ই-পেপার শনিবার ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ২৩ নভেম্বর ২০১৯

সবুজ পাতার হাসি
রুনা তাসমিনা
প্রকাশ: শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 15

আমপাতাটি বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ করছে, ওপাশের ডালে তিরতির করে কাঁপছে তার প্রতিবেশী কাঁঠালপাতা বন্ধু। কী হলো! অমন করে কাঁপছ কেন! ডাক দিয়ে জানতে চাইল এপাশের আমপাতাটি।
ভয়ে কাঁপছি ভাই। শুধু আমি নই। এদিকে আমরা যারা আছি সবাই ভয়ে কাঁপছি। কেউ কেউ কাঁদছে।
কেন ভাই! কী হয়েছে?
তোমরা শোনোনি কিছু! আমপাতা আশ্চর্য হয়ে বলে।
কী শুনব কাঁঠালপাতা বন্ধু? কী হয়েছে খুলে বলো। তোমার কথা শুনে আমারও ভয় করছে। বলো বন্ধু!
আজ একদল লোক এসে মাপজোখ করল। এখানে নাকি মস্ত দালান হবে। আমাদের সবাইকে কেটে ফেলবে। বলেই হু হু করে কেঁদে উঠল কাঁঠালপাতা।
প্রাচীর ঘেরা ওই জায়গায় বেশ ভালোভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল আম, কাঁঠাল, নারকেল গাছদের। এককোণে একটি নিমগাছ আর একটি তেঁতুলগাছও ওদের সঙ্গী ছিল। বেশ আরামেই কাটছিল দিন। মালিক এসে আম-কাঁঠালের দিনে বস্তা ভরে আম আর কাঁঠাল নিয়ে যান। নারকেল গাছ থেকে ডাব আর নারকেল। তেঁতুলগুলোও ছিল বেশ মজার। জায়গার মালিকের দুই ছেলেমেয়ে। রুমকি আর রুমেল। ওরা প্রতিদিন বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে খেলতে আসে এখানে। তখন দারোয়ান চাচা তেঁতুল পেড়ে দেয় ওদের। ওরা খেয়ে বলে, কী মজা! তেঁতুল গাছ ভারি আনন্দ পায় ওদের কথা শুনে।
আমের দিনে আমগাছ দুষ্টুমি করে টুপ করে ফেলে দিত পাকা আমগুলো। কী কাড়াকাড়ি ওদের মধ্যে ওগুলো নিয়ে! আমগাছের কাণ্ড দেখে খিলখিল করে হাসত অন্য গাছেরাও। ওরা কখনও দৌড়াদৌড়ি করে। রুমেল নতুন সাইকেল কিনেছে। চালাতে গিয়ে ধপাস করে পড়ে যায়। ব্যথা লুকিয়ে হেসে বলে, শিখতে গেলে এমন হয়।
খালি জায়গাটার বিকেলটা ছিল গাছেদের ভীষণ প্রিয়। ছেলেমেয়েগুলোকে ভীষণ ভালোবাসত তারা। একদিন না আসলেই কেমন সুনসান হয়ে থাকত জায়গাটা। কিন্তু এখন কাঁঠাল পাতার কথায় সবার মন ভারী হয়ে গেল। বাতাসে দুলে দুলে বিলাপ করতে লাগল পাতাগুলো। বিকেলে খেলতে এলো রুমকি, রুমেলের দল। আজও পাতাগুলো দুলে দুলে খেলতে আসা বাচ্চাদের গায়ে শীতল পরশ দিচ্ছে। ওরা প্রতিদিনের মতোই খুশি মনে খেলছে। সাইকেল চালিয়ে রুমেল ঘেমে নেয়ে একাকার। রুমকি বলল, এই ভাইয়া, তোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এইমাত্র গোসল করেছিস। তোর আবার জ্বর আসবে।
ও কিছু না। গাছের নিচে বসে একটু রেস্ট নিলেই ঘাম শুকিয়ে যাবে।
কানামাছি খেলতে গিয়ে রুমকি ভুল করে নারকেল গাছ জড়িয়ে ধরে। তা নিয়ে কী হাসাহাসি!
ওদের সঙ্গে হাসে গাছেরাও। মলিন সে হাসি।
পরদিন জায়গার মালিক কিছু লোকজন নিয়ে এলো। গাছেরা কান পেতে রইল। যদি আশার কথা কিছু শোনা যায়!
ভাই, এই জায়গা আমার বাবার সম্পদ। গাছগুলো সব বাবার হাতে লাগানো। এই গাছগুলোতে আমার বাবার প্রাণ ছিল। বলতে বলতে গলা ধরে আসে রুমেলের বাবার। যিনি কিনেছেন তিনি চুপ করে আছেন।
অসুখটা যদি আমার হতো, আমি কাউকে বলতামও না। কিন্তু আমার রুমেলকে বাঁচাতে হবে। আমার ছেলেটা জানেও না ক্যানসার ধরা পড়েছে ওর শরীরে। ডাক্তার বলেছেন, এখনও সময় আছে। আমার ছেলেটা...
তিনি আর বলতে পারেন না। কান্নায় ভেঙে পড়েন। জায়গার নতুন মালিক সান্ত্বনা দেন তাকে।
এভাবে ভেঙে পড়বেন না। আপনার ছেলে নিশ্চয় সুস্থ হবে। আমি কালই টাকা দিয়ে দিচ্ছি। আপনি ছেলের ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করুন।
ওদের কথা শুনে গাছেরা নিজেদের জীবনের কথা ভুলে গেল। রুমেলের জন্য ওদের প্রাণ কেঁদে উঠল। সবাই চলে যাওয়ার পর ওরা বলাবলি করতে লাগল, রুমেল আমাদের বন্ধু। অনেক ভালো ছেলে। আমাদের জীবনের বিনিময়ে যদি ওর জীবন বাঁচে আমাদের দুঃখ থাকবে না।
যেদিন রুমেলকে নিয়ে ওর বাবা সিঙ্গাপুর যাবেন, সেদিন সকালে ওরা সবাই এলো। রুমেলের বাবা প্রত্যেক গাছকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আদর করে দিলেন। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল।
কিছুদিনের মধ্যে দারুণ সুন্দর একটি বিল্ডিং হলো রুমেলদের জায়গায়। বাচ্চাদের খেলার কোনো মাঠ নেই। বাসার বারান্দা না হয় ছাদে গিয়ে ওরা খেলে।
একদিন বিকেলে রুমেলের বাবা এলেন বাড়ির মালিকের সঙ্গে দেখা করতে। বাড়ির গেটে এসে আশ্চর্য হয়ে তিনি দেখলেন, একটি গাছও কাটা হয়নি। সবাই যে যার জায়গায় আছে। তাকে দেখে বাড়ির মালিক ঘর থেকে বেরিয়ে বললেন, আপনার বাবার লাগানো গাছগুলো কাটতে মন সায় দেয়নি। তা ছাড়া প্রচুর বাতাস পাই ওখান থেকে। সবাই বলে, ওই গাছগুলোর কারণে আমার বাড়িটা আরও বেশি সুন্দর দেখায়।
পুরনো মালিককে দেখে হাসিতে দুলে উঠল সবকটি গাছের পাতারা।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]