ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯

সমাজ বিনির্মাণে মহানবী (সা.)
মাওলানা শামসুদ্দীন সাদী
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 69

পৃথিবীতে মহানবী (সা.)-এর আগমন পূর্বে গোত্রভিত্তিক আরবের লোকেরা কখনও সুসংঘবদ্ধ জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। উপরন্তু গোত্রে গোত্রে প্রাধান্য বিস্তার ও অহংবোধ নিয়ে ছিল যুগ-যুগান্তের লড়াই। জাতি হিসেবে তারা যেমন সমৃদ্ধ ছিল না, তদ্রুপ উন্নত সমাজের কোনো সূচকেই তারা উত্তীর্ণ ছিল না। অনুন্নত, পশ্চাৎপদ একটি জাতি কীভাবে সুসংঘবদ্ধ ও পৃথিবী বিজয়ী বীরের জাতিতে পরিণত হলো এবং শত শত বছর ধরে শাসন করল বিশ^কেÑ সেটি ইতিহাসের এক বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের মহানায়ক হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। মূলত তার বিস্ময়কর জীবনের জাদু ছোঁয়ায় আরব জাতি ঘুরে দাঁড়ায় ইতিহাসের পাতায়।
সমাজ বদলের মূল হাতিয়ার হলো একটি সর্বজনীন আদর্শ। একটি শক্তিশালী ও সুদৃঢ় আদর্শ ধারণ ব্যতীত সমাজ বদলানো অসম্ভব। যে আদর্শ হবে সুবিচারের। যে আদর্শ হবে পুরুষ-নারীর। যে আদর্শ হবে উঁচু-নিচু সবার। যে আদর্শের পরশে জালেম নিবৃত হবে জুলুল থেকে। যে আদর্শে মজলুম পাবে মুক্তির ঠিকানা। যে আদর্শ শোষককে সংযত করবে, বঞ্চিতকে তার প্রাপ্য হক বুঝিয়ে দেবে। যে আদর্শ হবে শাসকের ও শাসিতের। সর্বোপরি ধর্ম-বর্ণ-জাতি ও সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সব মানুষের জন্য সে
আদর্শ হবে কল্যাণকর। নবীজির (সা.) আনীত সেই অদর্শের নাম ইসলাম। সমাজে যখন একটি অনাচার দীর্ঘদিন শিকড় গেড়ে বসে, একসময় মানুষ সেটাকেই সুবিচার ভাবতে শুরু করে। এভাবে সমাজের নানা অনাচার বদ্ধমূল হয়। তৎকালীন দুনিয়ায় বিরাজমান ছিল এমন একটি সমাজ, যেখানে জুলুমই সুবিচার হিসেবে গণ্য হতো। জুলুম বিবেচিত হতো শৌর্যবীর্য হিসেবে। দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। নারীর প্রতি অবিচার ছিল সে সমাজের সবচেয়ে বড় অনুসঙ্গ। নারীকে মনে করা হতো অচ্ছুৎ। নারীর প্রতি
তাদের হিংসাত্মক ধারণা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, কন্যা সন্তানকে নিজের জন্য, গোত্রের জন্য ও সমাজের জন্য কলঙ্ক ভাবা হতো!
এমন দূষিত সমাজে মহানবী (সা.) সর্বজনীন কল্যাণকর একটি আদর্শ নিয়ে আগমন করেন। বসন্তের আগমনে যেমন গাছের পাতায় পাতায় সাড়া পড়ে, নবীজির আগমনে অনাচারে নিমজ্জিত সমাজেও একটি আলোড়ন সৃষ্টি হলো। গ্রীষ্মের খরতাপে ফেটে চৌচির জমিন যেভাবে বৃষ্টির পানিতে সতেজ হয়ে ওঠে নবীজির আগমনে গোটা আরবে এক চাঞ্চল্য তৈরি হলো।
ইসলামের পরশে গোটা আরবের সমাজচিত্রই বদলে গেল। পথের ডাকাত হয়ে গেল মানুষের পথপ্রদর্শক। ঘাতক হলো জীবন রক্ষাকারী। দুষ্ট হলো শিষ্ট। ইসলাম নামক পরশ পাথরের ছোঁয়ায় শতধাবিভক্ত আরব পরিণত হলো এক জাতিতে। কালিমার পতাকায় একতাবদ্ধ হলো চিরশত্রু গোত্রসমূহ। দুদিন আগেও যারা পরস্পরে হানাহানিতে লিপ্ত হতো তুচ্ছ কারণে, মহানবীর পরশে তারা ভাই-ভাইয়ে পরিণত হলো। নিজের সম্পদ ভাগ করে দিল অন্য ভাইকে। এমনকি স্ত্রীদেরও ভাগ করে দিয়ে দিল। মদিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোত্র আউজ ও খাজরাজÑ যাদের শত্রুতা এতই প্রকট ছিল যে, এক গোত্রের ছায়া অন্য গোত্র মাড়াত না। মহানবীর পরশে তারা বন্ধুত্বের এমন দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হলো যে, চৌদ্দশ বছর পর্যন্ত সেই হানাহানির পুনরাবৃত্তি হয়নি।
সমাজ বদলের জন্য অন্যতম হাতিয়ার হলো ব্যক্তি গঠন। ব্যক্তি বদলে গেলেই সমাজ বদলে যায়। ব্যক্তির সমষ্টিতেই যখন সমাজ তাহলে সৎ, আদর্শবান, ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির সমষ্টিতে গড়ে ওঠা সমাজ সুন্দর হবে। মহানবী (সা.) ব্যক্তির উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্ব দিয়েছেন। নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে অসৎ মানুষকে সৎ পথের পথিক বানিয়েছেন, সন্ত্রাসীকে বানিয়েছেন পথপ্রদর্শক, রাহজানকে বানিয়েছেন রাহবার, খুনিকে বানিয়েছেন জীবন উৎসর্গকারী, অহঙ্কারীকে বানিয়েছেন বিনয়ী, দেবদেবীর পূজারিকে এক আল্লাহমুখী বানিয়েছেন। একে একে যখন অনেকগুলো সৎ ব্যক্তি
তৈরি হয়ে গেল তখন বদলে যেতে লাগল সমাজের চিত্র, দেশের চিত্র।
আল্লাহ তায়ালা সমাজ বদলের সেই চিত্র কোরআন মাজিদে সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। তোমরা পরস্পরে শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে এখন তোমরা তার অনুগ্রহের কারণে পরস্পরে ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদের মুক্তি দিয়েছেন।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩)
একটি আদর্শ সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ। মানুষে মানুষে গড়ে ওঠা বৈষম্যের দেওয়াল কিছু মানুষকে প্রভুতে পরিণত করে, কিছু মানুষকে করে তাদের সেবাদাস। রাজায়-প্রজায়, ধনী-গরিবে, মুনীব-গোলামের মধ্যে যে শক্ত প্রাচীর নোংড়া জাহেলি সমাজে মাথা উঁচু করে ছিল মহানবী (সা.) সেই দেওয়ালকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, মানুষে মানুষে কোনো প্রভেদ নেই। সব মানুষ এক আল্লাহর দাস। মানুষ প্রভু হতে পারে না। আল্লাহ সবার একমাত্র প্রভু। মানুষ হিসেবে সবার অধিকার সমান। মানুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকতে পারে না। শুধু ঘোষণা দিয়ে নয়, তিনি কর্মে সেটার স্বাক্ষর রেখেছেন। এভাবেই মহানবী (সা.) আরবের দূষিত সমাজকে একটি সভ্য জাতিতে পরিণত করেন। বর্রব জাতিকে করেন বিশ^জয়ী জাতিতে। শতধাবিভক্ত গোত্রকে করেন একতাবদ্ধ।
নানা সমস্যায় জর্জরিত আজকের সমাজের জন্য মহানবীর আদর্শেই রয়েছে সমাধান। হানাহানিতে বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি একমাত্র মহানবীর আদর্শই দিতে পারে।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আম্বরশাহ আল ইসলামিয়া কারওয়ান বাজার, ঢাকা





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]