ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯

জাবিতে দুই যুগে আন্দোলনে পদত্যাগ করেছেন ৮ ভিসি
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৮.১১.২০১৯ ১১:৪৫ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 920

জাবিতে দুই যুগে আন্দোলনে পদত্যাগ করেছেন ৮ ভিসি

জাবিতে দুই যুগে আন্দোলনে পদত্যাগ করেছেন ৮ ভিসি

দেশের একমাত্র আবাসিক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) অচলবস্থা বিরাজ করছে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শিক্ষা ও প্রশাসনিক সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। উপাচার্যের পদত্যাগের আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় অশান্ত হয়ে ওঠা নতুন কিছু নয়। গত ২৫ বছরে বিশ^বিদ্যালয়ে আট উপাচার্য আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। বিশ^বিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েই অনেকে নানা কাজে বিতর্ক তৈরি করেন।

এবার শিক্ষাবিষয়ক কোনো সংবাদ নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে বর্তমানে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘দুই কোটি টাকা’। এক হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার ক্যাম্পাস উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা দিবে না, এই প্রতিশ্রুতিতে ছাত্রলীগ নেতাদের দেওয়া হয়েছে ২ কোটি টাকা। এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় ২৩ আগস্ট থেকে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এরপর থেকেই ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন তারা। মঙ্গলবার দুপুরে  শিক্ষার্থীরা তার বাসভবন অবরোধ করলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এর পরই বিশ^বিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগ করতে বলা হয়। ক্যাম্পাস বন্ধের ঘোষণার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

১৯৭০ সালে ঢাকার অদূরে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের বিশিষ্ট রসায়নবিদ ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক মফিজ উদ্দীন আহমেদকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে ১৯৭০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর নিয়োগ দেওয়া হয়। অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান ১৯৭২ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ক্যাম্পাসটি নান্দনিকভাবে সাজান। তিনি ১৯৭৫ সালে মর্যাদার সঙ্গে তার মেয়াদও শেষ করেছিলেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ এনামুল হক এবং অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এই বিশ^বিদ্যালয়টির ভিসির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মোহাম্মদ নোমান ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ভিসি ছিলেন।

১৯৮৮ সালে অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯৩ সালে শিক্ষকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলায় ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই ঘটনায় অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ পদত্যাগে বাধ্য হন। অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী তখন অস্থায়ীভাবে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ উপাচার্য হন এবং ১৯৯৯ সালে ক্যাম্পাসে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং টিউশন ফি বৃদ্ধিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। এই আন্দোলনে তাকেও উপাচার্যের পদ ছাড়তে হয়। এরপর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল বায়েসকে উপাচার্য করা হয়, তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। উপাচার্য পদে আসেন অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। ২০০৪ সালে শিক্ষক আন্দোলনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাকেও উপাচার্যের পদ ছাড়তে হয়। এরপর এই বিশ^বিদ্যালয়ের সবচেয়ে ভাগ্যবান ভিসি অধ্যাপক খোন্দকার মোস্তাহিদুর রহমান। গত দুই যুগে একমাত্র তিনিই সম্মানের সঙ্গে তার মেয়াদ শেষ করেছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তার চার বছরের পুরো মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান ২০০৮ সালে অস্থায়ীভাবে উপাচার্য নিযুক্ত হয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত ভিসি ছিলেন।

এরপর আওয়ামী লীগ সরকার বিশ^বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবিরকে নিয়োগ দেয়। তার আমলে শিক্ষক নিয়োগ, ভর্তি এবং অবকাঠামো নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতির ওঠে। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ২০১২ সালে তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে বাধ্য হন। নিজ বিশ^বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে উপাচার্য না করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনকে এই পদে নিয়োগ দেয় সরকার। তিনিও তার মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে উপাচার্য পদ থেকে সরে দাঁড়ান অধ্যাপক আনোয়ার। এই সময়ের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তারা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হলেও দুর্নীতিগ্রস্ত উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেউই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের অধ্যাপক ফারজানার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সংকটের পেছনে তৃতীয় পক্ষ থাকতে পারে। ভিসির বিরুদ্ধে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সবার আগে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন দেখবে। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে বিশ^বিদ্যালয় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রশাসনের দায়িত্ব। ছাত্রলীগের কেউ যদি জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে সহিংসতা করে থাকেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বৃহস্পতিবার গণভবনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে তোলা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]