ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

দুর্গম উঁচু পাহাড়েও বিদ্যুৎ ইন্টারনেট রাস্তাঘাট
পার্বত্য অঞ্চলে বিস্ময়কর উন্নয়ন
আলমগীর হোসেন পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৩.১২.২০১৯ ১২:৫৯ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 108

পার্বত্য অঞ্চলে বিস্ময়কর উন্নয়ন

পার্বত্য অঞ্চলে বিস্ময়কর উন্নয়ন

পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম ও সুউচ্চ পাহাড়ি এলাকার যেখানেই চোখ পড়েছে সেখানে দেখা গেল বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবস্থা। দোকানপাট বাসা-বাড়িতেও ছিল বিদ্যুতের ঝলমলে আলো। সমতল থেকে হাজার হাজার ফুট উচ্চতার এসব পাহাড়ে বিদ্যুতের পাশাপাশি আরও দেখা যায়Ñ ডিশ, ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগসহ পাম্পের মাধ্যমে রয়েছে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ বা রাস্তাঘাট, সেটিও তৈরি হয়েছে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে। সব মিলিয়ে দুর্গম পাহাড়েও যেন গড়ে উঠেছে শহরের অনেক সুযোগ-সুবিধা।
গত ২৩ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের বেশকিছু এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়। এ সময় স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা যায় পার্বত্য অঞ্চলে বিগত কয়েক বছরে বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এত উন্নয়ন স্লান হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি কিছু আঞ্চলিক সংগঠনের রক্ষক্ষয়ী হানাহানির কারণে।
তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা সরকারের উদ্দেশ্যে বলছেন পার্বত্য এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে অপার সম্ভাবনার পর্যটন খাতকে আরও বেশি নজর দিতে হবে। এ ছাড়া পাহাড়ি পরিবেশ ঠিক রেখে ক্ষুদ্র কৃষিশিল্প গড়ে তোলাও প্রয়োজন।
সরেজমিনে পার্বত্য অঞ্চল ঘুরে জানা যায় রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে শহরের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন পাহাড়ের অনেক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। পাহাড়ে গড়ে ওঠছে একের পর এক নানা সুবিধাসহ পর্যটন স্পট। এই অবস্থার মাঝেই পার্বত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ির সাজেক, বান্দরবানের নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড়, বগালেক, কেওক্রাডং, নীলাচলসহ রুমা ও থানচির এলাকার সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত পর্যটকদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সবুজে ঘেরা এসব উঁচু পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য যে কাউকে বিমোহিত করে। এসব পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে নিচে বা সামনে দূরে তাকালে নিজেকে নানাভাবে আবিষ্কারও করা যায়। এভাবে পার্বত্য অঞ্চলে আরও আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন হলে খুব শিগগিরই পার্বত্য অঞ্চলের দৃশ্যপট হয়তো আরও পাল্টে যাবে। কিন্তু তার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা। যেটি এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের চারটি সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও খুনোখুনি-হানাহানির কারণে অনেক বিস্ময়কর পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকরা যেতে পারেন না। স্থানীয় সাধারণ পাহাড়ি উপজাতি ও বাঙালিরা এসব হানাহানির বিরুদ্ধে থাকলেও স্বার্থান্বেষী এসব পাহাড়ি সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের স্বার্থে পাহাড়কে প্রতিনিয়তই অশান্ত করে চলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ২৫ নভেম্বর বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার ওয়াইজংশন মোড় সংলগ্ন বাজারে দেখা যায় বেশ কিছু উপজাতি নারী-পুরুষ নানা কৃষি ও ফলদ পণ্য বিক্রি করছিলেন। এ সময় কথা হয় স্থানীয় তং সং মুরং নামে এক কৃষকের সঙ্গে।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমরা এখানে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করছি। আমি কৃষি কাজ করি, আর স্ত্রী সংসার সামলানোর পাশাপাশি ফল ও সবজি চাষাবাদ বা উৎপাদনে সহায়তা করেন। তিনি বলেন, এসব জায়গা পাহাড়-পর্বত হলেও শহরের মতো সবই এখানে পাওয়া যায়। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সবই আছে। কেবল পানি আর পাহাড়ের ভেতরের রাস্তাগুলোয় একটু সমস্যা আছে। শিক্ষার হার ও স্বাস্থ্যসেবা সবই মোটামুটি ভালো।
অং সং মুরং জানান, তার চার ছেলে রয়েছে। তিনি কৃষি কাজ করলেও তার বড় ছেলে জঙ্গিয়া মুরং ঢাকায় একাদশ শ্রেণির (এইচএসসি) শিক্ষার্থী এবং মেজো ছেলেও দশম শ্রেণিতে ঢাকায় পড়ছে। পার্বত্য শান্তি চুক্তির সময় অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৮টি। শান্তি চুক্তির ২২ বছর পর এখন এ ইউনিয়নে সেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৬টি। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে ২০০১ সালে পাহাড়ে পাকা রাস্তা ছিল ৬৩১ কিলোমিটার। ২০১৮ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে পাকা সড়ক এখন দ্বিগুণেরও বেশি। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির বছর উন্নয়ন বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে এর পরিমাণ ১৭ গুণ বেড়ে হয়েছে ৮৫৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। হয়েছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশ^বিদ্যালয়সহ আরও নানা উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন। এভাবে পার্বত্য অঞ্চলের সব খাতেই ব্যাপক উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে।
বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. মুজিবুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকার ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। এই উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের বিশেষ অংশীদার বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দুর্গম পাহাড়ি রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ও শান্তি-শ্ঙ্খৃলা প্রতিষ্ঠায় সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বান্দরবান শহর থেকে এক যুগ আগেও থানচি যেতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগত। তাও আবার বেশ কিছু এলাকা দুর্গম পথ হেঁটেই এগোতে হতো। সেই তিন দিনের পথের থানচি যেতে এখন সময় লাগে মাত্র আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। এরকমভাবে প্রায় বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নকে করে দিচ্ছে পার্বত্য আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো। সরকারের কাছ থেকে শান্তি চুক্তির সুবিধা নিয়েও তারা শর্তভঙ্গ করছে। নিজেদের আধিপত্য ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি বজায় রেখেছে এসব সংগঠন। যার অন্যতম হচ্ছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (সংস্কার)।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা সময়ের আলোকে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলগুলো পর্যটন ও কৃষি শিল্পের অবারিত বিশাল এক ক্ষেত্র। বর্তমান সরকার পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করেছে। তবে বর্তমানে পার্বত্য জেলাগুলোয় সবচেয়ে বড় সমস্যা অবৈধ অস্ত্র ও ভ‚মি জটিলতা। এগুলোর স্থায়ী সমাধান হলে পার্বত্য অঞ্চলে আরও উন্নয়ন হবে। এ ক্ষেত্রে পাহাড়ের উপজাতি ও বাঙালি উভয়পক্ষকেই উন্নয়নের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সন্ত্রাসীদের রুখতে হবে। ভ‚মি জটিলতা নিরসনে উভয়পক্ষকে একটুখানি ছাড় দিতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলে কাজ করা একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি খুনোখুনির ঘটনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। গত ৬ বছরে পাহাড়ি-বাঙালিসহ মোট ৩২২ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২ বছরে ১২৫ জন নিহত হয়েছে। এসব কিছুরই নেপথ্যেই রয়েছে পাহাড়ি আঞ্চলিক এসব সংগঠনের ব্যক্তিগত স্বার্থকেন্দ্রিক অপতৎপরতা।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে আগের চেয়ে অনেক শান্তি বিরাজ করছে। বর্তমানে পর্যটন স্পটগুলোকে সুন্দরভাবে সাজানো হচ্ছে। প্রচুর পর্যটক আসছেন। এখানে কৃষিভিত্তিক বিসিক শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]