেয়। আজাদ চাঁদার টাকায় এই সরকারের আমলে যাত্রাবাড়ীর কাজলায় অন্যের জায়গা দখল করে বানিয়েছে দোতলা একটি বাড়ি।

এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, কোনো দোকান বসাতে হলে আজাদের আগে অনুমতি নিতে হয়। তারপর তার লোকরা এসে জায়গা ঠিক করে দেয়। প্রতিদিন বসা বাবদ ও দোকানের জায়গা বাবদ তাকে এককালীন চাঁদাও দিতে হয়। আরেক মাছ ব্যবসায়ী জানান, আমরা তার কারণে অতিষ্ঠ। ভয়ে কিছুই বলতে পারি না। মতিঝিল ছাত্রলীগের এক নেতা জানান, আজাদ চাঁদাবাজি করে এটা ঠিক এটা শতভাগ সত্য। সে চাঁদার টাকাতেই চলে। এক সময় সে টোকাই ছিল। তার কিছুই ছিল না। কিন্তু এখন তার কোটি টাকা, বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। দক্ষিণ কমলাপুর ও গোপীবাগ তার এলাকা। এই সব এলাকায় তার নিয়ন্ত্রণ। গোপীবাগ রেলগেটে তার একটি অফিসও রয়েছে। সেখানেই সে বসে। মতিঝিল ও গোপীবাগ এলাকা থেকে তোলা চাঁদার টাকা ওই অফিসে বসেই ভাগাভাগি করা হয়।

আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আজাদ এমন কোনোভবন নেই, রাস্তা নেই যেখান থেকে সে ও তার লোকরা চাঁদা না তোলে। চাঁদা তুলেই তার মাসিক আয় প্রায় কোটি টাকা। এক সময় টোকাই থাকলেও এখন সে ভালো পোশাক পরে। দামি গাড়িতে ঘোরে। জমি কিনে বাড়িও করেছে। এসব পুলিশ জানে; কিন্তু কিছু বলে না। কারণ সে চাঁদার টাকা পুলিশকেও দেয়।

মতিঝিলের শ্রমিক লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যায় গোপীবাগ রেলগেটের পাশে থাকা তার অফিসে টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়। সাধারণত দুপুরের পর থেকে মতিঝিল এলাকায় ভাসমান দোকানগুলো থেকে চাঁদা তোলে আজাদের লোকজন। আজাদ চাঁদাবাজি করে আজ কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। তার চলাফেরাই পাল্টে গেছে। আজাদ যে একজন চিহ্নিত খুনি ও চাঁদাবাজ এটা মতিঝিল আওয়ামী লীগের নেতারাও জানেন। কিন্তু তার দাপটের কারণে কেউ মুখ খোলে না। এ বিষয়ে মতিঝিল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মিশু বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]