ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

নেতৃত্ব বাছাই নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বিতর্ক
দুই দলেই সুশীল অংশ নিশ্চুপ, ত্যাগীরা বঞ্চিত
হাসিবুল ইসলাম বরিশাল
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৬.১১.২০১৯ ১২:৫৩ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 1131

নেতৃত্ব বাছাই নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বিতর্ক

নেতৃত্ব বাছাই নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বিতর্ক

বরিশালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখন দুই নেতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে আবর্তিত হয়েছে। দুটি দলেই স্থানীয় নেতৃত্ব বাছাই প্রক্রিয়া বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু মহানগরের শীর্ষ দুই নেতার রোষের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ-বিএনপির সুশীল অংশের নেতারা নিশ্চুপ রয়েছেন। আর এতে বঞ্চিত হচ্ছেন ত্যাগী নেতারা।

একদিকে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এবং অন্যদিকে সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার অগ্রভাগে থেকে দলে নিজেদের নেতৃত্বের বলয় বিস্তার বা অটুট রাখতে নানা কৌশল নিয়েছেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি গঠনে সাদিক অনুসারীদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টায় নেতৃত্বে নিয়ে আসা হচ্ছে অপরিপক্ব ব্যক্তিবিশেষকে।

অন্যদিকে বিএনপির রাজনীতিতে নিজের বিরুদ্ধাচরণকারীদের কৌশলে সাইজ করতে দলের অঙ্গ সংগঠনের নবগঠিত কমিটিতে সরোয়ার অনুসারীরাই ঠাঁই পেয়েছে। এ নিয়ে উভয় দলের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও প্রকাশ বা প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পান না সুশীল অংশের নেতারা। উভয় নেতা বিতর্ক অনুভব করলেও নিজেদের সিদ্ধান্তে তারা অনড় থাকেন।

বরিশালে ঘরোয়া রাজনীতি জমে উঠেছে। যদিও উত্তাপ নেই। কিন্তু বরিশালের রাজনীতি নিয়ে সরস আলোচনা শোনা যায়। এসব আলোচনায় উঠে আসে দুই নেতার নীরব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রসঙ্গ।

দুই নেতারই অভিন্ন টার্গেট হচ্ছে কেন্দ্রে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়ে বরিশাল রাজনীতির নেতৃত্ব নিজেদের কব্জায় রাখা অর্থাৎ বিকল্প নতুন কোনো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে নারাজ উভয় নেতা। 

বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মহানগরের নেতৃত্ব নিয়ে দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই টানপড়েনের কথা শোনা যায়। 

দলীয় সূত্র জানায়, মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ তার রাজনীতির সূচনা থেকেই মহানগরের সভাপতি পদে আসীন হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে এগোতে থাকেন।

একই লক্ষ্যে পৌঁছতে সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ ও বর্তমান সংসদ সদস্য পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাহিদ ফারুক শামীমও কম সক্রিয় নন। কিন্তু রাজনীতির ঘেরাটোপে জেবুন্নেছা আফরোজ মাঠ থেকে ছিটকে পড়ে নিজের আশা-আকাক্সক্ষা মাটিচাপা দিয়েছেন বলে তার অনুসারীরা মনে করেন। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন জাহিদ ফারুক শামীম। বরিশাল জেলা কমিটির এই নেতা এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সাদিকবিরোধী অংশ এবং জেবুন্নেছার অনুসারীরা তার পাশে ভিড় জমিয়েছেন। এতে তার নিজের শক্তপোক্ত অবস্থান তৈরির প্রেক্ষাপটে মহানগরের নেতৃত্ব পাওয়ার আকাক্সক্ষা কেন্দ্রে জানান দিয়ে রেখেছেন। এ অবস্থা আঁচ করতে পেরে মহানগরের নেতৃত্ব নিজ নিয়ন্ত্রণে থাকা সাদিক আব্দুল্লাহ এবার আনুষ্ঠানিকভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চান।

এক. মহানগরের সভাপতি পদে নিজেকে নিয়ে আসা। দুই. জাহিদ ফারুক শামীমের অগ্রপথ আটকে দিয়ে বরিশাল রাজনীতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা।

যুগ্ম সম্পাদকের পদে আসীন থাকলেও সাদিক আব্দুল্লাহই বরিশাল আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। সংগঠনে এ কথা চালু আছে যে, মহানগরের নেতৃত্ব যার হাতে থাকে, তিনিই সংগঠনের এক ধরনের সর্বেসর্বা। এসব বিবেচনায় সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ যেকোনোভাবেই হোক মহানগরের শীর্ষ পদে আসতে মরিয়া। গত কমিটিতে তিনি যুগ্ম সম্পাদক পদে আসার পেছনেও কৌশলগত কারণ রয়েছে। সিনিয়র নেতাদের নিজ অনুকূলে রাখতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়। এবার যোগ্য হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বের শীর্ষে নিজেকে নিয়ে আসতে ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মহানগরের সম্মেলনপূর্ব প্রাক-প্রস্তুতিতে চলছে ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি গঠন।

সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে মোট ৩০টি ওয়ার্ডের মধ্যে অধিকাংশের কাউন্সিল সম্পন্ন হলেও কৌশলগত কারণে নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। আবার কারও দাবি বিতর্কজনিত কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঘোষিত ৮টি ওয়ার্ডের গঠিত কমিটির সর্ব ক্ষেত্রেই সাদিক অনুসারীরাই প্রাধান্য পেয়েছেন। অন্য ওয়ার্ডগুলোতে তার মনঃপুত নেতৃত্ব এলেও ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করা এবং ছাত্রলীগের রাজনীতি করা তরুণদের শীর্ষ কাতারে নাম রাখায় তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত ইমরান মোল্লাকে নিয়ে প্রথম বিতর্ক দেখা দেয়। ত্রিশের কোঠায় পা দেওয়া ইমরান মোল্লা বিএনপি সমর্থিত পরিবারের সদস্য হওয়ায় এ কমিটি নিয়ে নিজ দলেই চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে সম্ভাব্য সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ফাহিম একই পথের পথিক হওয়ায় কমিটি ঘোষণা দেওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। অন্য ওয়ার্ডগুলোর পদপ্রত্যাশী অভিন্ন ধারার হওয়ায় কমিটি ঘোষণায় কালক্ষেপণ হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে নিজ ঘরানায় চরম বিতর্ক ও অসন্তোষ বিরাজ করায় সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এখন বিকল্প পথ খুঁজছেন। এই পরিস্থিতি উত্তরণ করে নিজ অনুসারীদের কীভাবে লাইমলাইটে নিয়ে আসা যায় সে কৌশল খুঁজছেন তিনি। 

দলঘনিষ্ঠ একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের অভিমত সাদিক আব্দুল্লাহ মাঠের রাজনীতিতে ফাইটিং পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওয়ার্ড নেতৃত্বে তরুণদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে এই বিতর্কের মুখে পড়েছেন। তা ছাড়া অন্য কোনো নেতার অনুসারীদের কমিটিতে স্থান না দেওয়ায় চাপা ক্ষোভ তো রয়েছেই। তবুও তিনি নিজ ছকের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে নারাজ। কমিটি গঠন নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা কোনো আমলে না নেওয়া এবং অন্য নেতাদের মতামত প্রাধান্য না দেওয়ায় ক্ষোভ ঘরের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু তারপরেও এ ক্ষোভ কেউ প্রকাশ করেন না সাদিক আব্দুল্লাহর আক্রোশের শিকার হওয়ার আতঙ্কে। নাম প্রকাশ করা হবে না শর্তে এমন তথ্যই এ প্রতিবেদকের কাছে প্রকাশ করেন মহানগরের বেশ কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা। 

এই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন জাহিদ ফারুক শামীমের অনুসারীরা। এই অংশের প্রত্যাশা তাদের নেতা মহানগরের নেতৃত্বে এলে ওয়ার্ড কমিটিগুলোতে নেতৃত্বের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। এ কারণে তারা নীরব।

অনুরূপভাবে একই অবস্থা বিরাজ করছে বিএনপিতেও। বিএনপিতে মজিবর রহমান সরোয়ার বিকল্প কোনো নেতা তৈরির সুযোগ দিতে নারাজ। তিনি সমকক্ষ কাউকে নেতৃত্বের অগ্রভাগে রাখতে না চাওয়ায় মহাগরের কমিটিসহ অঙ্গ সংগঠনসমূহে সরোয়ারনির্ভর নেতৃত্বই জায়গা পেয়েছে বলে মনে করেন দলের ত্যাগী নেতারা।

তাদের অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মেয়র সরোয়ার শুধু নির্বাচন নয়, নেতৃত্বের অগ্রভাগে থাকতেই তার অনুসারীদের সমন্বয়ে গোটা সংগঠনকেই একটি আলাদা রূপে দাঁড় করিয়েছেন। ছাত্র-যুব ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সম্প্রতি নতুন কমিটি ঘোষণার ক্ষেত্রে এই নেতার প্রাধান্য স্পষ্ট হয়েছে। সর্ব ক্ষেত্রে তার অনুসারীরা স্থান পাওয়ায় অন্য নেতাদের আস্থাভাজনদের বঞ্চিত হতে হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্রে এক নেতা দুই পদে থাকার বিধি-নিষেধ আরোপের যে নিয়ম কার্যকর রয়েছে তাও যেন বরিশাল প্রেক্ষাপটে নাটকীয়ভাবে উপেক্ষিত হয়েই রইল।

কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পদে আসীন হওয়ার পর মজিবর রহমান সরোয়ার একাধিকবার বরিশাল মহানগর বিএনপির সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নাটকীয় ঘোষণা দেওয়ার পরেও তাকে স্বপদেই বহাল থাকতে দেখা যাচ্ছে। মহানগরের নতুন কমিটি গঠনে নানা দৌড়ঝাঁপ দেখা গেলেও তা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না তাও প্রশ্নবিদ্ধ। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে পানি কম ঘোলা হয়নি। পাশাপাশি অঙ্গ সংগঠনের পদ বা স্থানবঞ্চিত নেতাদের ক্ষোভ তো রয়েছেই। বিতর্ক-ক্ষোভের কারণে বহুভাগে বিভক্ত বরিশাল বিএনপির ব্যাঘ্র সদৃশ সেই সাংগঠনিক শক্তি এখন নেই বলে দায়িত্বশীল নেতারা অভিমত পোষণ করেন।
বরিশাল শহরের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে ঘরোয়া উত্তাপ থাকলেও রাজপথে একেবারে নির্জীব রয়েছে। এই আবহে দুই নেতার গতিপথ অবশ্য দুই ধরনের।

সাদিক আব্দুল্লাহ প্রকাশ্যে থাকলেও সরোয়ার অন্তরালে থেকেই নিজের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া। দুই নেতার ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে সরস আলোচনা জিইয়ে থাকলেও হাইকমান্ড নিশ্চুপ রয়েছে।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে বরিশাল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বাছাই প্রক্রিয়া। এই রহস্যের গতিপথ উদঘাটনের চেষ্টায় বৃহস্পতিবার উভয় নেতার মন্তব্য জানতে দফায় দফায় মোবাইল ফোনে চেষ্টা করা হলে কোনো প্রান্ত থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]