ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ই-পেপার সোমবার ৯ ডিসেম্বর ২০১৯

৯ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মিলেছে ১ কেজি
পেঁয়াজের জন্য ‘যুদ্ধ’
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৭.১১.২০১৯ ১:০৬ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 100

পেঁয়াজের জন্য ‘যুদ্ধ’

পেঁয়াজের জন্য ‘যুদ্ধ’

ঘটনাস্থল রাজধানীর খামারবাড়ি মোড়। ৪৫ টাকা কেজি দরে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রির স্থান। বাজারে যেখানে এক কেজি পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় ঠেকেছে, সেখানে প্রায় ৭ ভাগ কম দামে পেঁয়াজ কিনতে ক্রেতারা ভোর ৬টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার অপেক্ষা শেষে মিলেছে এক কেজি পেঁয়াজ।

তবে এই এক কেজি পেঁয়াজের জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে প্রত্যেক ক্রেতাকে। তবে শনিবার খুচরা ৫ টাকার অজুহাত দিয়ে ৪৫ টাকার বদলে ৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে টিসিবির পেঁয়াজ। বিনিময়ে ক্রেতাকে দেওয়া হয়েছে এক কেজির কিছুটা বেশি পেঁয়াজ।

এ যেন রিলিফের ত্রাণ নেওয়ার দৃশ্য। ৮০ বছরের বৃদ্ধ, ক্র্যাচে ভর দিয়ে আসা পঙ্গু ব্যক্তি, ৭ বছরের শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষের ঢল নেমেছিল খামারবাড়ি মোড়ে। ৯-১০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কারও ভাগ্যে এক কেজি পেঁয়াজ জুটলেও ঠেলাঠেলিতে দুর্বল ব্যক্তি এবং অনেক নারীর ভাগ্যে জোটেনি পেঁয়াজ। আবার হাফিজুর রহমান নামের এক ক্রেতা দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থেকে এবং ঠেলাঠেলিতে মাথা ঘুরে পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হয়ে পেঁয়াজ ছাড়াই তাকে ঘরে ফিরতে হয়। আবার খামারবাড়ির আশপাশের রিকশাচালক, লেগুনাচালক এবং ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবকিছু ফেলে টিসিবির পেঁয়াজ কিনতে চলে আসে। এই শ্রেণির ক্রেতারাই একেক জন ৫-১০ বার পেঁয়াজ নিয়েছে। সেগুলো তারা পরে চড়া দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। অর্থাৎ নিজ নিজ কাজ ফেলে তারা এই কয়দিন টিসিবির পেঁয়াজ কিনে সেগুলো অন্যত্র বিক্রি করেই সারা দিনের রোজগার করছে। এদের কারণেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে পেঁয়াজ কিনতে পারেননি।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ডিলারের মাধ্যমে প্রত্যেক ট্রাকে এক টন করে পেঁয়াজ বিক্রি করছে গত প্রায় মাস খানেক ধরে। প্রতিটি বিক্রয় কেন্দ্রে সকাল ৯টার মধ্যে পেঁয়াজ ভর্তি ট্রাক আসার কথা, কিন্তু শনিবার খামারবাড়ি মোড়ে ট্রাক আসে সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর-দুপুর দেড়টায়। অথচ ক্রেতারা পেঁয়াজ কেনার জন্য ভোর ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। উন্মুক্ত স্থানে খাঁ খাঁ রোদে দুপুর পর্যন্ত পেঁয়াজের ট্রাক না আসায় ক্রেতারা অধৈর্য হয়ে পড়েন। তবুও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা। ভোর থেকে যেসব ক্রেতা লাইনে দাঁড়িয়েছেন তারা নিজ উদ্যোগেই সিরিয়াল নম্বর দিয়েছেন যাতে সুশৃঙ্খলভাবে পেঁয়াজ কিনতে পারেন। কিন্তু দেড়টার সময় যখন ট্রাক আসে তখন শুরু হয় হুড়োহুড়ি। হকার, রিকশাচালক এবং লেগুনাচালকরা ট্রাক ঘিরে ধরে একেকজন বারবার পেঁয়াজ নেওয়া শুরু করে। শিশু, বৃদ্ধ, নারী এবং প্রতিবন্ধীরা অনেকটা ছিটকে পড়েন লাইন থেকে। হুড়োহুড়ির মধ্যে ঢুকে যখন কেউ এক কেজি পেঁয়াজ হাতে পাচ্ছেন তার মুখে যেন যুদ্ধ জয়ের হাসি।

রাজধানীর রাজাবাজার এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জুলফিকার আলী সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু কোনোভাবে ট্রাকের আশপাশ আসতে পারছিলেন না। ঘামেভেজা শরীর নিয়ে ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন অসহায়ের মতো। পরে এক সংবাদকর্মীর অনুরোধে তাকে এক কেজি পেঁয়াজ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ২৫০ টাকায় পেঁয়াজ কেনার সামর্থ্য নেই। তাই ৪৫ টাকার পেঁয়াজ কিনতে সেই সকালে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার সিরিয়াল নম্বর ছিল ২০। কিন্তু হুড়োহুড়িতে আমি লাইন থেকে ছিটকে পড়ি। ভেবেছিলাম পেঁয়াজ হয়তো আজ আর জুটবে না। শেষ পর্যন্ত এক কেজি পেঁয়াজ পেয়ে ভালো লাগছে, কষ্ট সার্থক হয়েছে।

আরেক ক্রেতা ফুলবানু। বয়স ৬৫ বছর। লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সকাল ৭টায়। দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে আগে থেকেই ঘেমে একাকার। এরপর হুড়োহুড়ি শুরু হলে ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যান, পায়ে ব্যথাও পান তিনি। ট্রাকে বসে যারা পেঁয়াজ বিক্রি করছিলেন, তাদের নজরে আসায় ভাগ্যক্রমে এক কেজি পেঁয়াজ মিলেছে। কিন্তু তিনি কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে আসেন ভিড় ঠেলে। কাঁদছেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাবা আমি অসুস্থ মানুষ। অনেক কষ্ট করে সেই সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এক কেজি পেঁয়াজের জন্য এত কষ্ট আমি জীবনে করিনি। আমি বেশ কয়েকবার মাটিতে পড়ে গেছি, ব্যথা পেয়েছি। আরেকটু হলে মরেই যেতাম। আমি আর কোনো দিন আসব না এখানে পেঁয়াজ কিনতে।’

দুপুর দেড়টা থেকে বিকাল চারটা বাজতেই টিসিবির এক টন পেঁয়াজ শেষ। অনেক ক্রেতাকে পেঁয়াজ না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে দেখা গেছে। তবে লেগুনাচালক রফিক একাই নিয়েছে ১০ কেজি। সে ও তার হেলপার সবুজ বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে এই পেঁয়াজ নিয়েছে। কেন একাই ১০ কেজি পেঁয়াজ নিলেন-জানতে চাইলে কোনো জবাব ছাড়াই দিল দৌড়। তবে পাশে থেকে অন্য এক ক্রেতা জানালেন, তার মতো অনেক লেগুনাচালকই এখন লেগুনা বন্ধ রেখে পেঁয়াজ কিনছে এবং একেক জন ৫-১০ কেজি করে পেঁয়াজ নিয়ে ৪৫ টাকার পেঁয়াজ ২০০ থেকে ২২০ টাকায় অন্যত্র বিক্রি করছে। এভাবেই তারা এখন দিনে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় করছে। শুধু লেগুনাচালক নয়, এ এলাকার রিকশাচালক এবং ফুটপাথে ব্যবসায়ীরাও একই কাজ করছে।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]