ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

পরাবাস্তব প্রণয়
পারভীন সুলতানা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 25

সূর্যের শেষ রঙ ঘাসের শীর্ষে, এপিটাফের সোনালি অক্ষরে অলস শুয়ে আছে। একটুখানি লেপ্টে আছে ঝুঁকে থাকা অরিদ্রির নিখুঁত নাকের ডগায়, সমাধি সৌধের এপিটাফের লেখাগুলো খুব দরদ আর কৌতূহল নিয়ে পড়া শেষ করে ও। সকাল এগারটায় স্রেফ একটা মিনারেল ওয়াটার সঙ্গে নিয়ে ঢুকেছে অরিদ্রি। এতটা সময় কাটানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল না অবশ্য। কিন্তু এখানে ঢোকার পর এক ধরনের অব্যাখ্যাত অনুভূতি দরদি হাতে আটকে রাখে ওকে। কীভাবে দুপুর টপকে বিকাল নামল! মাঝখানে দুপুরের অভ্যেসি ক্ষিধে জানান দিচ্ছিল; কিন্তু ১৯ বছর বয়সি এ. ই. উইলসের সমাধিতে লেখা ‘এপিটাফ’ উজিয়ে ওঠা ক্ষিধেটাকে মুহূর্তে দমিয়ে দেয়- ‘নট জাস্ট টুডে, বাট এভরিডে ইন সিন্স উই রিমেমবার ইউÑপাপা অ্যান্ড মম।’
সেই কবে ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহীদ হয় এরা। কোন দূর দূর দেশের টগবগে তরুণেরা এখানে পেতেছে শেষ শয্যা! এরই মধ্যে হাতের মোবাইলে সঙ্গীদের একজনের দূরতম ডাক আসেÑ হ্যালো, এক ঘণ্টার কথা বলে একেবারে সারা দিনের জন্য লাপাত্তা? ফোন বন্ধ রেখেছ, কেন? অরিদ্রির কানে এ ডাক বড় কর্কশ শোনায়। ঘুমডোবা নির্জন রাতে হঠাৎ ঝনাৎ শব্দে কাঁচের গ্লাস ভেঙে যাওয়ার মতো অশোভন। বন্ধুর গলা অগ্রাহ্য করে লাল বাটনে তর্জনি টিপে অরিদ্রির চোখ স্থির হয় সামনের এপিটাফেÑ ‘টিল ইউ মিট অ্যাগেইনÑ আব্বু, আম্মু’। মাথা উঁচিয়ে অরিদ্রি বিড়বিড় করে পড়ে ক্যাপ্টেন রাখী, ইন্ডিয়ান আর্মি, বয়স ২১। অদেখা তরল একটা ব্যথার স্রোত কুলু কুলু বইতে থাকে অরিদ্রির বুকে। মাত্র একুশ বছর! অস্ফুট স্বরে প্রায় কঁকিয়ে ওঠে মেয়েটা। ‘তোমার দরদি চোখ আর মন দেখে কৃতজ্ঞ আমি।’ শব্দগুলো অদৃশ্য বাতাস ফুঁ মেরে চারপাশের নির্জনতায় প্রায় ছুড়ে মারলেও অরিদ্রির কানে সহজবোধ্য হয়েই ঢুকে পড়ে। অরিদ্রি অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে ক্যাপ্টেন রাখীর সমাধি ফলকের দিকে তাকায় আবার। Ñহ্যাঁ, আমি রাখী তুমি কি শুনতে পাচ্ছ আমার কথা? ভারতের দূর এক গ্রামে জন্মেছিলাম। কিন্তু দেখো শেষ শয্যা পেতেছি তোমার দেশের মাটিতে....। অরিদ্রির ঠোঁট দুটো অস্ফুট নড়ে ওঠেÑ শুনতে পারছি রাখী, তোমার সব কথা শুনতে পারছি...। স্রেফ অদেখা এক যুবক যার সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই তার উদ্দেশ্যে অরিদ্রি প্রত্যুত্তর করে। ছেলেটার জন্য বুকের পরতে পরতে দরদ আর ভালোবাসা জমতে শুরু করেছে। প্রেমও কি? অরিদ্রি অবশ্য তা বুঝতে পারে না। উপুর হয়ে সে সমাধি বেদিতে একটা ঘাসফুল রাখে।
ক্যাপ্টেন রাখী। ভারতের দূর কোনো গাঁয়ে হয়তো তার জন্ম। বয়স মাত্র ২১। ষাট বছরের সময় আবর্তনেও যার বয়োবৃদ্ধি ঘটেনি। হয়তো দীর্ঘকায়, টকটকে গৌরবর্ণ, বলিষ্ঠ গড়নের নবীন যুবক ছিল সে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মার যুদ্ধফ্রন্টে যারা আহত হয়, তারা সে সময়কার চট্টগ্রামের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মারা গেলে তাদেরই সাতশ পঞ্চাশ জনকে চিটাগাং আর সাতশ সাঁইত্রিশজনকে সমাধিস্থ করা হয় কুমিল্লা। এই এত কবরের ভিড়ে রাখীর জন্য বাড়তি দরদ অনুভব করে অরিদ্রি। রাখী নামটার জন্য বুকের ভেতর কোথাও শূন্যতা জমে আছে! কৈশোরের খেলার সাথী রাখী নীল ছিল ওর সহপাঠী। মিশনারি স্কুলের কো-এডুকেশন স্কুলে ক্লাস ফাইভ থেকে নাইন পর্যন্ত একসাথে পড়েছে দুজন। বাসাও ছিল পাশাপাশি; সকাল, দুপুর কত আনন্দ রচনা করেছে দুজন! কৈশোর যৌবনের মাঝামাঝি ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়া বন্ধু রাখী। বাবার সরকারি চাকরি সূত্রে শহর থেকে শহর বদলের জন্য ট্রেনে দেখা দৃশ্যের মতো কোথায় হারিয়ে গেছে সেই প্রিয় মুখ!
আলোর ঔজ্জ্বল্য ক্রমশ মলিন হয়ে চারপাশ ধূসর হয়ে ওঠে। অরিদ্রির ভেতর গুটিসুটি মারা নারীমূর্তি ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। দ্রুতপায়ে ধূসর অন্ধকার ও প্রায় নির্জন হয়ে যাওয়া ওয়ার সিমিট্রির বাইরে আসে অরিদ্রি।
রাখীর সমাধিটা সিমিট্রির একেবারে পেছনে। জায়গাটা সামনের ঢাল থেকে বেশ কিছুটা উঁচুতে। হঠাৎ চোখ নিবদ্ধ হয় অদূরে চুম্বনরত একজোড়া যুবক-যুবতির ওপর। পৃথিবীর মিষ্টি দৃশ্য হলেও এই পরিবেশে বড় বেমানান এই প্রেম। এখানে এভাবে দৃশ্যমান না হলেই ভালো হতো। কুমিল্লায় অরিত্রির এই প্রথম আসা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্টাডি ট্যুরে এসেছে ওদের দলটা। বাকিরা ময়নামতিতে। ওয়ার সিমিট্রির কাছে সম্পর্কীয় খালার বাসা বলে ও দলছুট হয়ে এখানে একা এসেছে। পড়ন্ত বেলায় আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে মোবাইলে সতীর্থদের অবস্থান জেনে রিকশায় চাপে অরিদ্রি।
ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের মাঝখান দিয়ে গড়িয়ে চলা রিকশায় বসে অরিদ্রি প্রকৃতি দেখায় মগ্ন হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই চলমান সবুজ অদৃশ্য হয়ে ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে শস্যহীন বিস্তীর্ণ ভূমির প্রান্তে হিন্দুস্তানের একটি গ্রাম। কোথাও ঘন শরবন আর কাঁটাঘাসের রাজত্ব। শুভ্র শরফুল বাতাসের দামাল দুষ্টুমিতে কিশোরীর চাপল্য নিয়ে মাঝে মাঝে দুলে উঠছে। এর মাঝখানে দীর্ঘকায় টগবগে এক তরুণকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্মিত ও অভিভূত হয়ে পড়ে অরিদ্রি। শস্যহীন ভূমিতে শুয়ে থাকা একপাল সাদা ভেড়ার আলস্যকে টপকে টপকে সেই যুবক অরিদ্রির দিকে এগিয়ে আসে। দূরস্থিত কোন এক অনির্দেশ স্থান থেকে ভেসে আসছে জাটদের অচেনা সুরের গান। যুবক একটু দাঁড়ায়, হয়তো কান পেতে শোনে সে সুরের খানিকটা মূর্ছনা, তারপর আবার হেঁটে আসে অরিদ্রির দিকেই। একটা আর্মি জিপের ধৈর্যহীন হর্নে সম্বিৎ ফিরে পায় অরিদ্রি। চোখের চারপাশে আবারও শুধু ময়নামতির সবুজ লাবণ্য; বিষণ্নতা ও মুগ্ধতার মিশেল অনুভব লেগে থাকে ওর মনে। কুমিল্লার বার্ডে কয়েক মিনিট পর বন্ধুদের সঙ্গে আবার মিলিত হয় অরিদ্রি।
পরদিন অরিদ্রিদের গ্রুপটা কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ট্রেনে বন্ধুদের জমাট আড্ডাতেও ও একা হয়ে থাকে। গতকালের ওয়ার সিমিট্রির অনুভূতি ভোঁতা হতে দেয় না অরিত্রি; বরং অদৃশ্য সাপনারে নিখুঁত চুখিয়ে রাখে।
বিকালে সবার সঙ্গে বিচে যায় অরিদ্রি। মুহূর্তে ওর সমস্ত বিষণ্নতা হরণ করে বিশাল বিস্তৃত সৌন্দর্য। সাগরের দুরন্ত ঢেউয়ের দূরাগত শব্দ ভেসে আসে। হাওয়ার শোঁ শোঁ উচ্ছ্বাস ধেয়ে আসা সে শব্দকে ক্রমাগত বাধা দেয়। চোখের সামনে কেবলই জলের রুপালি পাটাতন।
ক্লান্তিহীন দূরত্বকে অন্বেষণ করতে গিয়ে নিজের ছোট
পৃথিবীটাই খুঁজে পায় শুধু। অসহ্য এই সুন্দরও একসময় একঘেয়ে লাগে অরিদ্রির। এরকম দেখা ওকে সাহসী করে না। নিচে বসে বালির নরম আদরে আত্মসমর্পণ করে। পায়ের নিচ থেকে জল সরা চিকচিকে বালিতে জীবন খোঁজে। কিছুক্ষণ পর দু হাতে ভর দিয়ে একটু একটু উঠে দাঁড়ায়। তারপর এক দৌড়ে বিচের শুকনো বালিতে ওঠে। পুঁতির মালা ও ঝিনুকে সাজানো রঙিন জগতে ফেরে। রীতিমতো হাট বসেছে। কালো এক কিশোরের বাহুতে জমজমাট বাজার। কী নেই! বাহারি পুঁতি আর ঝিনুকের মালা, চুল আটকানোর ক্লিপ, কানের দুল, নৃত্যরত যুবতী ঝিনুক পুতুল...।
আফা নিবেন? ওর ডাকের আকুলতা আটকায় অরিদ্রিকে। অরিদ্রি ওর দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়Ñ কী নাম তোমার?
‘রাখী।’ একটা মালা হাতে তুলে নিয়ে ছেলেটার চিবুক ছুঁয়ে হাসে অরিদ্রিÑ রাখী, তোমার এই ঝিনুকের মালা কত?
বিশ টেকা, তয় আপনে নিলে একটু কম রাখুম।
কেন? অরিদ্রির গলায় কৌতূহল।
মেলাক্ষণ থাইকা ঘুরতাছি, অহনও বউনি অয় নাই।
অরিদ্রি একটু ঝুঁকে ওর চিবুকে আদর করেÑ কমে নিতে হবে না, এই নাও পুরো বিশ টাকা।
ছেলেটা টাকা হাতে নিয়ে খুশিতে রঙিন হয়ে ওঠে। অরিদ্রি আবার সমুদ্রের নীল দেখে। সাগরের অনির্দেশ বিস্তারের দিকে তাকিয়ে গলায় রাখীর রঙিন মালাটা পরে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]