ই-পেপার শনিবার ২৩ নভেম্বর ২০১৯ ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার শনিবার ২৩ নভেম্বর ২০১৯

জেলার রাজনীতি : কিশোরগঞ্জ
শক্তিশালী অবস্থানে আওয়ামী লীগ বিএনপি কোন্দলে জর্জরিত
নূর মোহাম্মদ কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৮.১১.২০১৯ ১১:১০ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 125

শক্তিশালী অবস্থানে আওয়ামী লীগ বিএনপি কোন্দলে জর্জরিত

শক্তিশালী অবস্থানে আওয়ামী লীগ বিএনপি কোন্দলে জর্জরিত

তেরোটি উপজেলা নিয়ে গঠিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা কিশোরগঞ্জ। এখানে আওয়ামী লীগের অবস্থান বরাবরই শক্তিশালী। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে গুরুদায়িত্ব পড়েছে কিশোরগঞ্জের বরেণ্য রাজনীতিকদের কাঁধে। 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবর্তমানে দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে ভৈরবের কৃতী সন্তান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান এবং দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ কিশোরগঞ্জের কৃতী সন্তান। বিভিন্ন সময়ে এখানকার বরেণ্য ব্যক্তিরা সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। তাই কিশোরগঞ্জের রাজনীতি একটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। টানা তৃতীয়বারের মতো দল ক্ষমতায় থাকায় অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে দলীয় কর্মকাণ্ডের চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক তৎপরতায় বেশি নজর দলীয় নেতাকর্মীদের। মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টিও (জাপা) আছে সুবিধাজনক অবস্থানে। জাপার সংগঠনও কিশোরগঞ্জে ভালো অবস্থায় রয়েছে। 

অন্যদিকে ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং চেয়ারপারসন জেলে থাকায় অনেকটা কোণঠাসা বিএনপি। দলের দুঃসময়েও জেলা বিএনপি বিভক্ত বহু ধারায়। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত হয়ে পড়েছে জেলা বিএনপি। অন্যদিকে মামলা-মোকদ্দমার জন্য গ্রেফতার এড়াতে রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন অনেক নেতাকর্মী। অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলো তাদের সাধ্যমতো নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে।

কিশোরগঞ্জে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনি আসন ছিল সাতটি। এর মধ্যে পাঁচটিতে জয় পায় বিএনপি। দুটিতে নির্বাচিত হয় আওয়ামী লীগ। পরের বার ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতটি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। 

আর ২০০৬ সালে নির্বাচন কমিশন সংসদীয় আসন সংখ্যা নতুন করে বিন্যাস করে। এতে নির্বাচন কমিশন একটি আসন কমিয়ে দেয়। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনেই জয় পান মহাজোট প্রার্থীরা। এর মধ্যে জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি, আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও পালন করেন এলজিআরডিমন্ত্রীর দায়িত্ব। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জেলার ছয়টি নির্বাচনি আসনের সবক’টিতে জয় পান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রার্থীরা। পাঁচটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হন। একটি আসন (কিশোরগঞ্জ-৩) ছেড়ে দেওয়া হয় জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুকে। তবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুর পর এই প্রথমবারের মতো কোনো মন্ত্রী না থাকায় অনেকটা উন্নয়নবঞ্চিত জেলাবাসী।

আওয়ামী লীগ : টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। তাই কিশোরগঞ্জে বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দলটি। তবে নীরব হলেও দলীয় কোন্দলে অনেকটা অস্বস্তিতে রয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর পর ২০১৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের উপস্থিতিতে এই সম্মেলনে অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান শাহজাহানকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট এমএ আফজলকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের এমপি নির্বাচিত হন তার ছোট বোন সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি। জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির চেয়ে এলাকার উন্নয়ন এবং সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নেই তিনি বেশি সময় দেন। জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা এমপির সঙ্গে সমন্বয় করে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন। জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির মেয়াদ শেষ হতে চললেও নানা জটিলতায় এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ উপজেলায় সম্মেলন করা যায়নি। এতে দলীয় কর্মকাণ্ডে কিছুটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। তবে দল ক্ষমতায় থাকায় দলীয় কোন্দল খুব একটা দৃশ্যমান হয় না।

দলের অন্য পাঁচটি আসনের মধ্যে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে গত নির্বাচনে জয়ী পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদের সঙ্গে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিনের বিরোধ আছে। কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে মহাজোট থেকে নির্বাচিত জাপা নেতা মুজিবুল হক চুন্নুর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরোধ অনেক পুরনো। এখানে প্রায় ২০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন হচ্ছে না। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখার পাশাপাশি এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। তার বিষয়ে নির্বাচনি এলাকায় কোনো মতবিরোধ নেই। কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের এমপি এম আফজাল হোসেন বর্তমানে বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার নির্বাচনি এলাকায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রুপিং থাকলেও বেশিরভাগ নেতাকর্মীই এমপির পক্ষেই আছেন। আগামী ১২ নভেম্বর বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন। আবারও তিনিই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে পারেন বলে মনে করেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ছেলে নাজমুল হাসান পাপন কিশোরগঞ্জ-৫ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসন থেকে টানা তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমএ আফজাল জানান, জেলা আওয়ামী লীগ নির্বাচিত এমপিদের সঙ্গে সমন্বয় করে দল পরিচালনা করছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন কমিটি হওয়ার পর থেকে কোনো উপজেলা সম্মেলন করা যায়নি। তবে এতে দলীয় কর্মকাণ্ডে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত কীভাবে উপজেলা সম্মেলন করা যায়।

বিএনপি : কিশোরগঞ্জে জেলা বিএনপিতে রয়েছে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল। কোন্দলে কোন্দলে জর্জরিত জেলা বিএনপি। বহুধারায় বিভক্ত দলের নেতাকর্মীরা দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন যে যার মতো করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিগত জোট সরকারের সময় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুককে সভাপতি ও ওয়ালীউল্লাহ রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রাথমিকভাবে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু দলীয় কোন্দলের কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা যায়নি। 

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর দু’গ্রুপের পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সম্মেলন। এর আগের দিন সম্মেলনের আসার পথে দলের প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমানের উপস্থিতিতে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে সভাপতি ও মাসুদ হিলালীকে সাধারণ সম্পাদক করে বিএনপির জেলা কমিটি গঠন করা হয়। 

অন্যদিকে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান সিকদারের সভাপতিত্বে বিএনপির বিদ্রোহী গ্রুপের পাল্টা সম্মেলনে অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান ভূঁইয়াকে সভাপতি করে কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। সবশেষ ২০১৬ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে শিল্পপতি মো. শরীফুল আলমকে সভাপতি ও মো. মাজহারুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। জেলা বিএনপির কার্যকরী কমিটির অনেক নেতাকর্মীই ঢাকায় থাকেন। ফলে দলীয় কর্মকাণ্ডে কখনই গতি আসে না। এ ছাড়া দল দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং দলের চেয়ারপারসন কারাগারে থাকায় জেলা বিএনপির রাজনীতি অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মীর নামে রয়েছে একাধিক মামলা। এ অবস্থায় পুলিশের ভয়ে মিছিল-মিটিং খুব একটা হয় না বললেই চলে। ছোট্ট পরিসরে দায়সারাভাবে পালন করা হয় কেন্দ্রীয় কর্মসূচি। 

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, দলের মধ্যে কোন্দল থাকলেও কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে সবাই অংশ নেয়। দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষে সম্মেলনের আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।

অন্যান্য দল : জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্ন বর্তমানে জেলা জাপার সভাপতি। তিনি কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের এমপি। মহাজোটের সঙ্গে থাকায় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া জেলা সিপিবি ও গণতন্ত্রী পার্টিসহ বাম ঘরানার ছোট দলগুলো সাধ্যমতো দলীয় কর্মসূচি ছাড়াও জনগুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পালন করছে। 

অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের বিচার হওয়ায় কার্যত দেওয়ালবন্দি হয়ে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]