ই-পেপার শুক্রবার ১৫ নভেম্বর ২০১৯ ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার শুক্রবার ১৫ নভেম্বর ২০১৯

ধূমপান প্রতিরোধে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে
শাপলা রহমান
প্রকাশ: রোববার, ১০ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৯.১১.২০১৯ ১১:৫৯ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 40

৬০-এর দশকের নায়ক-নায়িকাদের বিবেচনা করা হতো ফ্যাশন আইকন হিসেবে। মনে করা হতো সমাজ-সংস্কৃতিতে নতুন কিছুর সংযোজনা তাদের হাত দিয়ে প্রবেশ করছে। ৬০-এর দশকের ভারতীয় বাংলা বা হলিউডি সিনেমার নায়কদের পাশাপাশি নায়িকাদের ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেটের দৃশ্য গোটা সিনেমা হলের পরিবেশটা পাল্টে দিত। আহা কী সাহসী সব ব্যাপার! সেসব দৃশ্য দেখে আমাদের দেশের স্কুল, কলেজগামী নারীরাও চাইত আগল ভাঙতে। তখনকার লিজেন্টদের কথা বলা, শাড়ি পরার স্টাইল, চুল বাঁধা, কাজল পরা চোখের সাঁজÑ সব কিছুতেই থাকত মাদকতার ছোঁয়া। মাঝখানে চার দশকের অধিক সময় পেরিয়ে গেছে। সেই ৬০-এর দশকের নায়িকাদের অনুকরণে চলা পোশাক-আশাকে পরিবর্তন এসেছে অনেকবার। কিন্তু নারীদের মুখে থাকা সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন আজও নেভেনি। বরং দিনকে দিন তা বেড়েই চলেছে। সিগারেট কোম্পানিগুলো নায়ক-নায়িকাদের ইমেজ কাজে লাগিয়ে আধুনিকতার ধুয়ো তুলে সেদিন যে ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল এখন তার পরিধিরও বিস্তার ঘটিয়েছে অনেক। তাদের চটকদার বিজ্ঞাপন আর অভিনব কৌশলের কাছে পুরুষের পাশাপাশি হেরে গেছে এদেশের সাধারণ নারীর বাস্তবতাবোধ। বোধ শূন্য মানুষগুলো ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়েছে। আনন্দ-বেদনার সঙ্গী ভাবতে শুরু করা সিগারেট বা তামাক পণ্য কখন তাদের ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে মরণের দিকে। সেদিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই যেন! নেই কোনো সচেতনতাবোধ। বলছি নারী ধূমপায়ীদের কথা। দেশে নারীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
বিশে^ নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা কম নয়। ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুসারে প্রতি ২০ জনের মধ্যে একজন নারী সিগারেটে আসক্ত। চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এর প্রতিবেদনে সিনিয়র গবেষক ডক্টর ইমানুয়েলা গাকিডোও বলেছেন, ‘বিশে^ প্রতি চারজনে একজন ধূমপান করছে। অকালে মৃত্যুর প্রধান একটি কারণ ধূমপান। ক্রোয়েশিয়া ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ ধূমপানের জন্য অন্যতম একটি দেশ। নারী ধূমপায়ীদের সংখ্যা কম মনে হলেও অবাক করা বিষয় হলো নারী ধূমপায়ীর তালিকায় বিশে^ বাংলাদেশ শীর্ষস্থান দখল করে আছে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া। নারী ধূমপায়ীদের সংখ্যার দিক থেকে বিশে^র ২২টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ২২টি দেশ নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে ক্রোয়েশিয়া উইক জানায়, বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি ধূমপান করে। আর এ ধূমপায়ী নারীদের মধ্যে ২৪ শতাশংই শিক্ষার্থী। টিনেজারদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। স্কুল-কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় থেকে শুরু করে চাকরিজীবীরাও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ জাতীয় য²া নিরোধ সমিতি ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, দেশে মোট নারীর দুই কোটিরও কিছু বেশি ধূমপানে আসক্ত।
অন্য এক তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ১৪.৬ শতাংশ পুরুষ ও ৫.৭ শতাংশ নারী তামাক ব্যবহারের কারণে মারা যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে জানা যায়, দেশে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের প্রবণতা নারীদের মধ্যে বেশি। এখানে ২৭.২ শতাংশ বা ২ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক
সেবন করে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল ২০০৩ সালে প্রণীত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল চুক্তিতে বাংলাদেশ ছিল প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ। ২০০৪ সালে অনুস্বাক্ষরের পরেও বাংলাদেশ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০৫ মোতাবেক ২০০৬ সালে নীতি প্রণীত হয়। এ আইনে ধোঁয়াবিহীন তামাক দ্রব্য সম্পর্কে কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ফলে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য যেমনÑ গুল, জর্দা এবং খৈনী যা অধিকাংশ মানুষ সেবন করে সেসব সম্পর্কে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। ২০১৩ সালে নতুন আইন ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (২০১৩ সালের সংশোধনীসহ) সংসদে পাস হয়। সংশোধিত আইনে সব রকম ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য আইনের আওতায় আনা হয়।
ধূমপান নারী-পুরষ নির্বিশেষে সবার জন্যই ক্ষতিকর। তবে জিনগত কারণে নারী ধূমপায়ীর বিপদ তুলনামূলক অনেক বেশি। সন্তান ধারণে জটিলতা ও সন্তানের জীবনও হয়ে ওঠে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। ধূমপায়ী নারীর সন্তান গর্ভ থেকেই নানা ত্রæটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে তামাকের ওপর উচ্চহারে করারোপ, সিগারেটের প্যাকেটে ছবি ও সতর্কবাণীসহ কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তার প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া নারীদের ধূমপান থেকে বিরত করতে প্রয়োজন কাউন্সেলিং। প্রয়োজন পরিবারের সহযোগিতা। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ
নিতে হবে।

উন্নয়নকর্মী






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]