ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

পরিবহন খাতের পঞ্চপাণ্ডব
জিম্মি সাধারণ মানুষ
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ২১.১১.২০১৯ ৬:০৩ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 2157

পরিবহন খাতের পঞ্চপাণ্ডব

পরিবহন খাতের পঞ্চপাণ্ডব

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের পাঁচ জন নেতার হাতে দেশের পরিবহন খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখাতে ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অশুভ প্রভাব। পরিবহনে চাঁদাবাজি করে মালিক ও শ্রমিক নেতাদের অনেকেই কোটি কোটি টাকার  মালিক হয়েছেন। নতুন সড়ক পরিবহন আইনকে কেন্দ্র করে পরিবহন শ্রমিকদের একাংশ যে ধর্মঘট শুরু করেছে, তাতে পেছন থেকে সমর্থন জোগাচ্ছেন সরকারেরই দুই সাবেক মন্ত্রী শ্রমিক নেতা শাজাহান খান এবং মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা ও মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ।

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা এমন তথ্যই জানিয়েছেন। তবে এই আইন স্থগিত রাখার দাবি নাকচ করে দিয়ে সরকারও অনড় অবস্থান নিয়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন আইন কার্যকর করা থেকে সরকার পিছু হটবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রুট নির্ধারণ, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানিরও অন্যতম কারণ পরিবহন মালিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি নেতা পরিবহন মালিকদের কাছে দীর্ঘ দিন ধরে জিম্মি গণপরিবহন ব্যবস্থা। তাদের পরিবারের সদস্যদের মালিকানায় থাকা পরিবহনগুলোর কারণে রাজধানীর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরছে না। মানা হচ্ছে না সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়মনীতি।

যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। নেতাদের মালিকানাধীন বাস কোম্পানিগুলোই রাজধানীতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে। জেলা-উপজেলার সড়ক পরিবহনেও তাদের দাপট। আর এগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের কয়েক জন নেতা। যাদের বিরুদ্ধে পরিবহন খাত থেকে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু হলেও তারা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি এখনও চলছে পরিবহন চাঁদাবাজি।

সূত্র জানায়, বর্তমানে পরিবহন সেক্টরে রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব বাড়লেও এ প্রক্রিয়া চলে আসছে অনেক দিন থেকে। বিএনপি সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস এবং বিএনপি নেতা সংসদ সদস্য জি এম সিরাজ পরিবহন খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিলেন। তখন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা শিমুল বিশ্বাসেরও প্রভাব ছিল।

আর বর্তমান সরকারের আমলে পরিবহন সেক্টরের অন্যতম নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা ও মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ এবং সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা শাজাহান খান। পরিবহন খাতের ভাড়া নির্ধারণ থেকে শুরু করে এ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও সংশোধনসহ সরকারি সব বৈঠকে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায়। তাদের সহযোগী নিয়ন্ত্রক হিসেবে রয়েছেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবদুল বাতেন বাবু এবং সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া রুট পারমিটও পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া যেসব নতুন বাস রুটের অনুমতি পেয়েছে, সেগুলোকে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হয়েছে পরিবহন নেতাদের পেছনে। এ খাতের প্রভাবশালীরা নিজে বা আত্মীয়স্বজনের নামে দুয়েকটা বাস কিনে প্রথমে একটি কোম্পানি খোলেন।

এরপর বিভিন্ন ব্যক্তির বাস ওই কোম্পানির অধীনে চালাতে নিয়ে আসেন। বিনিময়ে কোম্পানির উদ্যোক্তারা প্রতিটি বাস থেকে চাঁদা আদায় করেন। এটাকে তারা নাম দিয়েছেন জিপি (গেট পাস)। কোম্পানির খরচের নামে এই জিপি আদায় করা হয়। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা এ খাতের নিয়ন্ত্রণ করেন। তা ছাড়া পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন নেতাদের অনেকেই পরিবহন মালিক। নেতারা মালিক হওয়ায় শ্রমিকদের স্বার্থের দিকটি বিবেচনায় না নিয়ে মালিকদের স্বার্থে তাদের ব্যবহার করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েক জন পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতার ইন্ধনের কারণে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেছে। শেরপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুরসহ ১০টির বেশি জেলায় বাস মালিক শ্রমিকরা কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই বাস চলাচল বন্ধ করে রেখেছেন তিন দিন ধরে। তাদের পাশাপাশি বুধবার থেকে পণ্যবাহী ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদও দেশজুড়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছে। ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব তাজুল ইসলাম বলেন, নতুন আইনে জেল জরিমানা অনেক বেশি হওয়ায় তারা এর বিরোধিতা করছেন।

তবে আন্দোলনের নেপথ্যে থাকার কথা অস্বীকার করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা এবং সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, তাদের দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মঘট বা কর্মবিরতির কোনো কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। শ্রমিকরা তাদের মতো করে আন্দোলন করছেন।

শ্রমিকদের দাবিকে তারা সমর্থন করেন বলে গণমাধ্যমকে তারা জানান। শাজাহান খান বলেন, সরকারের গঠিত কমিটিতে তারা আইনটিতে বিভিন্ন অপরাধের ব্যাপারে জরিমানা কমানোসহ বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব করেছিলেন। সেই আলোচনা যখন চলছে তার মধ্যেই আইনটি কার্যকর করা হয়েছে। একজন ড্রাইভারকে যদি ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়, তারপক্ষে সেই টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। চালককে অষ্টম শ্রেণি এবং তার সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। এখন একজন দীর্ঘদিন সহকারীর কাজ করে তারপর চালক হলে সে অষ্টম শ্রেণির সার্টিফিকেট কোথায় পাবে? এটা শিথিল করার কথা আমরা বলেছি। এগুলোসহ আরও কিছু বিষয়ে সংশোধনীর প্রস্তাব আমরা দিয়েছি।

তিনি বলেন, পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে না। শ্রমিকরা তাদের সমস্যা তুলে ধরে। কোনো সমাধান না হলে তখন গিয়ে আন্দোলনের প্রশ্ন আসে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কোনো চাপেই নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের পথ থেকে সরকার সরে আসবে না। তিনি বলেন, এ আইন করা হয়েছে রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য, কাউকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশে নয়।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]