ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

সুকুমার রায় : একের মধ্যে অনেক
সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান
প্রকাশ: শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 110

শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার সুকুমার রায় বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে বলা হয়ে থাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা বাঙালি শিশুসাহিত্যিক। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্য রচনাকার, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। এ ছাড়াও তিনি বাংলায় ননসেন্স সাহিত্যের জনক।
সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালের ৩০ অক্টোবর কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্ম পরিবারে। তার পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক। মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের নেতা দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কন্যা। সুকুমার রায় জন্মেছিলেন বাংলার নবজাগরণের স্বর্ণযুগে। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্য অনুরাগী। যা তার সাহিত্যিক প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়। পিতা উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন শিশুতোষ গল্প ও জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক, চিত্রশিল্পী, সুরকার ও শৌখিন জ্যোতির্বিদ। উপেন্দ্রকিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যার প্রভাব সুকুমারের ওপর পড়েছিল। এ ছাড়াও রায় পরিবারের সঙ্গে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখের সম্পর্ক ছিল। উপেন্দ্রকিশোর ছাপার ব্লক তৈরির কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং মানসম্পন্ন ব্লক তৈরির একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। মেসার্স ইউ রয় এন্ড সন্স নামে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুকুমার যুক্ত ছিলেন।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৬ সালে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায় অনার্সসহ বিএসসি করার পর সুকুমার রায় মুদ্রণবিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১৯১১ সালে বিলেত যান। সেখানে তিনি আলোকচিত্র ও মুদ্রণ প্রযুক্তির ওপর পড়াশোনা করেন এবং কালক্রমে ভারতের প্রথম সারির আলোকচিত্রী ও লিথোগ্রাফার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯১৩ সালে সুকুমার কলকাতায় ফিরে আসেন। সুকুমারের ইংল্যান্ডে অধ্যয়নকালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী উন্নতমানের রঙিন হাফটোন ব্লক তৈরি ও মুদ্রণক্ষম একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। এ সময় তিনি ছোটদের জন্য ‘সন্দেশ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন। সুকুমার তাতে নিয়মিত লিখতেন। সুকুমারের বিলেত থেকে ফেরার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পর সন্দেশ পত্রিকা ও পারিবারিক ছাপাখানা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তার ছোট দুই ভাই ও পরিবারের সদস্যরা তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন এবং সন্দেশের নানাবিধ রচনা করে তার পাশে দাঁড়ান।
সুকুমার রায়ের স্বল্পস্থায়ী জীবনে তার প্রতিভার শ্রেষ্ঠ বিকাশ লক্ষ করা যায়। সন্দেশের সম্পাদক থাকাকালে তার লেখা ছড়া, গল্প ও প্রবন্ধ আজও বাংলা শিশুসাহিত্যে মাইলফলক হয়ে আছে। তার বহুমুখী প্রতিভার অনন্য প্রকাশ তার অসাধারণ ননসেন্স ছড়াগুলো। তার প্রথম ও একমাত্র ননসেন্স ছড়ার বই আবোল-তাবোল শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ^সাহিত্যেও অনন্য। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি ননসেন্স ক্লাব নামে একটি সংঘ গড়ে তোলেন। এর মুখপত্র ছিল সাড়ে বত্রিশ ভাজা নামে একটি পত্রিকা। সেখানেই তার
আবোল-তাবোল ছড়ার চর্চা শুরু। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর মন্ডা ক্লাব (মানডে ক্লাব) নামে একই ধরনের আরেকটি ক্লাব গড়েন তিনি।
ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের বিষয়ে কয়েকটি বক্তৃতাও দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তখনও নোবেল পুরস্কার পাননি। ইতোমধ্যে সুকুমার প্রচ্ছদ শিল্পীরূপেও সুনাম অর্জন করেছেন। তার প্রযুক্তিবিদ্যা আয়ত্তের পরিচয় মেলে নতুন পদ্ধতিতে হাফটোন ব্লক তৈরি আর ইংল্যান্ডের কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রযুক্তি বিষয়ক রচনা থেকে। সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কাজ ছাড়াও সুকুমার রায় ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের সংস্কারপন্থি গোষ্ঠীর অন্যতম তরুণ নেতা, রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস সরল ভাষায় লিখেছিলেন সুকুমার রায়। তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ আবোল-তাবোল, পাগলা দাশু, হেশোরাম হুশিয়ারের ডায়েরি, খাই-খাই, অবাক জলপান, হ-য-ব-র-ল, বহুরূপী, ভাষার অত্যাচার প্রভৃতি।
কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে সুকুমার রায় ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র সাঁইত্রিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় এই রোগের কোনো চিকিৎসা ছিল না। তার একমাত্র পুত্র সত্যজিৎ রায়ের বয়স তখন মাত্র দুবছর চার মাস। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালকরূপে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ১৯৮৭ সালে পিতা সুকুমার রায়ের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]