ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

দুর্বৃত্ত ও ধান্দাবাজ ছাড়া সকলেই কবি : সাযযাদ কাদির
তাজিমুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 24

ভাবনায় ছিলেন অত্যন্ত বলিষ্ঠ। সেই সঙ্গে ছিলেন স্পষ্ট উচ্চারণের এবং সময় সচেতন একজন কবি। তাই হয়তো ৬৫তম জন্মদিনের সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশের মিথ হয়ে ওঠা কথাটির ঠিক উল্টো কথাÑ ‘সকলেই কবি, কেউ কেউ কবি নয়।’ কারণ বহুমাত্রিক লেখক সাযযাদ কাদির বিশ্বাস করতেন দুর্বৃত্ত ও ধান্দাবাজ ছাড়া সকলেই মানসিকভাবে কবি। শুধু প্রকাশের ভঙ্গিমা আলাদা। তাই তার স্বপ্ন ছিল বিশ্ব কবিতা দিবসের মতো ‘বাংলা কবিতা দিবস’ নামে একটি দিন চিরভাস্বর থাকুক। যে দিনটি ভবিষ্যতে হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সকল কবি ও কবিতার।
সাহিত্যের এই সার্বজনীন চেতনাকে লালন করার তীব্র ইচ্ছা ও ভালোবাসা থেকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলা ভাষা সাহিত্য
সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র’। সাল ২০০৪। সেই সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন আশ্বিন মাসের প্রথম দিনটি হবে ‘বাংলা কবিতা দিবস’। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাল্যবন্ধু এবং ষাট দশকের অন্যতম কবি সাযযাদ কাদির তার ওই স্বপ্নকে রূপ দিতে যথেষ্ট উদ্যোগী ছিলেন। তেমনি আশাবাদীও ছিলেন। তাই, শুরুতে কবি শাহীন রেজার ‘বৈচিত্র্য’ পত্রিকা অফিসে এবং গাজীপুরের নয়নপুরে মুক্ত
প্রকৃতির মাঝেÑ দুজায়গায় ‘বাংলা কবিতা দিবস’ পালিত হতো। (সূত্র : নুর কামরুন নাহারের স্মৃতিলিখন)
কবি বেঁচে থাকাকালীন খুব ধুমধাম করে পালিত হতো দিনটি। কিন্তু ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল অকস্মাৎ মৃত্যু তার সেই স্বপ্নকে অনেকটা থমকে দিয়েছে। ফলে বর্তমানে ‘বৈচিত্র্য’ অফিসে দিনটি আগের মতো পালিত হয় কি না জানা নেই। তবে নয়নপুরে আজও দিনটি কবিকে শ্রদ্ধায়, স্মরণে প্রতিবছর কার্তিক মাসের দ্বিতীয় শনিবার পারিবারিক সদস্যদের উপস্থিতিতে পালন করা হয়। উপস্থিত থাকেন দেশ-বিদেশের কবিবন্ধুরা। কবিতা পাঠ, আলোচনা, সঙ্গীত, আবৃত্তির মাধ্যমে কবি সাযযাদ কাদিরকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ বছরও ২৬ অক্টোবর নয়নপুরে ‘বাংলা কবিতা দিবস’ অতীতের মতো পালিত হয়েছে।
বাংলাদেশের ষাট দশকের কবিতার কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মোহাম্মদ রফিক, হেলাল হাফিজ, মুহাম্মদ নুরুল হুদা, আসাদ চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক, হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসান, অরুণাভ সরকার প্রমুখের নাম। একই সঙ্গে কবি সাযযাদ কাদিরের নামও উচ্চারিত হবে। কারণ তিনি এই দশকের অন্যতম একজন কবি। যার কবিভাবনায় বারবার ঘুরেফিরে আসে দেশপ্রেম, সমাজ, অর্থনীতি, মননশীল প্রকৃতি, স্বপ্নভঙ্গের আলোছায়া। যে বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে কবির শিল্পিত উচ্চারণ ডানা মেলে আছে তার কবিতার ছত্রে ছত্রে। ৭০ বছরের জীবনের (জন্ম ১৯৪৭, মৃত্যু ২০১৭) ঘাত-প্রতিঘাতে তিনি চিরকাল মাথা উঁচু করে চলেছেন। আপস করেননি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে। তাই হয়তো যোগ্যতা থাকা সত্তে¡ও তিনি অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিশেষ করে সরকারি সান্নিধ্য। অবশ্য তাতে তার কিছু যায় আসেনি। তার কবিতায় তেমনই উচ্চারণ, ‘তাই তো সকল রকম সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে/সে থাকে অবিচলÑ/না হয় নতজানু, না করে মাথা নিচু।’ (অন্য একজন)। আসলে সাযযাদ কাদির বহুমাত্রিক লেখক হলেও আদন্ত কবি। এই বিশ্বাসে তিনি দৃঢ় ছিলেন বলে সর্বদা কবির ধর্ম পালন করেছেন। নিজেকে সবসময় আপসহীন রেখেছিলেন। জীবন একদিন ফুরাবে, অনেক রক্ত ঝরবে তা তার অজানা ছিল না। তবুও অন্যায়ের সঙ্গে কখনও হাত মেলাননি। তাই ‘কবিসারভৌম’ কবিতায় তার দীপ্ত উচ্চারণ, ‘আমি কবি, কোন ঘাতকের সঙ্গে/করমর্দন করি না, কোন বিষকন্যার ঠোঁটে চুম্বন আঁকি না।/আমি কবি, আমার জীবন ফুরায়/আমার রক্ত ঝরে...’। তার এই কবিত্বকে কুর্নিশ জানিয়ে বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি-কলম’-এর মূল্যায়ন, ‘কবি হিসেবে বাংলা ভাষাভাষী স্বাধীনতা পর্বের পাঠক-লেখক শ্রেণিতে তার রয়েছে সর্বোচ্চ সম্মানের আসন।’
ভালোবাসার কাছে ধরাশায়ী হতে চেয়েছেন ক্ষণে ক্ষণে। কিন্তু পূর্ণতার থেকে বিচ্ছেদ বেদনার দহনে পুড়েছেন তিনি বেশি। ফলে শামীমা চৌধুরী কিংবা মণিমালা তার কাছে বারে বারে এলেও কেউই কবির সঙ্গে থাকেননি। কেউই তার আশ্রয় বা ছায়া হয়ে ওঠেননি। আবার দেশকে কেন্দ্র করে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেখানেও তিনি হতাশ। সকল মানুষের পরম শান্তির আশ্রয় হিসিবে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাও পূর্ণ হয়নি। তাই তীব্র বেদনাবোধে ক্লান্ত কবি একটু শান্তি, স্বস্তির খোঁজে সর্বদা আক‚ল ছিলেন। আদৌ পেয়েছিলেন কি! তার কথায়, ‘ছায়া কোথায়? হাত পা ছড়িয়ে উদোম হয়ে/রোদ্দুর শুয়ে আছে সবখানে/কাল রাতে বৃষ্টি ছিল, আজ ছিটেফোঁটা নেই/গাছের পাতায়।/পলাতক সব মেঘ।/হাওয়াও নেই আজ। তাই/কোথায় পাবে একটু স্নিগ্ধময়তার ছোঁয়াছুঁয়ি?/কিছুটা সুশীতল আরাম?’ (সামনে রোদ্দুর)। চিরকাল একাকী যাপনে অভ্যস্ত কবি সাযযাদ কাদির তার কবিতা নিয়ে খুব স্পষ্ট ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতায় ভাব, ভাষা ও নির্মাণে তিনি নতুনত্ব এনেছিলেন। ফলে সমকালে না হোক পরবর্তীতে তার লেখা পাঠকসমাদর থেকে বঞ্চিত হবে না। তাই বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার মূল্যায়ন, ‘দীর্ঘ সৃষ্টি জীবনে সাযযাদ গদ্যে পদ্যে ফসল ফলিয়েছে বিচিত্রমুখী। পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। সর্বাধিক শনাক্তযোগ্য মনে করি তার আবেগ ও ভাষার পরিশীলন। মননকে মননশাসিত করে ভাষাকে স্বমুদ্রায় বশীভ‚ত রাখার এক কুশলী শিল্প তার পরিচর্চ-লব্ধ।’ আর নাহিদ আহসান মনে করেন, ‘সাযযাদ কাদিরের কবিতা সংগ্রহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো শিল্পবেড়ি পরে তারা পথ হাঁটে না। তিনি ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন কাব্যভাষা নিয়ে, পরিবর্তন করেছেন শৈল্পিক নকশা। কখনও সাংকেতিকতার ছায়া পড়েছে তার কবিতায়, কখনও আবার এই সব কবিতা সরল আবেগে, সোজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাছে ডেকে নিয়েছে।’
বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা থাকলেও তাকে দেওয়া হয়নি কেন তা অজ্ঞাত আজও। এ নিয়ে তার বেদনা থাকলেও কখনও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে তার বাইরেও তিনি একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। যেমন, বাচসাস পুরস্কার (২০০২), এম নুরুল কাদের পুরস্কার (২০০৪), ভাষাসৈনিক শামসুল হক পুরস্কার (২০০৮), বিষ্ণু দে পুরস্কার (২০১০), টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ পুরস্কার (২০১৩) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাই বলা যায়, বাংলাদেশের কবিতা চর্চায় কবি সাযযাদ কাদির নিঃসন্দেহে একজন উল্লেখযোগ্য কবি হয়ে আগামী দিনে চর্চিত হবেন।
ষ কবি





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]