ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯

আবুলের ভয়ে তটস্থ ওয়ারীবাসী
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৮.১১.২০১৯ ১২:০৬ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 690

আবুলের ভয়ে তটস্থ ওয়ারীবাসী

আবুলের ভয়ে তটস্থ ওয়ারীবাসী

দুই ভাই আবুল হোসেন আর বাবুল হোসেন। তাদের মধ্যে হাজী আবুল হোসেন ওয়ারী থানা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আগে ছিলেন ফ্রিডম পার্টির নেতা। এই আবুলের ভয়ে ওয়ারীবাসী সবসময় তটস্থ থাকেন। আওয়ামী লীগ নেতার পদ বাগিয়ে নেওয়ার পর থেকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জোর করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি দখল, সরকারি জায়গা দখল, মার্কেট-ফুটপাথে চাঁদাবাজি, পদবাণিজ্য ও এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। এমনকি তার দলের লোকরাও তাকে বড্ড ভয় পায়। তার এসব অপরাধের কথা ওয়ারী থানা পুলিশও জানে। তার বিরুদ্ধে থানায় বিভিন্ন সময় হত্যা, দখল, ভাঙচুর, লুটপাট ও চাঁদাবাজির মামলা এবং জিডিও হয়েছে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।

টানা দু’দিন ওয়ারীর অলিগলি ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবার ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

কে এই আবুল হোসেন : ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী আবুল হোসেন। আশির দশকে ফ্রিডম পার্টি করতেন। সেই সময় গুলিস্তানের পরিবহন নেতা ফ্রিডম লিয়াকতের ক্যাডার ছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে ছিনতাই করতেন। আশির দশকে সূত্রাপুর থানায় তার নামে একাধিক ছিনতাইয়ের মামলা ছিল।

একাধিক হত্যা মামলার আসামি : এই আবুলের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাসে ওয়ারীর সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা সামসুল হক সেলিমকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি আবুল হোসেন। মামলা নং-১০২। ওই বছরের ২৭ অক্টোবর মামলাটি করেছিলেন নিহতের স্ত্রী ও বর্তমান এই ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর রাসিদা পারভীন মনি। মামলাটির আসামি হলেও তাকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। এই নেতার বিরুদ্ধে শুধু সেলিম নয়, এলাকার আরেক নেতা তানজিল হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এই হত্যা মামলারও আসামি হলেন এই আবুল হোসেন। আলোচিত তানজিল মার্ডার এবং নিতাই মার্ডারের আসামি আবুল হোসেন ক্যাসিনো আরমানের অন্যতম সহযোগী।

পিস্তলের মুখে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি-সম্পত্তি দখল : ওয়ারী এলাকার একাধিক সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা নিজস্ব সম্পত্তি এই আবুল রাতারাতি দখল করেছেন। এখন সেসব সম্পত্তি তিনি ভোগ দখলও করছেন। অনেকগুলোতে ভবন তুলে ভাড়াও দিয়েছেন। সম্পত্তি দখল করে আবুল আজ হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। তার এই দখলের কথা এলাকায় সবার মুখে মুখে। কিন্তু ভয়ে কোনো ভুক্তভোগী পরিবার মুখ খোলে না।

ভারতে পালিয়েছে দুই সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার : আবুল হোসেন এলাকার দুর্বল সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোকে টার্গেট করতেন। কোনো এক সময় তার লোকজন নিয়ে ওই বাড়িতে হানা দিতেন। এরপর পুরো বাড়ি দখলে নিয়ে বের করে দিতেন সেই পরিবারকে।

এলাকাবাসী জানায়, ২০১৪ সালের মে মাসে ওয়ারীর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারসহ দুই সংখ্যালঘু পরিবারের জমি রাতারাতি অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মুচি সম্প্রদায়ের মুক লাল রবিদাস, শঙ্কর রবিদাস ও দীনেশ রবিদাশের তিনটি বসতঘর তিনি তার লোকজন দিয়ে দখল করেন। এরপর তাদের হটিয়ে ওয়ারীর মুচিপট্টিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীর বাড়ি দখল করে সেখানে জুয়ার আসর বসান।

এলাকাবাসী জানায়, ওই সময় আবুল হোসেন তার টার্গেটকৃত পরিবারগুলোর মধ্যে একটি পরিবারের বাসায় যান এবং টেবিলের ওপর পিস্তল রেখে বলেন, ‘কোনটা নিবি? টাকা না কি প্রাণ? তোদের এই জমি আমি চাই। এই জমি না হলে আমার এত বড় প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ রবিদাসদের বাড়ি দখলের পর এভাবেই হুমকি দিয়েছিলেন এই আবুল হোসেন।

এ বিষয়ে সে সময় ওয়ারী থানায় অভিযোগও করেছিল ওই ভুক্তভোগী পরিবারগুলো; কিন্তু পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো  ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। ওই সময় দুই সনাতন ধর্মাবলম্বীর পরিবার তার ভয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। এলাকার অনেকে জানিয়েছেন, ওই পরিবার দুটি সে সময় কোনো ধরনের বিচার পায়নি। একদিন ওই পরিবারে গিয়ে তার লোকজন যুবতিদের ঘরে আটকে রেখে অন্যদের মারধর করে অস্ত্রের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

অন্যদিকে মুসলিম পরিবারটিকে আবুল হোসেন ফ্ল্যাট দেওয়ার নাম করে জায়গায় ভবন তোলেন এবং পরবর্তী সময়ে ভবন তোলা হলে তাদের আর ওই জমির কাছে ভিড়তে দেননি। পরিবারটি আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে আট বছর মামলায় লড়েছিলেন; কিন্তু তাকে সেখান থেকে সরাতে পারেননি। এছাড়াও এই আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে সূত্রাপুর এলাকার দক্ষিণ মৈশুণ্ডিতে এক সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের বাড়ি দখল ও মন্দির ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় সূত্রাপুর থানায় জিডি হয়েছিল। কিন্তু ওই মামলায়ও আবুল গ্রেফতার হননি।

ওয়ারীর ৩৩ লালমোহন সাহা এলাকার কয়েকজন সনাতন (হিন্দু) ধর্মের মানুষ জানান, আবুল হোসেন আগে ফ্রিডম পার্টি করতেন। কিন্তু বর্তমানে সরকারি দল করেন। এ কারণে তার এলাকায় দাপট ও প্রভাব অনেক। তার ভয়ে কেউই মুখ খুলতে কিংবা কথা বলতে চায় না। তারা জানান, আবুল হোসেন বর্তমানে টার্গেট করে করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি দখল করছেন। আবুল কয়েক বছর আগে বলদা গার্ডেনের সামনে তার লোকজন নিয়ে রাতারাতি একটি মার্কেট তুলেছিলেন বলে জানায় এলাকাবাসী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের লোকজন গিয়ে সেটি গুঁড়িয়ে দেয়। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগ রয়েছে।

আবুলের জমি দখলের সিন্ডিকেট : আবুলের জমি দখলের বড় একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা সবাই মিলে একজোট হয়ে জমি দখল থেকে চাঁদাবাজি করে থাকে। বছর কয়েক আগে ওয়ারীর সানাই কমিউনিটি সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়। আর এটি এক সনাতন ধর্মাবলম্বীর জমি দখল করে বানানো হয়েছিল বলে জানায় এলাকাবাসী। এর দখলদার হাজী ইসলাম নামে ব্যক্তি। যিনি আবুলের অন্যতম ব্যবসায়িক পার্টনার বলে জানা গেছে। ১১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সারোয়ার হোসেন আলো লালমোহন সাহা স্ট্রিটে সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের জায়গা দখল করেছেন। তিনিও আবুলের সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী। শুধু তারাই নন, ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আশিকুর রহমান চৌধুরী লাভলুও আবুলের সিন্ডিকেটের সদস্য। যদিও তার সঙ্গে আবুলের রাজনৈতিক গ্রুপিং রয়েছে। কিন্তু তিনিও দখলের প্রশ্নে এক আবুলের সঙ্গে। লালমোহন স্ট্রিটে মন্দিরের জায়গা দখল করে আবুলের সহযোগীÑ ওয়ারীর কুখ্যাত তিন ভাই। তারা হলোÑ ১১নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এখলাস উদ্দিন রুবাইয়াত, জিকু ও দাদা লিটন। এদের সঙ্গে নিয়েই মন্দিরের জায়গা দখল করেছে। মাদক, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজিÑ সবই করে এই সিন্ডিকেট। রুবায়েত বলদা গার্ডেনের রাস্তার জায়গায়ও দখল করেছিল। বর্তমানে সেখানে রড-সিমেন্টের পিলার এখনও সে চিহ্ন বহন করছে। বছর কয়েক আগে হঠাৎ করে বলদা গার্ডেনের কোয়ার্টারের জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণ শুরু করে। পরে অবশ্য সেটি বলদা গার্ডেন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে যায়। সেই জায়গা ওয়ারী থানার সামনের মোড়ের উত্তর পাশে। এছাড়াও আবুলের মদদে তারই অনুসারী রুবায়েত সিটি করপোরেশনের কোয়ার্টারে যাওয়ার রাস্তা দখল করে চারতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। যেটি মাদানী চায়ের বাড়ি নামে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ চারতলা ভবনটি ওয়ারী থানার রাস্তার বিপরীত পাশে। যেন দেখার কেউ নেই।

চাঁদাবাজির অভিযোগ ও মামলা : আবুল হোসেনের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। ওয়ারী এলাকার প্রতিটি মার্কেট, দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদাবাজি করেন তার লোকজন। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস, নামিদামী ব্র্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার চাঁদার হারটা মোটা অংকের। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই হামলা করে বসে তার বাহিনী। আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৪ জুন ২৬ নং ওয়ারী স্ট্রিটের একটি মার্কেটে চাঁদাবাজির অভিযোগে পরদিন ৫ জুন ওয়ারী থানায় একটি মামলা হয়। এই মামলা আবুল হোসেনসহ তার সঙ্গীদের নামে করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে অন্যরা গ্রেফতার হলেও তাকে গ্রেফতার বা আটক করেনি পুলিশ। সে সময় আবুল হোসেন সাবেক ১১ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি বর্তমানে ওয়ারী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এলাকাবাসী জানায়, হাজী আবুল হোসেন আবুল একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে ভূমি দখল ও চাঁদাবাজির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু পুলিশ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে না।
এ বিষয়ে আবুল হোসেনের মন্তব্য জানতে সময়ের আলোর পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়; কিন্তু তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]