ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

লাগামহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
অধিকাংশই অমান্য করছে আইন : প্রয়োজন সরকারি পর্যবেক্ষক নিয়োগ
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৩.১২.২০১৯ ৩:২১ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 123

লাগামহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

লাগামহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য করছে। বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত সিন্ডিকেট ও একাডেমিক সভা আহবান করে না। আচার্য কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ নেই। প্রতিবছর নিরীক্ষিত বার্ষিক হিসাবও দাখিল করে না। এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ স্পষ্ট লঙ্ঘন হচ্ছে। এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাগাম টানতে ব্যর্থ সরকার। এ জন্য আইন সংশোধন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাংকের মতো ট্রাস্টি বোর্ডে একজন সরকারি পর্যবেক্ষক রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছে দেশের উচ্চশিক্ষা তদারকি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৫টি। এর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে ৯৫টিতে। অর্ধেকের বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ঢাকায়। ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেলেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেনি। আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
নিজস্ব ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রমের কথা থাকলেও দুই ডজনের বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তা মানছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের জন্য ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে সময় বেঁধে দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন ধাপে বেঁধে দেওয়া এ সময়সীমা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি দুই ডজনের বেশি বিশ্ববিদ্যালয়। স্থায়ী ক্যাম্পাসে না গেলে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও এখন সেসব বিষয়ে আলোচনা বন্ধ। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আর কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
আইন অনুযায়ী অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অডিট রিপোর্ট দাখিল করছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত সিএ ফার্ম হতে সরকার মনোনীত একটি ফার্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষা করাতে হবে। কিন্তু সিএ ফার্ম মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত তিনটি ফার্মের মধ্যে সরকার একটি প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেয়। এ ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয়ে প্রকৃত তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব না নিয়ে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিরপেক্ষ কোনো ফার্ম নিয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষা করানো যেতে পারে বলে ইউজিসির মতো। সম্প্রতি রাজধানীর আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পদত্যাগে বাধ্য হন বিশ্ববিদ্যালয়টি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. কাজী শরীফুল আলম।

জানা গেছে, ৪০ শতাংশ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের তিন শীর্ষ পদ শূন্য রয়েছে। শীর্ষ পদ শূন্য থাকার কারণে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজে অচলবস্থা বিরাজ করছে। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সার্বক্ষণিক উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ থাকা বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য। দেশের ১০৫টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টিতেই উপাচার্য নেই। এ ছাড়া কয়েকটি সরকারি বিশ^বিদ্যালয়েও নিয়মিত উপাচার্য নেই। ফলে এগুলোর শিক্ষা কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। এদিকে যেসব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদ শূন্য রয়েছে, সেগুলোয় জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে ইউজিসি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসেনের কাছে এক চিঠিতে অনুরোধও করে ইউজিসি।
দেশের উচ্চশিক্ষা তদারকি প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষরা গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে থাকেন। বর্তমানে দেশের কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পদ শূন্য আছে। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব শীর্ষ পদে নিয়োগের সমস্যা দীর্ঘদিনের। আইন অনুযায়ী, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ এ তিন পদের ক্ষেত্রেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ প্রস্তাবিত তিনটি নামের মধ্যে আচার্য ও রাষ্ট্রপতি একজনকে নিয়োগ দেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়ম না মেনে নিজেরাই একজন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে মাসের পর মাস শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়েন। কারণ নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্জিত ডিগ্রির সনদে মূল স্বাক্ষরকারী হলেন উপাচার্য। কিন্তু বৈধ উপাচার্য না থাকায় মূল সনদ পেতে শিক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হয়। যদিও সাময়িক সনদ দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ করা যায়। কিন্তু উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক বিষয়সহ অনেক ক্ষেত্রেই কাজ আটকে থাকে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ অনুমোদনের জন্য ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা লেনদেন হয়। ওই গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে দৈবচয়ন ভিত্তিতে ২২ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছিল দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।

সম্প্রতি উচ্চশিক্ষার ভর্তির মৌসুমকে সামনে রেখে দেশের ৩০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সতর্কতা জারি করে ইউজিসি। ভর্তি মৌসুমে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সচেতন করতেই গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ইউজিসি জানিয়েছে, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ না থাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারেও সতর্ক করা হয়েছে। কেননা, বাংলাদেশে এখনও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা বৈধ নয়। সনদে স্বাক্ষরের দায়িত্ব উপাচার্যের। উপাচার্যবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শীর্ষ পদে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ তুলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি বলেন, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ প্রদানের জন্য প্রায় ১ বছর আগে প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদ শূন্য রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ দিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়। বারবার তাগাদা দিলেও শীর্ষপদে নিয়োগ দেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]