ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯

সময়ের আলো সাক্ষাৎকার
রাসুলের (সা.) আদর্শ অনুসরণেই মানবজাতির কল্যাণ নিহিত
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 478

রাসুলের (সা.) আদর্শ অনুসরণেই মানবজাতির কল্যাণ নিহিত

রাসুলের (সা.) আদর্শ অনুসরণেই মানবজাতির কল্যাণ নিহিত

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ,
ইমাম, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যুর মাস রবিউল আউয়াল। এ মাসে মুসলমানদের হৃদয়-মননে অন্যরকম আবেগ ও অনুভূতি কাজ করে। প্রিয় নবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ যেন বেড়ে যায়। তবে প্রকৃত ভালোবাসা ও মহব্বতের প্রকাশ যে তাঁর আদর্শ ও নীতি অনুসরণের মাধ্যমেই ঘটে- এ বিষয়ে দৈনিক সময়ের আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম ও বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিন ইকবাল

সময়ের আলো : রবিউল আউয়াল মাসে মহানবী (সা.)-এর প্রতি মুসলমানদের অন্যরকম আবেগ-ভালোবাসা লক্ষ করা যায়! এমনটা কেন হয়?
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : রবিউল আউয়াল হলো মহানবী (সা.)-এর জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণের মাস। তাই স্বভাবতই এ মাসে মানুষের মনে নবীজির প্রতি আবেগ-ভালোবাসা বেড়ে যাওয়ার কথা। কারণ, রাসুলে করিম (সা.)-এর সঙ্গে একজন মুমিন-মুসলিমের সম্পর্ক আত্মার। হাদিসে এসেছেÑ ‘তোমরা কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন নও, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার নিকটে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততির চেয়ে অধিক প্রিয়তর না হতে পেরেছি।’ (বুখারি : ১৪)

সময়ের আলো : নবীর প্রতি ভালোবাসা কি কেবল এ মাসে থাকবে? অন্য সময়...
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : না, নবীজির (সা.) প্রতি ভালোবাসা আমাদের অন্তরে সব সময়ই থাকা চাই। তবে রবিউল আওয়াল মাস যেহেতু নবীজি (সা.)-এর জন্ম ও আগমন, মৃত্যু ও প্রস্তানের মাস, তাই এই মাসে আলাদা একটা প্রভাব মানুষের হৃদয়ে জেগে ওঠে। মুমিন হৃদয় অন্যরকম একটা আবেগ অনুভব করে।
সময়ের আলো : নবীজির (সা.) জন্ম-মৃত্যু ছাড়া এ মাসে আর কোনো মাহাত্ম্য
আছে কি?
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : এখানে দুটো বিষয়; একটি শরিয়তের হুকুম-আহকাম ও বিধিবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যটি আল্লাহর কুদরতের সঙ্গে সম্পর্কিত। শরিয়তের বিধিবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিতটিকে আরবি পরিভাষায় ‘তাশরিঈয়াত’ বলে। আর যেটা আল্লাহর কুদরতের সঙ্গে সম্পর্কিত সেটিকে ‘তাকয়িনিয়াত’ বলে।
তাশরিয়ি দিক থেকে মাস হিসেবে শ্রেষ্ঠ হলো- রমজান; দিন হিসেবে শ্রেষ্ঠÑ শুক্রবার। আর তাকয়িনি দৃষ্টিকোণ থেকে মাস হিসেবে শ্রেষ্ঠ হলো- রবিউল আউয়াল; দিন হিসেবে শ্রেষ্ঠÑ সোমবার। রাসুল (সা.)-এর আগমনের বিষয়টি ‘তাকয়িন’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিধায় আল্লাহ তায়ালা রবিউল আউয়াল মাসে তার শুভাগমন ঘটিয়েছেন এবং এ মাসেই তাকে নিয়ে নিয়েছেন। সোমবারেই তার জন্ম হয়েছে এবং সোমবারেই তার ইন্তেকাল হয়েছে। নবীজি হিজরতও করেছেন রবিউল আওয়াল মাসে এবং সোমবারে। রাসুল (সা.)-এর জীবনের এ রকম গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ের সম্পর্ক রবিউল আউয়াল মাসের সঙ্গে এবং সোমবারের সঙ্গে। পক্ষান্তরে কোরআন যেহেতু শরঈ বিধিবিধানের সমষ্টি, তাই রবিউল আউয়াল মাসে কোরআন নাজিল করা হয়নি। কোরআন নাজিল করা হয়েছে রমজান মাসে। কারণ, শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেষ্ঠ মাস হচ্ছে রমজান। মোটকথা, এ মাসের সঙ্গে শুধু রাসুলের জন্ম-মৃত্যুই সম্পর্কিত নয়, আরও অনেক বিষয় সম্পৃক্ত। এই জন্যই এই মাসটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

সময়ের আলো : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের ধরন কেমন হওয়া উচিত?
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : সর্বোচ্চ ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ করা চাই। আমাদের প্রতিটি ভালো কাজে তার অনুসরণ ও অনুকরণ করা চাই। তবে, কোনো কিছুতে বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বারবার বলছেনÑ তোমরা সীমা লঙ্ঘন করবে না। কোনো বিষয়েই না। এমনকি আল্লাহকে ইবাদতের ক্ষেত্রেও সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। কেউ যদি মনে করে, জোহরের নামাজ চার রাকাতের বদলে আমি পাঁচ রাকাত পড়ব। তাহলে এটা সীমা লঙ্ঘন হবে, গুনাহ হবে। নবীজিও হাদিসে বলেছেন, ‘লা তাগলু ফি দিনিকুম’ অর্থাৎ, তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কর না। পূর্ববর্তী অনেক জাতি বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে ধ্বংস হয়েছে। সুতরাং মুমিনের উচ্ছ্বাস, মুমিনের আবেগ, মুমিনের ভাবপ্রকাশ, মুমিনের বেদনার প্রকাশ, মুমিনের ইবাদতÑ সব কিছুই একটা সীমার ভেতর নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং রাসুল (সা.)-এর প্রতি আবেগ ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে সীমার ভেতরে থেকেই করতে হবে। এটা যেন শিরকের সীমায় না পৌঁছে যায়। রাসুলের প্রতিও আমরা তুলনাহীন সম্মান-ভালোবাসা প্রকাশ করব। কিন্তু তা যেন শিরকের পর্যায়ে না পৌঁছে। এ দিকে সতর্ক থাকতে হবে।

সময়ের আলো : নবীজির প্রতি আমারা যে দরুদ পাঠ ও মহব্বত প্রকাশ করি, তিনি কি কবরে শুয়ে এসব উপলব্ধি করতে পারেন?
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : আমাদের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা হচ্ছেÑ আমাদের নবী হায়াতুন নবী। অর্থাৎ তিনি কবরে জীবিত। প্রতিদিন ফেরেশতারা পৃথিবীর সব প্রান্তের মুমিন-মুসলমানদের পঠিত দরুদ ও সালাম ব্যক্তির নাম-পরিচয়সহ নবীজির কাছে পৌঁছে দেন। এ মর্মে সরাসরি হাদিসে আলোচনা রয়েছে। আর কেউ যদি নবীজির কবরের পাশে গিয়ে দরুদ পেশ করেন তাহলে রাসুল (সা.) নিজেই শুনতে পান এবং নিজেই এর জবাব দেন। এই ধরনের অনেক ঘটনাও ইসলামের ইতিহাসে বিদ্যমান। বিখ্যাত নবীপ্রেমিক আহমদ কবীর রিফায়ি (রহ.) যখন নবীজির রওজায় জিয়ারতে এসেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ! যখন আমি দূরে ছিলাম তখন আমার আত্মাকে প্রেরণ করতাম আপনার রওজায়ে আকদাস চুম্বন করতে। এখন আমি স্বশরীরে হাজির হয়েছি সুতরাং আপনার হস্ত মুবারক বাড়িয়ে দিন যাতে আমার ঠোঁট তা চুম্বন করে সৌভাগ্যশীল হতে পারে।’ তখন রাসুল (সা.) রওজার ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে দিলেন! হজ শেষে মদিনায় জিয়ারত করতে আসা মসজিদে নববীর কয়েক হাজার মানুষ সে দৃশ্য অবলোকন করেছে। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে ৭০ হাজার মানুষ এ দৃশ্য দেখেছে।

সময়ের আলো : রাসুলের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ হবেÑ তার ওপর দরুদ পাঠ করা নাকি তার আদর্শ অনুসরণ করে চলার মাধ্যমে?
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : দরুদ শরিফ হলো ভালোবাসা প্রকাশের একটা উপায়। মৌলিক বিষয় হচ্ছেÑ সর্বক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর সুন্নত ও আদর্শের অনুসরণ করা। বলা হয়Ñ ‘অন্তরে রাখবে আল্লাহকে আর আমলে রাখবে রাসুলকে।’ কোনো আমলই রাসুল (সা.) থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। রাসুলের সুন্নত ও আদর্শ অনুসরণেই মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা ছাড়া রাসুলের প্রতি ভালোবাসা থাকলে আল্লাহর প্রতিও নিরন্তর ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘হে নবী! আপনি বলে দিন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে তোমরা আমার আনুগত্য কর, আমাকে অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তায়ালাও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (সুরা আলে ইমরান : ৩১)

সময়ের আলো : কোরআনে বলা হয়েছে- ‘রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ রাসুলের উত্তম আদর্শ অর্জন করতে চাইলে আমাদের কী করণীয়?
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : দুই ভাবে রাসুলুল্লার উত্তম আদর্শ নিজের মধ্যে অর্জন করা সম্ভব। একটি হলো নিজের ভেতর দৃঢ় সংকল্প করা যে- যেকোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হই না কেন আমি যেন নবীজির আদর্শ বিচ্যুত না হই। দ্বিতীয়ত নবীজির আদর্শের অভ্যাস নিজের ভেতর গড়ে তোলা। অভ্যাস গড়ে তুললে মানুষ থেকে কিছু ছুটতে পারে না। তাই আমাদের উচিত হবেÑ সব কাজে নবীজির আদর্শ ও অনুসরণ ও অনুকরণ করে চলা। বিশেষ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেসব বিষয় ফরজ করেছেন, সেসব বিষয় রাসুলের সুন্নত মোতাবেক আদায় করা।

সময়ের আলো : সীরাত বলতে কী বুঝায়? সীরাত পাঠের গুরুত্ব কতটুকু?
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : সীরাত অর্থ হচ্ছে চলার পথ। পরবর্তীতে এর অর্থ হয়েছে জীবন চলার পথ। একজন ব্যক্তি কীভাবে জীবন পরিচালনা করেন, তার জন্ম-মৃত্যু ও কর্মÑ এসবই সীরাত। পরবর্তীতে এই শব্দ রাসুল (সা.)-এর জীবনের সঙ্গে নির্দিষ্ট হয়ে যায়। অন্যান্য ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার হয় না। এখন সীরাত বলতে রাসুল (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ বোঝানো হয়। রাসুলের জীবন ও আদর্শ সংক্রান্ত গ্রন্থকে ‘সীরাত গ্রন্থ’ বলা হয়। ইসলামকে জেনে-বুঝে অনুসরণের জন্য একজন মুসলিমের জন্য সীরাত গ্রন্থ অধ্যায়ন করা খুবই জরুরি।

সময়ের আলো : দৈনিক সময়ের আলো ও এর পাঠকদের উদ্দেশে বিশেষ কী বলবেন!
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ : সময়ের আলো একটি নতুন পত্রিকা হলেও আমার ধারণাÑ পত্রিকাটি ইতোমধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছে। এর সম্পাদক, সাংবাদিক এবং ফিচার লেখক সবাইকে আমার আন্তরিক মনে হয়। এর পাঠকও নিশ্চয় আন্তরিক। আমি বলব, এ ধরনের একটা মানসম্পন্ন পত্রিকাকে এবং উঠতি এই পত্রিকাকে সবাই যেন সব বিষয়ে সহযোগিতা করেÑ পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]