ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী চলছে?
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 64

গত কয়েক মাস থেকে গণমাধ্যমে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাবলি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেকটা পানি ঘোলা করার পর দুয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অশান্ত পরিবেশ আপাতত শান্ত হয়ে এসেছে। উপাচার্য পদত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এমন আলোচনা-সমালোচনা টেলিভিশনের পর্দায় শুনতে বা দেখতে কারও ভালো লাগার কথা নয়। তারপরও উপাচার্যদের নিয়ে নানা মন্তব্য শুনতে হয়। এটি বিশ^বিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষক হিসেবে আমার কাছে খুবই মর্ম-বেদনার বিষয়।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ থাকে পড়াশোনা, গবেষণা নিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যস্ততায় কোলাহলপূর্ণ। সেসব দেশের গণমাধ্যমে বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষ, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আন্দোলন, সেøাগান, ভাঙচুরÑ এমন দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ে না। গণমাধ্যমে বিশ^বিদ্যালয় নিয়ে যেটুকু খবর হয় তা হচ্ছে গবেষণায় কোন বিশ^বিদ্যালয় কতটা সাফল্য দেখাচ্ছে, বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণা ফান্ড কতটা বাড়ছে কিংবা বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষাকে আরও কীভাবে উন্নত জ্ঞানবিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করা যায় তা নিয়ে কিছু কিছু লেখা বা সংবাদ মাঝেমধ্যে পরিবেশিত হয়। সেসব দেশে বিশ^বিদ্যালয় নিয়ে বিরূপ কোনো সমালোচনার ঝড় বইতে খুব একটা শোনা যায় না, তেমন পরিস্থিতি ঘটে বলে শুনিনি। উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ক্যাম্পাসে দিনের পর দিন উত্তেজনা সৃষ্টি করেÑ এমন দৃশ্য বোধহয় খুব একটা দেখার কথা কেউ ভাবে না। কিন্তু আমাদের বোধহয় তেমন কপাল জোটেনি। সে কারণে বছর জুড়ে কোনো না কোনো বিশ^বিদ্যালয়ে মারামারি, অবরোধ, দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে অবরোধ, উগ্র সেøাগান, শিক্ষকদের পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থান, বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা ইত্যাদি নিয়ে নানা দৃশ্য একের পর এক দেখেই যেতে হয়! এই মুহূর্তে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় নিয়ে যা চলছে তা দেখতে শুনতে কার ভালো লাগে, জানি না। তবে মাস তিনেক ধরে বিশ^বিদ্যালয়টিতে যা চলছে তা দিন দিন ডালপালা গজিয়ে আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত হচ্ছে। কেন এমন পুরনো একটি বিশ^বিদ্যালয় এতদিনেও সমস্যার কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান করতে পারেনিÑ সেটি ভাবতেও অবাক হতে হয়।
ঢাকার অদূরে জাবি বেশ গুণী শিক্ষকদের নিয়েই গর্ব করার মতো অবস্থানে আছে বলে আমরা জানি। কিন্তু সেই বিশ^বিদ্যালয়ে উপাচার্য এবং শিক্ষকরা উদ্ভূত সমস্যাটি নিয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো সমাধানে আসতে পারলেন না, উদ্যোগ তেমন নিলেন নাÑ এটি মানুষের কাছে খুব একটা বোধগম্য হচ্ছে না। যেসব অভিযোগের কথা ছাত্র শিক্ষকদের একটি অংশ দিনের পর দিন বলে যাচ্ছেন তা কেন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি দিয়ে প্রমাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না সেটিও বোধগম্য হচ্ছে না। হতে পারে ওই বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কেউই এমন তদন্তের ভার নিতে রাজি নন। সে ক্ষেত্রে ইউজিসি প্রবীণ একাধিক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা ইউজিসির সদস্যদের নিয়ে তদন্তটি সম্পন্ন করতে পারে। অভিযোগের তদন্ত হওয়া দরকার। একজন উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে পদত্যাগ করতে হবেÑ সেটি বোধহয় কেউ মনে করে না। অভিযোগের সত্যাসত্য তদন্ত করে দেখা দরকার। প্রমাণিত হলে বিদায় নিতে উপাচার্যের দেরী করার কোনো কারণ নেই। প্রমাণিত না হলে আন্দোলনকারীদেরও আন্দোলন করার কোনো যুক্তি থাকবে না। এ ছাড়া আর যেসব দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমের সম্মুখে অনেকে বলে যাচ্ছে সেগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে যারা যারা এই অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে কেন তা হচ্ছে না জানি না। তবে এই মুহূর্তে বিশ^বিদ্যালয়টি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, প্রশাসনের ঘোষণা উপেক্ষা করে ছাত্র শিক্ষকদের একটি অংশ ক্যাম্পাসে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি না পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে। আমরা এটাও বুঝতে পারি না বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের এভাবে হাতাহাতি, মারামারির মতো ঘটনা আমাদের টিভি পর্দায় দেখতে হবে। এর মাধ্যমে বিশ^বিদ্যালয়ের সম্মান কতটা ক্ষুণ্ন হয় সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে যারা বা যে সংগঠনের নেতাকর্মীরা এসব ঘটনায় যুক্ত হয় তাদের সম্মান মোটেও বাড়ে না। সবচেয়ে ভাবমূর্তির সংকটে পড়ে সরকার এবং সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন। জাবির উপাচার্য এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা তার জন্য কতটা শোভনীয় হয়েছে জানি না। তবে সবারই মর্যাদার সঙ্গে বিশ^বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন এবং বক্তব্য দেওয়া সঙ্গত।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সেটিও একইভাবে দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। ওই বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা। কিন্তু বিশ^বিদ্যালয়টি এক সপ্তাহের অধিক সময় ধরে উপাচার্যবিরোধী সেøাগান আন্দোলনে উত্তপ্ত। এই সমস্যাটিও সমাধানে কেন কেউ উদ্যোগ নিচ্ছে না, সময়ক্ষেপন করা হচ্ছেÑ তাও বোধগম্য নয়। তাৎক্ষণিকভাবেই এসব অভিযোগের তদন্ত এবং প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এখানে এক দিনও সময় ক্ষেপণের প্রয়োজন দেখি না। বিশ^বিদ্যালয়ে কেন আন্দোলন করে উপাচার্যদের এমনভাবে বিদায় করতে হবে সেটিও খুব একটা বুঝতে পারছি না। অন্যদিকে খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে ফুটবল খেলা নিয়ে দুপক্ষের বচসা থেকে মারামারি, তা থেকে বিশ^বিদ্যালয়টিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে হলো। ভাবতেই অবাক হতে হয়। অসহিষ্ণুতা আমাদের মধ্যে কত বেশি বিরাজ করছে তার একটি নজির হয়তো এটি হতে পারে। খেলা নিয়ে প্রতিযোগিতা হবে কিন্তু মারামারি হবে কেন এবং সেই মারামারির জন্য বিশ^বিদ্যালয়টিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে হবে কেন সেটি বোঝা বেশ কষ্টকর। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি খেলা নিয়ে এমন পর্যায়ে নামতে পারে তাহলে তারা কীভাবে দেশের আগামীদিনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে সেটি বোঝা কষ্টকর। রাজশাহী পলিটেকনিক্যাল কলেজে একজন অধ্যক্ষকে কিছু ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসী পানিতে নিক্ষেপ করতে পারে সেটি সবাইকে হতবাক করেছে। অবশ্য এসব এখন নতুন কোনো খবর নয়। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্র সংগঠনের পরিচয় দেওয়া নেতাকর্মীদের একটা অংশ পরীক্ষায় অসৎ উপায় অবলম্বন করার চেষ্টা করে থাকে। এটি অনেক ক্ষেত্রেই এখন চলছে সবাই জানছেনও। কিন্তু এদের নিভৃত করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ তারা ছাত্র সংগঠন করার নামে যা করে তার সঙ্গে লেখাপড়া, ছাত্র সংগঠন, ছাত্রজীবন, স্বাভাবিক মানুষের মূল্যবোধ ইত্যাদি কোনোভাবেই মেলানো যায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা ভর্তি হয় সত্য, কিন্তু লেখাপড়ায় তাদের কোনো আগ্রহ নেই, বই-পুস্তকের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তারা ছাত্রনেতা বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্র সংগঠন, মূল রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম সামাজিক মাধ্যমসহ সর্বত্র পরিচিতি পাচ্ছে। এটি কোনোভাবেই তাদের কার্যক্রমের সঙ্গে যায় না যেÑ সেই বোধ, সচেতনতা, শিক্ষা, বিবেক তাদের খুব একটা গঠিত হয়েছে বলে মনে হয় না। এটি সাম্প্রতিককালের প্রবণতা বলে পার পাওয়া যাবে না।
বহু আগ থেকেই আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে একশ্রেণির ছাত্র নামধারী তথাকথিত ছাত্রনেতা ছাত্রাবাসগুলোতে দখল, প্রভাব, নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড, অর্থবিত্ত আদায়সহ হেন কোনো বেআইনি কাজ নেই যার সঙ্গে যুক্ত হয় না। ছাত্রাবাসে জুনিয়রদের ওপর বাহাদুরি দেখানো, নির্যাতন করা, প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো বছরের পর বছর সিট দখল করে রাখা, প্রতিপক্ষকে নির্যাতন করা ইত্যাদি যেভাবে চলছে তা কোনো সভ্য দেশে কল্পনা করা যায় না। অথচ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকার জাতীয় বাজেটের এক বিরাট অংশ উচ্চশিক্ষায় ব্যয় করে থাকে।
কিন্তু সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে লেখাপড়া, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক চর্চা বন্ধুত্ব সম্প্রীতি ইত্যাদি চর্চার চেয়ে দখল, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, ফাঁকিবাজি, নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গ ইত্যাদি বছরের পর বছর ধরে যেভাবে চলে আসছে তা মোটেও এই সমাজ আর বহন করতে পারবে কি না আমার গভীর সন্দেহ রয়েছে। দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে চলছে যুক্তিহীন, নিয়মহীন, শিক্ষাবিহীন, জ্ঞানচর্চাবিহীন, গবেষণাবিহীন এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। সে কারণেই বছর জুড়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। এতে সবচেয়ে লাভবান হচ্ছে সাম্প্রদায়িক এবং মুক্তচিন্তাবিরোধী গোষ্ঠীÑ যারা মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে যে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের তরুণদের নষ্ট করছে এর বিপক্ষে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেককেই উদ্বুদ্ধ করতে পারছে। দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো সরকার এবং শিক্ষা সচেতন মহল কেন বিষয়গুলো গভীরভাবে বুঝতে পারছে না তা আমার বোধগম্য নয়। আমি কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করব এর অবসানের। সরকারকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে এমন সেøাগান আর কাউকে উচ্চারণ করতে না হয়, শুনতে না হয়, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেটির ব্যবস্থা করতে হবে। এটি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]