ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯ ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় কতটুকু কার্যকর
ড. মুনাজ আহমেদ নূর
প্রকাশ: শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 162

তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের শেষ প্রান্তে এসে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শুধু তরুণরাই নয় বিভিন্ন বয়সিদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এই মাধ্যমটির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্বারা পৃথিবীর যেকোনো স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমরা সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি দেখতে পাচ্ছি। বর্তমানে এটি তথ্য আদান-প্রদানের অন্য যেকোনো মাধ্যমের তুলনায় অধিক শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। এই মাধ্যম ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, জ্ঞানের ভাগাভাগি এবং একটি স্বগতোক্তিকে কথোপকথনে রূপান্তর করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই বেশি। এতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। আর ব্যবহারকারীরা তা দেখার পাশাপাশি তাদের মতামত দিতে পারছে। এখন সময় এসেছে জনপ্রিয় এই মাধ্যমটিকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় কতটুকু উপযোগী করে ব্যবহার করা যায় সেই বিষয়ে ভাবার। আমরা যদি ধরে নেই যে, একজন শিক্ষার্থী স্কুলে না গিয়ে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব শিক্ষাগ্রহণ করবে তাহলে তা সম্ভব কি? অথবা একজন শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করছে কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তার সঙ্গে আছে তাহলে সে এই মাধ্যম থেকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় কতটুকু সহায়তা পাবে? আর যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প হিসেবে এই মাধ্যমকে ব্যবহার করা যায় তাহলে সে এখান থেকে কতটুকু উপকৃত হবে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশনগুলোর একটি গ্রুপ। এটি ওয়েব ২.০-এর আদর্শিক ও প্রযুক্তিগত মূলের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। যাতে ব্যবহারকারীর তৈরি কোনো বিষয়বস্তুকে আদান-প্রদান এবং নতুন কিছু তৈরি করার অনুমতি দেয়।
২০১৭ সালে হানসেনসহ আরও কয়েকজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি আধুনিক সংজ্ঞা দিয়েছেন। সেখানে তারা বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হচ্ছে একগুচ্ছ অনলাইন অ্যাপস ও টুলসের সমষ্টি। এটি চূড়ান্তভাবে একটি স্বগোক্তিকে কথোপকথনে রূপান্তর এবং জ্ঞান বিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি ও সহজ করার মাধ্যমে ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ও পারস্পরিক যোগাযোগের পথ
বাতলে দেয়।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপস ও টুলসের সমন্বয়। এটি ওয়েব ২.০-এর আদর্শ ও প্রযুক্তিগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়ামূলক কাঠামো তৈরিতে সহায়তাই এর কাজ। এখানে ব্যবহারকারীরা তাদের তৈরি করা কনটেন্ট বিনিময় করে থাকে।
এখন আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের তৈরি করা বিষয়বস্তুর সুবিধাদি বিনিময়ে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে সমস্যা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রত্যেক ব্যবহারকারীই কনটেন্ট তৈরি করছে এবং তা শেয়ার করছে যা অনেক সময় খুবই বিপজ্জনক। যেমনটি আমরা ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে দেখেছি, সাম্প্রতিক সময়ে ভোলার বোরহানউদ্দিনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখছি। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা কোনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। এখানে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাইও নেই। ব্যবহারকারীরা নিজেরাই কনটেন্ট তৈরি করছে এবং তা শেয়ার করছে। এই কনটেন্ট সঙ্গে সঙ্গে থামানো অনেক সময় প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে প্রতিক্রিয়া তা নিয়ন্ত্রণে আমরা এখনও অভ্যস্ত হইনি। তথ্যটা কী গুজব নাকি সত্য তা যাচাই করার ক্ষমতা আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি। তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে আমরা তা গ্রহণ করছি নিজের মতো করে। কারণ সমাজে বিভিন্ন মানসিকতার মানুষ বসবাস করে। কোনো গোষ্ঠী তথ্যটিকে তার মতো করে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তার জন্য সমাজ প্রস্তুত থাকে না। তবে এই মাধ্যমটি অনেক সময় খুবই উপকারী ভূমিকাও পালন করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আমরা বৃহৎ শ্রেণিকরণের মাধ্যমে ভাগ করতে পারি। অনেকগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্লগ, (যেখানে একজন ব্যবহারকারী গল্প কাহিনি, নিজের জীবন কাহিনি কিংবা যেকোনো ঘটনা লিখতে পারে।) উইকিস, (উইকিপিডিয়া) সামাজিক নেটওয়ার্ক সাইট, (ফেসবুক, লিংকডইন ইত্যাদি।) স্ট্যাটাস আপডেট সাইট, (টুইটার) সোশ্যাল বুকমার্কিং, (রেডডিট, স্টাম্বলআপন, ডিগ ইত্যাদি।), ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, লিঙ্কডইন, রিসার্চগেট ইত্যাদি।
বর্তমানে পৃথিবীতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় প্রায় ১.৬ বিলিয়ন, ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিলিয়নেরও বেশি, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন, গুগল প্লাস ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪৩০ মিলিয়ন, লিঙ্কডইন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪২০ মিলিয়ন, টুইটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২৩০ মিলিয়ন এবং রিসার্চগেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় প্রায় ৯ মিলিয়ন। সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপকতা কতটুকু এবং সমাজে এর যে ব্যাপক প্রভাব তা নিয়ে বিশ^ব্যাপী আলোচনা হচ্ছে। যেহেতু সামাজিক সংযোগগুলো আমাদের জীবনের অনেকগুলো দিককে প্রভাবিত করছে সেহেতু এগুলোকে আনুষ্ঠানিক শিখন-শিক্ষণে প্রয়োগের দিকে ধাবিত হচ্ছে বিশ^। অনেকে বলছে এই মাধ্যমটি শিখন-শিক্ষণে প্রয়োগ করাটা ভালো হবে আবার অনেকে বলছে ব্যবহার করার আগে সতর্কতা অর্জন করা জরুরি।
শিখন-শিক্ষণ কী?
শিখন-শিক্ষণ হচ্ছে একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। এটি কঠিন এবং সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এখানে শিক্ষার্থীদের উচিত শিক্ষকদের সম্মান করা এবং তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করা। শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা, অনুপ্রাণিত করা এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা। কিন্তু আমরা যদি ইতিহাস দেখি তাহলে দেখতে পাই ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শিক্ষকের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথবা কোনো ভালো কনটেন্ট তৈরি করে সহজ মাধ্যম হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে শিক্ষার ব্যয় কমানো। এখনও অনেকে শুধু শিক্ষার্থীদের রেখে কীভাবে শিখন-শিক্ষণ পরিচালনা করা যায় সেই চেষ্টা করছে। তাদের ধারণা ভালো ভালো শিক্ষকের লেকচার ভিডিও করে বা অনলাইনে দিয়ে দিলেই শিখন-শিক্ষণ হবে। অথবা ভালো কনটেন্ট দিয়ে দিতে পারলে শিখন-শিক্ষণ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সরাসরি শিক্ষকের উপস্থিতি না থাকলে শিখন-শিক্ষণ সেভাবে হবে না। সে কারণেই আমরা অনেক সময় বলতে চাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ব্যবহৃত হবে? নাকি আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে? কিন্তু আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হলে শিখন-শিক্ষণটা সেভাবে হবে না। কারণ শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পরিচালিত হলে সেখানে শিক্ষকের উপস্থিতি থাকে না আর শিক্ষকের উপস্থিতি না থাকলে শিখন-শিক্ষণ সেভাবে হয় না। লেকচার ভিডিও করে বা অনলাইনে দিয়ে দিলে হয়তো একজন শিক্ষার্থী সেখান থেকে শিখতে পারবে কিন্তু ভালোভাবে শিখন-শিক্ষণটা হবে না। কেননা ভিডিও বা শিক্ষা যেহেতু একটি সামাজিক বিষয় সেহেতু এখানে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া, শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া, শিক্ষার্থী এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষেরে মিথস্ক্রিয়ার প্রয়োজন। আর যদি তা করা সম্ভব না হয় তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করা সহজ হবে না। তবে অবশ্যই আমরা এই মাধ্যমটিকে দক্ষতা উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারি।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় একদিক থেকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে এবং অন্য দিক থেকে শিক্ষার্থী ও দৈনন্দিন জীবনের ইভেন্টগুলোর মধ্যে প্রতিদিনের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া প্রয়োজন। যখন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে একটা সামাজিক বন্ধন থাকবে তখনই সত্যিকারের শিখন-শিক্ষণ হবে। আমাদের ক্লাসরুম এবং বাস্তব বিশে^র মধ্যে যে ফারাক রয়েছে তার সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে। শিখন-শিক্ষণের একটি তাৎপর্য আছে এটি বিশে^র সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি বাস্তব বিশে^র সিস্টেমে তৈরি করা হয়েছে। আপনি যখন মানুষের সঙ্গে কোনো কিছুর বিনিময় করতে যাবেন তখন তার প্রতি আপনার আস্থা এবং বিশ^াস থাকতে হবে। সে যে তথ্যটা আপনাকে দিচ্ছে আপনি ধরে নিচ্ছেন সে তথ্যটা সত্য। কিন্তু অনলাইনে তা ঘটার সম্ভাবনা কম। অনলাইনে একজন মানুষ যখন আপনাকে কোনো তথ্য দিল তখন আপনি জানেন না তথ্যটি সত্য কি না। কারণ যখন কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দিচ্ছে এটা তার নিজের তৈরি করা কনটেন্ট। যেহেতু এই মাধ্যমটিতে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ নেই তাই এই তথ্যটি সত্য কি না বাকিরা তা জানতে পারছে না। সে কারণে তথ্যদাতার প্রতি ব্যবহারকারীদের আস্থা থাকে না, কারণ তারা তাকে চেনে না।
সুতরাং অনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার পার্থক্য হচ্ছে এটাই, যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কনটেন্ট দিচ্ছে তার প্রতি আমার আস্থা আছে কি না। যদি কনটেন্টটা আমি আস্থাশীল জায়গা থেকে আনতে পারি এটা শিক্ষায় সহযোগী হিসেবে কাজে লাগানো যাবে। তাই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রয়োজন। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে যখন সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে তখন যথাযথ শিখন-শিক্ষণ হবে। আমরা যদি ইতিহাস দেখি তাহলে দেখা যাবে বারবার শিক্ষকের বিকল্প খোঁজা হয়েছে শিক্ষার ইনপুট খরচ কমানোর জন্য। বাংলাদেশেও আমরা এই প্রবণতাটা লক্ষ করছি। সেটা হচ্ছে একজন বিখ্যাত শিক্ষক বা একটি বিখ্যাত কলেজের একজন শিক্ষকের ক্লাস রেকর্ড করে সারা বাংলাদেশে আমরা শিক্ষার্থীদের মাঝে দিয়ে দেব এবং শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে শিখবে। কিন্তু দেখা যাবে শিক্ষার্থীরা শিখছে না। হয়তো শিখবে কিন্তু সেই শিক্ষা হবে সামাজিকতা ও বাস্তবতা বিবর্জিত। যেমন ১৯২০ থমাস এডিসন বলেছিলেন যে, মোশন পিকচার আসায় টেক্স বই উঠে যাবে। সবাই ভিডিওর মাধ্যমে টেক্স বইয়ের উপাত্তগুলো পেয়ে যাবে। কিন্তু আজকে এত সামাজিকমাধ্যমের যুগেও টেক্স বই উঠে যায়নি। আমাদের বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর প্রায় ৩৫-৪০ কোটি বই আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়। এটা এমনি এমনি দেয় না, এটার প্রয়োজন আছে বলেই দেয়। এরপর রেডিও দিয়ে, টেলিভিশন দিয়ে শিক্ষকের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন অনলাইন এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষকের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই জায়গা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। আরও অনেক চিন্তা-ভাবনার পর আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে। এখন এই মাধ্যমগুলো পরিণত বয়সের শিক্ষিত মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা পরিবর্তন করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমরা যদি দেড়শ বছরের পুরনো ক্লাসরুমগুলো দেখি তাহলে দেখব শিক্ষক ক্লাসে আছেন এবং শিক্ষার্থীরা তার সামনে বসে আছে। আজকের ক্লাসরুমগুলোও মোটা দাগে একই অবস্থা। শিক্ষক সামনে আছেন শিক্ষার্থী বসে আছে হয়তো ভিন্নভাবে। হ্যাঁ, আমরা এখানে প্রযুক্তির পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি। ক্লাসরুমে স্মার্ট বোর্ড সংযুক্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে ল্যাপটপ পৌঁছে গেছে। এ ছাড়া আর কোনো পার্থক্য হয়নি। ব্লেন্ডেড লার্নিং-এ কিছুটা পরিবর্তন হলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবর্তন নাও হতে পারে। তবে প্রথম যখন রেডিও আবিষ্কার হয় তখন বলা হয়েছিল শিক্ষকের বিকল্প আমরা পেয়ে গেছি। এখন আমাদের আর এত শিক্ষক লাগবে না। আমরা লেকচার তৈরি করে রেডিওতে দিয়ে দেব। সেখান থেকেই শিখন-শিক্ষণ হবে। এই চেষ্টা করা হয়েছে অনেকদিন। এরপর আসল সম্প্রচার মাধ্যম। এটি আরেকটি সামাজিকমাধ্যম। এখন সম্প্রচারমাধ্যমে আমরা অনেক কিছু শুনতে পাচ্ছি কিন্তু রেডিও বা সম্প্রচার মাধ্যম শিক্ষকদের বিকল্প হতে পারেনি। আফ্রিকাতে রেডিও দিয়ে শিক্ষকতা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারা রেডিওর সামনে লিসেনিং ও বাউডাউন পদ্ধতির মাধ্যমে চেষ্টা করেছে। কিন্তু দেখা গেছে, মানুষ সেভাবে শিখছে না। এরপর ১৯৫০ সালে টেলিভিশন দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। এই পদ্ধতি বাংলাদেশে আমরাও অনুসরণ করছি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ে টেলিভিশনের মাধ্যমে শিক্ষা দিচ্ছে। কিছু বিষয় আমরা এখান থেকে শিখতে পারব কিন্তু সব বিষয় আমরা এখান থেকে শিখতে পারব না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
নেতিবাচক দিক
যেহেতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবার জন্য উন্মুক্ত এখানে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই নেই সেহেতু এই মাধ্যমে অনুপযুক্ত ছবি, সংবাদ এবং ঘটনা সরবরাহ করতে পারে। তাই এই মাধ্যমে হতাশা, গুজব, ব্ল্যাক মেইলিং, ভুয়া পরিচয়, আসক্তি ব্যাধির মতো ঝুঁকিসহ অন্যান্য ঝুঁকি রয়েছে।
এই ঝুঁকির কারণ শিক্ষার্থীদের যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের অধিকাংশের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়া বসবাস করা সম্ভব না। তারা কিছু সময়ের জন্যও তাদের ফোন বন্ধ রাখতে পারে না। এ কারণে তাদের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উদ্বেগ, চাপ, হতাশায় ভোগা, ব্রেন ওয়াশিং, বিবাহ বিচ্ছেদ, ট্রলিং, সাইবার-বুলিং, গোপনীয়তা লঙ্ঘন, অনলাইন উইচ হান্টের মতো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে। এ কারণে তারা মানসিক এবং শারীরিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে এবং খারাপ ফলাফলসহ খিটখিটে আচরণ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের
ইতিবাচক দিক
তবে এই মাধ্যমটির রয়েছে বেশকিছু ইতিবাচক দিক। এই মাধ্যমের ব্যবহারকারীদের অনেকেই মনে করে থাকে তার অর্জিত জ্ঞান সে অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করবে। বিশ^বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থী শিখবে তবে সে যদি আরেকটু অতিরিক্ত শিখতে বা জানতে চায় তাও সম্ভব কারণ সে যেকোনো বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাগাভাগি করলে তার ফলাবর্তন পাবে। সেখানে সহপাঠী এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারবে, শিক্ষক এবং সহপাঠীদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া গ্রহণের ক্ষমতা এবং আদান-প্রদান হওয়া বার্তাগুলোর প্রতিফলনের সুযোগ থাকে। চিন্তা-ভাবনা বহিঃপ্রকাশ, আলোচনা করা, অন্যের আইডিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা এবং প্রদত্ত সমস্যার একটি গ্রুপ সমাধানের জন্য একসঙ্গে কাজ যায়। সমালোচনামূলক চিন্তা-ভাবনার দক্ষতা বিকাশ করার পাশাপাশি নিজের প্রতিফলিত জ্ঞান ও অর্থের সহনির্মাণ করার দক্ষতা অর্জন করা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কোলাবোরেটিভ উপায়ে সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটা সম্ভব। শিখন-শিক্ষণের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কিছুটা হলেও ঘটতে পারে। কোলাবোরেশন, যোগাযোগের ফলাবর্তন এবং সমালোচনামূলক চিন্তাধারার দক্ষতা আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় সেভাবে কাজে আসে না, যদি শিক্ষক দ্বারা সরাসরি শিক্ষা দেওয়া না যায়। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজ হচ্ছে যেকোনো তথ্য সঙ্গে সঙ্গে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। তার জন্য প্রয়োজন সমালোচনামূলক চিন্তাধারার। যদি তথ্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে আসে এবং শিক্ষক এই তথ্যটা সব শিক্ষার্থীর মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারে সে ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একজন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মাঝে সঠিক তথ্য সরবরাহ করতে পারে। শিক্ষক যদি চায় তার ১০ জন শিক্ষার্থী বা অনেক শিক্ষার্থী একটা বিষয়ের ওপর একসঙ্গে কাজ করবে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভব। কারণ এখানে কোনো বিষয় শেয়ার করে শিক্ষক সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রতিক্রিয়া পাবেন যা অন্য কোথাও সম্ভব না। এগুলো শিক্ষায়
যখন শিক্ষার্থীরা পাবে তখনই শিক্ষা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সহযোগী হিসেবে কাজে আসবে।
শিক্ষা হঠাৎ করে হয় না। শিক্ষা হচ্ছে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এখানে কিছু আগে পড়তে হয় কিছু পরে পড়তে হয়। এই ধারাবাহিকতটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেভাবে পাওয়া যায় না। আমরা যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ব্যবহার করে শিক্ষককে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করি তাহলে শিখন-শিক্ষণটা সেভাবে হবে না। শিক্ষা যেহেতু সামাজিকতার সঙ্গে জড়িত তাই শিক্ষকের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ থাকতে হবে। তা না হলে শিক্ষার্থী সমাজের সঙ্গে চলতে পারবে না। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু জ্ঞান দিতে পারবে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সামজিক করে তুলতে পারবে না। হঠাৎ যদি কারও নতুন স্কিল প্রয়োজন হয় তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তা দিতে পারবে।
বর্তমান বাস্তবতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য একটি অংশ। এখন এই মাধ্যমটিকে আর শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব না। বর্তমানে আমাদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত শিক্ষায় একে আমরা কতভাবে কাজে লাগাতে পারি তার নতুন পথের সন্ধান করা। কারণ আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই মাধ্যমে এতটাই আসক্ত যে, তারা এর বাইরে চিন্তাও করতে পারছে না। এই মাধ্যমটিকে বাদ দিয়ে অন্য কিছু চিন্তা করাও আমাদের উচিত হবে না। কিন্তু ভুল হবে যদি আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প হিসেবে ভাবতে থাকি। আমরা যদি ভাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষক, বাস্তব বন্ধুত্ব এবং বাস্তব যোগাযোগোরে বিকল্প তাহলে বিরাট ভুল-ই হবে না, জাতি হিসেবে আমাদের সর্বনাশের পথ রচনার জন্য যথেষ্ট মূল্য দিতে হবে।

অধ্যাপক, উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]