ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

বাজার সয়লাব নকল কসমেটিকসে
ব্যবহারকারীরা আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৪.১১.২০১৯ ১:১১ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 354

ব্যবহারকারীরা আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে

ব্যবহারকারীরা আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগ ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে

নকল ও ভেজাল কসমেটিকসে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। সাবান, শ্যাম্পু, পাউডার, ক্রিম, লোশন এবং বডি স্প্রে থেকে শুরু করে সবধরনের কসমেটিকস অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল করে বাজারে ছাড়ছে। তাই হাত বাড়ালেই মিলছে নকল আর ভেজাল কসমেটিকস। মোড়ক দেখে কারও বোঝার সাধ্য নেই কোনটি আসল আর কোনটি নকল। নকলের ভিড়ে কেনা হচ্ছে প্রসাধনীর নামে এক ধরনের বিষ। তাছাড়া নকল প্রসাধনীর কারণে আসলগুলো চেনাও বড় দায় হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর কেরানীগঞ্জ ও আশপাশ এলাকায় শত শত ভেজাল কসমেটিকস তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানা থেকে ভেজাল কসমেটিকস প্রথমে আসছে দেশের সববৃহৎ পাইকারি কসমেটিকসের বাজার চকবাজারে। সেখান থেকে চলে যাচ্ছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দোকান থেকে ভোক্তার হাতে। আর এসব ভেজাল কসমেটিস ব্যবহার  করে ভোক্তারা আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগ, ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে।

এদিকে বুধবার ঢাকার কেরানীগঞ্জের আতাসুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকার নকল জনসন বেবি লোশনসহ বিভিন্ন ধরনের ভেজাল কসমেটিকস জব্দ করে র‌্যাবের একটি টিম। এ ঘটনায় মোট গ্রেফতার করা হয়েছে ৫ জনকে। মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম।

অভিযানে গিয়ে র‌্যাব সদস্যরা দেখতে পায়, নানা কেমিক্যাল মিশিয়ে একটি বড় পাতিলে চুলায় রেখে জনসন বেবি লোশন তৈরি করা হচ্ছে। দেড়ঘণ্টা পর চুলা থেকে নামিয়ে সেগুলোতে সুগন্ধি মিশিয়ে বাজারের জনসন বেবি লোশনের হুবহু নকল বোতলে ঢোকানো হচ্ছে। এগুলো প্রথমে রাজধানীর চকবাজারে এবং সেখান থেকে চলে যায় দেশের সব জায়গায়।

জনসন বেবি লোশনের পাশাপাশি এখানে জনসন বেবি অয়েল, অলিভ অয়েল, কুমারিকা হেয়ার অয়েল, ডাবর আমলা তেলসহ মোট ২৬টি বিদেশি পণ্যের নকল মালামাল উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব জানায়, অতিরিক্ত লাভের আশায় এসব নকল পণ্য তৈরি করছে একটি চক্র, সাথে জড়িত বাড়ির মালিকরা।

অভিযানের বিষয়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, এখানকার কসমেটিকস এখান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এসব বেবি লোশন, বেবি হেয়ার অয়েল ইত্যাদি বাচ্চাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এমনকি বাচ্চাদের ক্যানসারের কারণ হতে পারে এসব নকল সামগ্রী। এসব পণ্য কিনে ক্রেতারা যেমন প্রতারিত হচ্ছে, একইভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।

এ অভিযানের বিষয়ে সরোয়ার আলম সময়ের আলোকে আরও বলেন, শিশুদের জন্য ব্যবহার্য বডি লোশন, শ্যাম্পু, তৈল, মেহেদি এবং ফ্রেস ওয়াশ নকল তৈরি করে বাজারজাত করছে একটি চক্র। এ সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-১০-এর সহযোগিতায় মঙ্গলবার রাত ৯টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এ সময় দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের মানহীন কেমিক্যাল ও পাউডার ব্যবহার ও অদক্ষ শ্রমিক দ্বারা শিশুদের ব্যবহার্য নকল প্রসাধনী সামগ্রী দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখের আড়ালে কেরানীগঞ্জে আতাসুর এলাকায় এসব নকল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করে আসছে। পণ্যগুলো হলোÑ জনসন বেবি লোশন, অলিভ অয়েল, শ্যাম্পু, ডাবর আমলা হেয়ার অয়েল, স্বর্ণালি কুমকুমাদি হেয়ার অয়েল, অলিটালিয়া (ইতালিয়াল স্কিন কেয়ার), স্বর্ণালি স্পট স্কিন ক্রিম, মেহেদি, ইমামি সেভেন ওয়েল ইন ওয়ান ডেমেজ হেয়ার অয়েল এবং জনসন মিল্ক। এসব পণ্য শিশু এবং বড় সবার জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, এসব নকল প্রসাধনী সামগ্রী তৈরির ক্ষেত্রে নকল কেমিক্যাল ব্যবহার ও অননুমোদিত কেমিক্যাল ব্যবহারে অনিয়মের কারণে কারখানা মালিক মো. দোলন খান, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. ডালিম হোসেন, মো. রিয়াজ হোসেনসহ মোট ৬ জনকে ২ বছর করে কারাদণ্ড এবং ৩ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়।

সরোয়ার আলম আরও বলেন, মূলত লাভ বেশি করার জন্যই এসব অসাধু ব্যবসায়ী এ রকম ভেজাল কারবারের সঙ্গে জড়িত হয়েছে। জনসনের একটি ভেজাল বেবি লোশন তৈরিতে সর্বোচ্চ ২৫-৩০ টাকা খরচ হয় তাদের। অথচ তারা এটি বাজারে বিক্রি করছে ২০০-২৫০ টাকায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে এক বোতলে ১৭০-২২০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যানটিন প্রো-ভি শ্যাম্পু, গার্নিয়ার, হেড অ্যান্ড শোল্ডার, লরেল, রেভলন ও প্যানটিন, নিভিয়া লোশন, লাক্স লোশন, মাস্ক লোশন, অ্যাকুয়ামেরিন লোশন, ফেড আউট ক্রিম, ডাভ সাবান, ইমপেরিয়াল সাবান; সুগন্ধির মধ্যে হুগো, ফেরারি, পয়জন, রয়েল, হ্যাভক, কোবরা সবই এখন ভেজাল আর নকলে ভরা। আরও রয়েছে অলিভ অয়েল, কিওকারপিন, আমলা, ভ্যাসিলিন হেয়ার টনিক, জিলেট ফোম, আফটার সেভ লোশন, জনসন, প্যানটিন প্রোভি ও হারবাল অ্যাসেনশিয়াল লোশন। কসমেটিকস দোকানগুলোতে রকমারি এসব বিদেশি পণ্যের সমারোহে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কী নেই! বিশ্বের সব নামকরা ব্র্যান্ডের প্রসাধন সামগ্রী থরে থরে সাজানো।

হুবহু একই ধরনের মোড়কে তৈরি করা এসব নকল প্রসাধনী বাইরে থেকে দেখে সাধারণ কোনো ক্রেতার পক্ষে বোঝার উপায় নেই যে এটি নকল। আসল আমদানিকারকের স্টিকারের মতো হুবহু স্টিকারও লাগানো রয়েছে নকল সব পণ্যের প্যাকেটের গায়ে। রয়েছে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ছাপ। সরকারের তদারকি সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে অবাধে তৈরি ও বাজারজাত করা হচ্ছে এসব প্রসাধন সামগ্রী।

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার বিভিন্ন পারফিউমের দোকান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে এসব নকল প্রসাধনী তৈরি করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চকবাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, সাবান পানি, কেমিক্যাল আর খানিকটা পারফিউম বা সুগন্ধির মিশ্রণে অনায়াসে তৈরি করা যায় শ্যাম্পু। নামিদামি ব্র্যান্ডের খালি বোতল জোগাড় হয় বিভিন্ন টোকাই আর ভাঙাড়িওয়ালার কাছ থেকে। এগুলোতে ভরে বাজারজাত করা হয় ওইসব শ্যাম্পু। পুরান মেশিনের জং বা মরিচা তোলা হয় এমন তেলের সঙ্গে সুগন্ধি মিশিয়ে ফেলে দেওয়া প্যারাসুট, গন্ধরাজ ও জুঁই তেলের কৌটায় ভরে বাজারজাত করা হয়।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]