ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

তবুও চাই প্রশান্তি বিমল গুহর কবিতা
শিহাব সরকার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 23

এসএসসি পরীক্ষার পর অখÐ অবসরের দিন। সে সময় সদ্য কৈশোর পেরোনো বিমল গুহ এক অলস বিকেলে লিখে ফেললেন, ‘সীমাহীন আকাশের রঙ ঘন নীল/ চারদিকে ছেয়ে আছে সে রঙের মিল...।’ সময়টা ১৯৬৮। সেই থেকে তার কবিতাযাত্রা শুরু। অবশ্য অবচেতনায়। কারণ ওই স্মরণীয় বিকেলের পর থেকে তেমনভাবে আর কবিতায় ডুবে যাননি। পরপর এসে গেল ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন, তার দু’বছরের মাথায় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধÑ যাতে একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিমল যোগ দিয়েছিলেন। তিনি তখন পাক হানাদার বাহিনীর আক্রমণে স্বদেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতের উদ্বাস্তু শিবিরে।
স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের দু’বছর পর বিমল তার অবচেতনায়Ñ লুকানো কবিতার প্রতিধ্বনি অনুভব করলেন অস্তিত্বের ভাঁজে ভাঁজে। যেন হঠাৎ জেগে উঠে তিনি আবিষ্কার করলেন, কবিতাই সত্য, আর সবকিছুর টান মিথ্যা। চট্টগ্রামবাসী বিমল ঢাকায় এসে পুরোপুরি ডুবে গেলেন কবিতায়। তখন সত্তর দশক শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে প্রায়।
সাধারণত কৈশোরের আবেগ এবং উচ্ছ¡াস থেকে যেসব রচনা কবিতার আকারে লেখা হয়, তার সজীব ও টগবগে রেশ পরবর্তীকালে কবিতা থেকে হারিয়ে যায়। অনেক কবি প্রথমদিকের কবিতাগুলো মুখস্থ থাকলেও বাইরে উচ্চারণ করতে সংকোচ বোধ করেন। বিমলও তার প্রাথমিক জীবনমুগ্ধতা থেকে সরে এসে পরের তিনটি দশকে পরিণত ও বিচক্ষণ হয়েছেন। বাহ্যিক নানা ঘটনার অভিঘাতে তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন, মর্মমূল ক্ষতবিক্ষত হয়েছে নানা বাস্তব-পরাবাস্তব নির্যাতনে। প্রথম কবিতা রচনার বত্রিশ বছর পর তিনি লিখছেনÑ

‘কতদূর নিয়ে যাবে আর? কি দুঃসহ
সময় যাপন নিশিদিন, দুঃসংবাদ অহরহ
মাথার ভিতর জটাজাল বানিয়ে চলেছে, তবুও সাহসে
মাথা তুলি আকাশের দিকে...।’
[কতদূর নিয়ে যাবে আর : প্রতিবাদী শব্দের মিছিল]

কৈশোরের মেদুর প্রসন্ন বিকেল থেকে কী এক দুঃসহ সময়ে পতিত হয়েছেন কবি। এ রকম কবিতা আছে তার অধিকাংশ গ্রন্থে। কিন্তু এর পরও জীবনের নানা ঝড়ঝাপটা, প্রতিক‚লতা পেরিয়ে আসা সত্তে¡ও, বিমল গুহ বিস্ময়করভাবে রয়ে যান জীবনের সঙ্গে তীব্র ভালোবাসায় জড়ানো এক প্রশান্ত মেজাজের কবি। চরম কিছু তার স্বভাবে স্থান পায় না; নিসর্গ ও নারীর ¯িœগ্ধ দিকে এবং নির্বিবাদ, রৌদ্র¯œাত মানব অস্তিত্বের বন্দনার দিকে তার ঝোঁক বেশি। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতো পরম ও চ‚ড়ান্ত শান্তিই তার আরাধ্য।
আজকের পঞ্চাশে পা-দেওয়া বিমল গুহর কবিতা-শরীর ও তার আত্মার বীজ রোপিত হয়েছিল সুদূর ১৯৬৮ সালের এক অলস বিকেলে। তিনি খাঁটি কবি। জীবনের সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে তিনি স্থান দিয়েছেন কবিতাকে। তাঁর ছয়টি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পড়লে এটা ক্রমশ পরিষ্কার হয়। যদিও বিচিত্র বিষয় নিয়ে বিমল কবিতা লিখেছেন, মাঝে মাঝেই কবিতার আঙ্গিক বদলেছেনÑ তবুও তিনি আমাদের চোখে রয়ে যান এক নিভৃতচারী, ভিতরসন্ধানী কবি।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপর যে ফলবান দশকটি বাংলা কবিতাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই আলোড়িত সময়ের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি বিমল গুহ। তার কণ্ঠ ও কবিতার স্বভাব তার সমসাময়িক অনেক কবির চেয়ে পৃথক, তবুও সত্তরের রোমান্টিক ধারাটির পুরোভাগে রয়েছে যেসব শক্তিমান কবি, বিমল গুহ তাদের অন্যতম। শুধু সত্তরেই তাকে সীমাবদ্ধ রাখি কেন, বিমল গুহর নাম আজ নিঃসন্দেহে বৃহত্তর বাংলা কবিতার প্রেক্ষাপটে আমরা উচ্চারণ করতে পারি।
২.
১৯৭৭-৭৮ সালের কথা। আমি তখন সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর সঙ্গে জড়িত। এক দুপুরে বিনীত, সলজ্জ ভঙ্গিতে একজন একহারা যুবক আমার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি প্রশ্ন চোখ তুলতে উনি বললেন, ‘আমার নাম বিমল গুহ।’ আমি বিচ্ছিন্নভাবে বিমলের কবিতা পড়েছি। উচ্ছ¡াসের সঙ্গে সে কথা বললাম। বিমলের মুখে চাপা খুশি। সেই থেকে বিমলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক, যা ক্রমশ গাঢ় হয়েছে পরবর্তী বছরগুলোতে।
একটা সময়ে আমি ঘন ঘন চাকরি বদলেছি। কিন্তু যে অফিসেই গেছি, বিমল তার ঠিকানা জোগাড় করে চলে এসেছেন। বিমল খুব আড্ডাবাজ নন। আমিও নই। দুজনই স্বল্পবাক, ঝুটঝামেলা এড়িয়ে চলি। হয়তো স্বভাবের এই সাদৃশ্যগুলো আমাদের বন্ধুত্বকে গভীরতর করেছে। বহুদিন গেছে, আমি নিউ নেশন-এ আমার রুমে কাজ করছিÑ বিমল আমার সামনে বসে আছেন দীর্ঘ সময় ধরে। সিগারেট খাচ্ছেন একটার পর একটা। মাঝে মাঝে সাহিত্যের কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করছেন, আমি মাথা তুলে জবাব দিচ্ছি, আবার কাজে ডুবে যাচ্ছি, নয়তো প্রেসে দৌড়াচ্ছি। বিমল কিন্তু কোনো রকম বিরক্তি না দেখিয়ে বসেই আছেন। আমার কাজ শেষ হওয়ার পর দুজন বেরোতাম। হাঁটতাম টিকাটুলি বা বঙ্গভবনের পাশের রাস্তায়। গল্পের বিষয় থাকত সাহিত্য।
একজন ভালো ও স্থায়ী বন্ধু হওয়ার সবগুলো গুণ বিমলের মধ্যে আছে। ওর হৃদয় উষ্ণ, সদালাপী, পরচর্চা করেন না, আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেনÑ অর্থাৎ কাউকে বন্ধু হিসেবে বুকে টেনে নিয়ে দুদিন পর তুচ্ছ কারণে ওর ব্যাপারে চোখ উলটে ফেলেন না, পরমতসহিষ্ণু পরোপকারী এবং সব সময় মানুষের মঙ্গল চান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। এটা অনেকের ক্ষেত্রে হয়। মনস্তত্ত¡বিদদের মতে, এর অন্যতম কারণ তথাকথিত বন্ধুদের ঈর্ষা। ঈর্ষাবোধ বন্ধুত্বকে হত্যা করে। ভাবতে ভালো লাগে, দীর্ঘ চব্বিশ বছরে বিমলের সঙ্গে আমার সামান্যতম মনোমালিন্যও হয়নি। এখন দেখছি, আমার যে ক’জন প্রকৃত বন্ধু রয়েছেন আজও, বিমল গুহ তাদের একজন। বিমল দীর্ঘায়ু হোন।
কবি





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]