ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

সুরা আসরের শিক্ষা
চূড়ান্ত ক্ষতি থেকে বাঁচতে বান্দার করণীয়
আরিফ খান সাদ
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 48

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরা ও আয়াতে মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন। জীবনে চলার পথে বাস্তব কিছু উপমার ভিত্তিতে জানিয়েছেনÑ পৃথিবীতে মানুষের কী করণীয়, কী বর্জনীয়। তেমনি একটি সুরা হলোÑ সুরা আসর। মাত্র তিন আয়াত বিশিষ্ট এই সুরার নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে মেনে চলতে পারলেÑ দুনিয়ায় যেমন সফল হওয়া যাবে; পরকালেও চির সুখের জান্নাত লাভ করা যাবে ইনশাল্লাহ।
এই সুরার শিক্ষা ও মাহাত্ম্য নিয়ে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা হতো। হাদিসে এসেছেÑ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে হাফস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যে এমন দুজন সাহাবি ছিলেন, যারা মিলিত হলে একে অন্যকে সুরা আসর না শুনিয়ে পৃথক হতেন না। (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান : ২৬৪৮)। ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন, ‘যদি মানুষ এই সুরাটি গবেষণা করত, তাহলে এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)
সুরা আসরের তরজমা
আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘১. সময়ের শপথ! ২. নিশ্চয় সব মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। ৩. তবে তারা ব্যতীত; যারা ঈমান এনেছে, সৎ কাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে। (সুরা আসর : আয়াত ১-৩)
প্রথম আয়াতের আলোচনা
‘সময়ের শপথ!’ আল্লাহ তায়ালা এই সুরায় সময়ের শপথ করেছেন এ জন্য যে, বান্দা ভালো-মন্দ যে কাজই করুক না কেন, তা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎÑ এই তিনকালের মধ্যেই তাকে করতে হয়। এর বাইরে গিয়ে কিছুই করা যায় না। অতএব বান্দাকে সবসময় আল্লাহর দৃষ্টির সীমানার ভেতরেই থাকতে হয়।
প্রতিটি মানুষের জন্য সময়, যুগ ও কাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের জীবন মূলত সময়েরই সমষ্টি। একটু একটু করে সময় অতিবাহিত হচ্ছে মানে জীবনের একটু একটু অংশ গলিত বরফের মতো কমে যাচ্ছে। একজন বরফ বিক্রেতা যত বড় বরফের টুকরো নিয়েই বসুক না কেন, সেটি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে গলে নিঃশেষ হয়ে যাবে। দিন শেষে অবশিষ্ট কিছুই থাকবে না। তেমনি মানুষ তার জীবনের সময়গুলো কাজে না লাগালে সময় ঠিকই বয়ে যাবে। আর নির্ধারিত সময় চলে গেলে বান্দার কোনো কিছুই তখন কাজে আসবে না। এমনকি আল্লাহর দরবারেও তার আমল কবুল হবে না। তাই সময়কে কাজে লাগাতে হবে। কোনোভাবেই কালক্ষেপণ করা যাবে না।
দ্বিতীয় আয়াতের আলোচনা
‘নিশ্চয় সমস্ত মানুষ ক্ষতির ভেতর রয়েছে’। পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এমনই বলেছেন, ‘অতঃপর তারা তাদের
কৃতকর্মের আজাব আস্বাদন করল। আসলে ক্ষতিই ছিল তাদের কর্মের পরিণতি।’ (সুরা তালাক : ৯)। সুরা আসরের এই আয়াতে ‘নিশ্চয় সমস্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত’ না বলে ‘নিশ্চয় সমস্ত মানুষ ক্ষতির ভেতর রয়েছে’ বলার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছেÑ মানুষ মজ্জাগতভাবে ক্ষতিকর প্রবণতার ভেতরে লিপ্ত। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মানুষ হয়তো নিজের বা অন্যের ক্ষতি করেই চলেছে। সমাজের নানা অপরাধ, খুন, লুটপাট, খাদ্যে ভেজাল, দুর্নীতি, মিথ্যা, চুরি-ডাকাতি, ধর্ষণ, পরকীয়া থেকে শুরু করে ইতিহাসের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতি ও সভ্যতার ইতিহাস দেখলেই তা বোঝা যায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে লোকসকল! জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য আমি তোমাদের কোমর ধরে আকর্ষণ করি। তোমরা জাহান্নাম থেকে আমার দিকে ফিরে এস! তোমরা জাহান্নাম থেকে আমার দিকে ফিরে এস! কিন্তু তোমরা আমাকে পরাস্ত করে জাহান্নামে ঢুকে পড়ছ!’ (বুখারি : ৬৪৮৩; মুসলিম : ২২৮৪)। এই হাদিস থেকেও বুঝে আসে মানুষ ক্ষতিকর প্রবণতায় রয়েছে। তবে সেই ক্ষতি থেকে বাঁচার পথও পরের আয়াতে বলে দিয়েছেন মহান আল্লাহ।
তৃতীয় আয়াতের আলোচনা
‘তবে তারা ব্যতীত; যারা ঈমান এনেছে, সৎ কাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’। এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা চারটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেনÑ যার মাধ্যমে মানুষ সফলতা ও মুক্তি অর্জন করতে পারে। গুণগুলো হলোÑ ১. পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনা; ২. নিজে সৎ কাজ করা; ৩. অন্যকে সত্য ও ভালো কাজের উপদেশ দেওয়া এবং ৪. অন্যকে বিপদে ধৈর্যের উপদেশ দেয়।
কোনো বান্দা এই গুণাবলিগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারলে ক্ষতি থেকে বাঁচতে সক্ষম হবে এবং চূড়ান্ত সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে পারবে। প্রথম দুটি গুণের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা একটি আয়াতে সুসংবাদ দিয়েছেনÑ ‘যারা ঈমান আনে এবং সৎ ও ভালো কাজ করে, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ তাদের আপ্যায়নের জন্য জান্নাত হবে তাদের বাসস্থান।’ (সুরা হামিম সাজদা : ১৯)। তৃতীয় গুণের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি বলÑ সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যার ইচ্ছা ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা কুফরি করুক। আমি সীমা লঙ্ঘনকারীদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছি।’ (সুরা কাহাফ : ২৯)। আর চতুর্থ গুণ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘ধৈর্যধারণকারীদের অগণিত পুরস্কার দান করা হবে।’ (সুরা জুমার : ১০)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘ধৈর্য ও সবরের পুরস্কারস্বরূপ তিনি তাদের জান্নাত ও রেশমি পোশাক দান করবেন। তারা সেখানে সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসবে। সেখানে তারা অতি গরম বা অতি শীত কোনোটাই দেখবে না।’ (সুরা দাহর : ১২-১৩)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই সুরার প্রকৃত মর্ম ও শিক্ষা বোঝার এবং তদানুযায়ী আমল করার করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]