ই-পেপার শুক্রবার ১৫ নভেম্বর ২০১৯ ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৫ নভেম্বর ২০১৯

শিল্পগুণ
আলপনার গ্রাম টিকইল
মো. তারেক রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ
প্রকাশ: রোববার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১০.১১.২০১৯ ১:২০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 57

আলপনার গ্রাম টিকইল

আলপনার গ্রাম টিকইল

আবহমানকাল ধরে বাঙালির উৎসবকে রাঙিয়ে তুলেছে বিভিন্ন কারুকার্যময় আলপনা। বর্তমান সময়েও একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনেও আলপনা আঁকা হচ্ছে। আমাদের উৎসব, পার্বণ বা বিভিন্ন দিবসে আলপনার ব্যবহার থাকলেও এর নামে কোনো গ্রামের নামকরণ হতে পারে, তা একটু অবিশ্বাস্য বিষয়। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের ‘টিকইল’ গ্রাম কিন্তু এখন ‘আলপনা গ্রাম’ নামেই পরিচিত।

এ গ্রামের দেয়ালে দেয়ালে রঙের খেলা। ঘরে ঘরে ক্যানভাস। আর এ ক্যানভাসই চাঁপাইনবাবগঞ্জের এ অজপাড়া গায়ের গৌরব। জেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম টিকইল। এ গ্রামের অর্ধশতাধিক বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে আলপনার শোভা। বাইরের দেয়াল থেকে শুরু করে ভেতরের দেয়াল, বৈঠকখানা, বারান্দা, এমনকি রান্নাঘর যেখানেই দেয়াল, সেখানেই রঙের ছোঁয়া।
বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে আঁকা হয় এসব আলপনা, যা দেয়ালে থেকে যায় সারা বছর। রঙ নষ্ট হলে আবার দেওয়া হয় তুলির আঁচড়। আর এসব আলপনা দেখতে অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন। তবে এসব আলপনা কোনো শিল্পীর আঁকা নয়। বাড়ির গৃহিণীদের হাতের তুলিতেই এমন শিল্পকর্মের সৃষ্টি। বংশ পরম্পরায় সৌন্দর্যবর্ধন ও দেবতার সুদৃষ্টি ও আশীর্বাদ কামনায় এ ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন টিকইল গ্রামের নারীরা।

নেজামপুর ইউনিয়নের হাটবাকইল বাজার থেকে উত্তর দিকের সড়ক ধরে এগোতেই চোখে পড়ে মাটির দেয়ালঘেরা সারি সারি বাড়ি। আর এসব বাড়ির দেয়ালে আঁকা রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আলপনা। এঁকেবেঁকে গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে গেছে এ পাকা সড়কটি। দুই ধারের সারি সারি বাড়িগুলোর সবই প্রায় কাঁচা। ছোট-বড় সব ধরনের বাড়িই মাটির দেয়ালে গড়া। এসব বাড়ি শুধু রঙিন দেয়ালগুলোর জন্য পথচারীদের নজর কাড়ে।

এই সড়ক ধরে কিছুটা যেতেই চোখ আটকে গেল একটি বাড়ির দেয়ালে। বাড়িটি ছোট। তবে বেশ পরিপাটি। জানা গেলে বাড়ির মালিক দাসু চন্দ্র বর্মন। পেশায় দিনমজুর। সরকারি

খাস জমিতে গড়ে তুলেছেন তিনি এ বসতবাড়ি। তবে বাড়ির দিকে চোখ পড়লেই যে কারও ইচ্ছে হবে একটু দাঁড়িয়ে যেতে। বাড়ির বাইরের দেয়ালে বিভিন্ন রঙ দিয়ে আঁকা ফুল, পাখি ও লতাপাতা, মেঝেটাও সুন্দর করে লাল মাটি দিয়ে লেপাপোছা।

বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে দাসু চন্দ্র বর্মনের স্ত্রী দেখন বালা বর্মনের সঙ্গে। কথা হয় ‘আলপনা’ ও আলপনা গ্রামের বিষয়ে। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় তার। এখন বয়স ৫২ বছর। লেখাপড়া করার সুযোগ তেমন পাননি। আলপনা আঁকার কৌশল কারও কাছ থেকে শেখেননি। তবুও প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি এই কাজ করে রাঙিয়ে রেখেছেন নিজের চারপাশ। তিনি জানান, তার হাত ধরে টিকইল গ্রামের অনেক মেয়ে ও বধূ আজ আলপনা আঁকায় হাত পাকিয়েছেন। আলপনার রঙিন উপস্থাপনায় পৌষ-পার্বণে বাড়ির দেয়ালগুলো হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় ও সুন্দর।

দেখন বালা বলেন, ‘ভালো লাগার জায়গা থেকে আলপনা আঁকা। এতে বাড়িঘর দেখতে ভালো লাগে। মানুষও ভালো বলে। প্রতিবছর আমি নকশা পরিবর্তন করি। যখন যেটা ভালো লাগে সেটাই আঁকি। প্রথমদিকে আলপনা আঁকার উপাদান প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করতাম। এখন বাজার থেকে কিছু রঙ, খড়িমাটি, চুন কিনে কাজ করি।’

দেখন বালার পাশেই রণজিৎ বর্মনের বাড়ি। তার বাড়িও একই রকম পরিপাটি। তিনি পেশায় দিনমজুর ও একজন কীর্তনশিল্পী। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বিভিন্ন আলপনা। রণজিতের স্ত্রী অনিতা বর্মন ও তাদের মেয়ে রিমা বর্মন এঁকেছেন এসব আলপনা।

 অনিতা বর্মন বলেন, ‘সাদা মাটি, লাল মাটি ও চুন দিয়ে প্রথমে দেয়াল লেপন করা হয়। পরে আতপ চালের গুঁড়া, খড়িমাটি, বিভিন্ন ধরনের রঙ, শুকনো বরই চূর্ণ আঠা, মানকচু ও কলাগাছের কস দিয়ে তৈরি রঙের মিশ্রণ দিয়েই আঁকা হয় এসব আলপনা।’

টিকইল গ্রামের রেখা বর্মন জানান, আমরা লক্ষী পূজা, কালী পূজা ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব পার্বণে, বিশেষ করে নবান্নে আলপনা এঁকে থাকি। আর এই আলপনা আমরা বাড়ির সৌন্দর্যবর্ধন ও দেবতাকে খুশি করতেও এঁকে থাকি।

লোকশিল্প গবেষক শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রভাষক কনক রঞ্জন দাস বলেন, ‘আলপনা একটি আদি শিল্প। হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েরা প্রতিটি পার্বণেই বাড়িঘরের শোভাবর্ধনে চোখ জুড়ানো বিভিন্ন আলপনা আঁকেন। যা বাঙালি মেয়েদের শিল্পগুণের পরিচয়কে তুলে ধরে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]