ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

কৃষিই একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন
আফতাব চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 8

বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নিজ দেশকে শিল্পে উন্নত করতে চায়। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তারা মডেল হিসেবে ধরে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। উন্নয়ন মানেই শিল্পায়ন-শিল্প স্থাপন এবং অধুনা শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ। শিল্পায়ন সভ্যতার অনিবার্য ফসল। কাজেই শিল্প উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখে কারও পক্ষে সভ্যতা সংলগ্ন হওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু সারা দেশ শিল্পে শিল্পে ভরে তুলতে হবেÑ এ কথাও কেউ বলবেন না। উৎপাদনের ঐতিহ্যবাহী ম্যানুয়েল ব্যবস্থাকে যান্ত্রিকীকরণ করার কথা বলা যায়, এতে অন্তত যুক্তি দেখানো যাবে। কিন্তু উৎপাদনের যে বড় সেক্টর কৃষি তার প্রতি উদাসীন থেকে অবহেলায় তাকে রুগণ করে তুলে শুধু শিল্পায়নের পেছনে ধাবিত হওয়া সুস্থ চিন্তার ফসল নয়। বিশদ ব্যাখ্যায় না গিয়েও বলা যায়, শুধু শিল্প-কারখানার সংখ্যা বা শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধিই কোনো জাতির উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। সর্বোপরি শুধু শিল্প উৎপাদন এখনও মানুষের জীবন ধারণের একমাত্র নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে এমন ভরসা খোদ বিজ্ঞান সাধকরাই করতে পারছেন না। বরং তারাই প্রকৃতিকে-প্রাকৃতিক বিধি-ব্যবস্থাকে সংরক্ষণের জোর তাগিদ দিচ্ছেন। এমন কথাও বলছেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করতে না পারলে মানব জাতির ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে। তারা এও বলেছেন, গত দুই শতাব্দীর শিল্প-সভ্যতা গোটা পৃথিবীকে পয়মাল করে ফেলেছে। পৃথিবীর বৃহত্তর অংশ এখন মনুষ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ এমন কথাও বলছেন, একুশ শতক হবে প্রকৃতি উদ্ধারের শতক। এসবের বিরোধিতা কেউ করছেন না। বরং প্রকৃতি রক্ষা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা জোরদার হয়ে উঠেছে খোদ শিল্পোন্নত দেশগুলোতেই।
শুরুতে দরিদ্র, অনুন্নত ও উন্নয়নকামী দেশগুলোর যে মনোভাবের কথা বলা হয়েছে তারা কিন্তু প্রকৃতি সংলগ্ন হওয়ার নয়া কর্মোদ্যোগের প্রতি মোটেই দৃষ্টি দিচ্ছে না। তাদের চোখে এখনও শিল্পই জীবনযাপনের
কৃত্রিম যান্ত্রিক উপকরণ সমৃদ্ধ স্বপ্নের জগৎ। শিল্পোন্নত দেশের লোকজন যখন এই জগত থেকে বেরিয়ে এ বস্তু সভ্যতার কৃত্রিম জগতের সঙ্গে প্রকৃতির সমন্বয় ঘটাতে উঠে-পড়ে লেগেছে, তখন উন্নয়নগামী দেশগুলো
প্রাকৃতিক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে শুরু প্রকৃতির প্রাণবন্ত পরিবেশ বিঘ্নিত করে বস্তু সভ্যতার কৃত্রিমতায় পৌঁছার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। শিল্পায়নের জন্য কে কত বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ আনতে পারেÑ এটা এখন এসব দেশের সরকারগুলোর যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে বলা যায়। হালে দেশীয় এনজিওগুলোয় বিদেশি ফান্ড কত বেশি এলো, বিদেশি কত এনজিও দেশে কর্মকাণ্ড শুরু করল তাও গর্বের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও দুয়েকটি ব্যতিক্রম যে চোখে পড়ছে না তা নয়। সম্প্রতি কৃষিপণ্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নীতিমালার বিরোধে ব্রাজিল কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করেছে। কৃষিপণ্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সুবিধা প্রদান না করলে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলোর মধ্যে অবাধ বাণিজ্য আর চলতে দেওয়া হবে না। কদিন আগে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে কোস্টরিকায় বাণিজ্যমন্ত্রীদের এক সভায় ব্রাজিলের প্রতিনিধি পরিষ্কার বলেছেন, আমেরিকার সঙ্গে ও ‘আমেরিকা’ সমূহের মধ্যে অবাধ বাণিজ্য এলাকা যদি কেউ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকে ‘প্রধান বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে’। অথচ কিউবা ব্যতীত এই গোলার্ধের সবকটি দেশ ১৯৯৪ সালে মায়ামিতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে আলাস্কা থেকে পেতাগোনিয়া পর্যন্ত সব অঞ্চল ও দেশকে যুক্ত করে একটি অবাধ বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু এ অঞ্চলের কৃষিপ্রধান দেশগুলোর কৃষিপণ্যে আমদানি শুল্ক হ্রাস পেলে মার্কিন কৃষিপণ্য এসে তাদের বাজার সয়লাব হয়ে যাওয়ার ভয় থেকেই তারা নিজেদের কৃষিপণ্যের স্বার্থে কথা বলছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো এখন দাবি জানাচ্ছে সমগ্র আমেরিকার কৃষিপণ্যের বাজার খুলে দেওয়ার জন্য। অর্থাৎ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে কৃষিপণ্য উৎপাদন করছে তা শুধু দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর বাজার ভাসিয়ে দেবে তা হতে দিচ্ছে না দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো। প্রসঙ্গক্রমে এখানে বলতে হয়, শিল্পোন্নত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা তাদের কৃষিকে অনাদরে-অবহেলায় সরিয়ে রাখেনি। বরং কৃষি খাতেও উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। এ থেকে যেমন কৃষিপ্রধান উন্নয়নগামী দেশগুলোর বোধোদয় হওয়া উচিত, তেমনি ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো কৃষিপণ্যের স্বার্থ সংরক্ষণে শক্তিশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে তা থেকেও শিক্ষা নেওয়া আবশ্যক। এখানে শুধু কৃষি খাতের প্রতিই গুরুত্বের প্রকাশ পাচ্ছে না, বরং অবাধ বাণিজ্যের ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত কম উন্নত বা দুর্বল দেশগুলোর গ্রহণযোগ্য অবস্থানের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ব্রাজিল এর আগেও বিদেশি ঋণের সুদ নিয়েও দৃঢ় বক্তব্য রেখে ঋণগ্রস্ত উন্নয়নগামী দেশগুলোর কাছে অনুকরণীয় নজির হয়ে ওঠেছিল। অবশ্য বিশ্বব্যাংকসহ সব আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা ও ঋণদাতাদের ঋণের সুদ পরিশোধ করব না এমন কথা কোনো উন্নয়নশীল দেশই আর উচ্চারণের সাহস দেখাতে পারেনি। তবে এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের কথা বলা যায়। পাকিস্তান কয়েক বছর আগে একবার জার্মান ঋণের সঙ্গে অনিবার্যভাবে জুড়ে দেওয়া ‘বিশেষজ্ঞদের’ বাতিল করে দিয়েছিল। এ তৎপরতা ছিল যথেষ্ট যৌক্তিক। কেননা প্রতিটি ঋণ গ্রহীতা উন্নয়নগামী দেশেরই এ অভিজ্ঞতা ভালো মতোই হয়েছে, গৃহীত ঋণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশই ব্যয় করতে হয় ঋণের সঙ্গে ঋণ দাতাদের জুড়ে দেওয়া বিশেষজ্ঞদের পুষতে। এ রকম অনুকরণীয় দৃষ্টান্তগুলো বিশেষ কেউ অনুকরণ করেছে এমন বলা যাবে না।
উন্নয়নগামী বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর বদ্ধমূল ধারণা, ঋণ যত বেশি আনা যাবে, দেশ তত বেশি উন্নয়নের পথে অগ্রসর হবে। এ ধারণা জেঁকে বসার আসল কারণ দুর্নীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিদেশি ঋণ যত আসবে, তত বেশি প্রজেক্ট হবে, তত বেশি অর্থকড়ি হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিদেশি দান অনুদান তো বটেই এমনকি, ঋণের টাকাকেও উন্নয়নগামী দেশের সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সব মহল মনে করেন মুফতে পাওয়া টাকা। ফলে শিল্প উন্নয়ন বা উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে হয় না, বরং গরিব দেশে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ধনী লোকের প্রাদুর্ভাব ঘটে মাত্র। ঋণ আনাটা যেকোনো ক্রেডিটের বিষয় নয় এই বাস্তবতার প্রতি তাকাবার অবকাশ কারও নেই। প্রায় একই কথা বলা যায়, বিদেশি বিনিয়োগ আনার ব্যাপারে। কেননা শিল্পায়নটাই বড় কথা নয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে। বিনিয়োগ শিল্প বাড়ায় এ কথা ঠিক, কিন্তু সে শিল্প যদি দেশের কাঁচামাল ব্যবহার করতে না পারে তাহলে উন্নয়নটা হয় বড়জোর অর্ধেক। আর অর্ধেক উন্নয়ন কোনো উন্নয়ন হিসেবে গণ্য হতে পারে না। সর্বোপরি আমরা যদি আমাদের দেশের কথা ধরি তাহলেও দেখা যাবে, কৃষিপ্রধান এ দেশটির বেশকিছু কৃষিপণ্য রয়েছে যা কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হলে যে শিল্পপণ্য উৎপাদিত হবে তা বহির্বিশ্বে পেতে পারে একচেটিয়া বাজার। কিন্তু দেশীয় কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্পয়ানের প্রচেষ্টা আশানুরূপ নয়। অথচ এটা করা গেলে একদিকে দেশের কৃষি খাতে নয়া প্রাণ সঞ্চার ঘটবে, অন্যদিকে শিল্পায়নও হবে।
এ ছাড়া দেশের রফতানি বাণিজ্যও প্রসারিত হতে পারবে। আজ গ্রামে গ্রামেও লক্ষ করলে দেখা যাবে, মানুষজন কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ফলে
কৃষি এখন খুবই ব্যয়বহুল উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের বাজার বাড়ছে না। অলাভজনক হয়ে ওঠা এই কৃষি খাতে বিনিয়োগ এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কিন্তু কৃষি এমন একটি খাত যা থেকে হাত গুটিয়ে থাকার উপায় নেই। কেননা মানুষকে খাদ্যশস্যের জন্য কৃষি উৎপাদনে নিয়োজিত থাকতে হবেই। এর বিকল্প এখনও হয়নি, অদূর ভবিষ্যতেও হবে এমন আশা করার কোনো কারণ দেখা দেয়নি। অথচ ইতোমধ্যে কৃত্রিম সার, বিষাক্ত কীটনাশক ইত্যাদির নির্বিচার ব্যবহার আমাদের মতো উন্নয়নগামী দেশগুলোর জমি নষ্ট করে ফেলছে, জমির উর্বরতা হ্রাস করে ফেলছে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে। আরেকটি ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। তা হলো হাজার বছর ধরে পরীক্ষিত শস্যবীজ হারিয়ে যাচ্ছে। সারনির্ভর যে শস্যবীজ উদ্ভাবিত হয়েছে এবং এখন দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে তা কতদিন স্থায়ী হবে এবং আদৌ প্রকৃতিনির্ভর হতে পারবে কি না তা এখনও কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।
অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে যা ছিল পুরুষক্রমে নির্ভরযোগ্য তা হারিয়ে গেছে এবং যা এসেছে তা ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারে এমন নিশ্চয়তা নেই। সারা বিশ্ব এখন প্রকৃতির কাছে ফিরতে চাচ্ছে। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহারের তাগিদ উচ্চারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে জৈব সার ব্যবহারের ফলে আজকের রাসায়নিক সারের উপযোগী শস্যবীজ কতটা কার্যকর হবে এ প্রশ্নের মীমাংসা এখনও হয়নি। তবু মানব জাতিকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রকৃতির কাছেই ফিরতে হবে। প্রকৃতিকে উদ্ধার করতে হবে,
প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে এবং সর্বোপরি নির্ভর করতে হবে প্রকৃতি সংলগ্ন উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর। আর এ জন্যই উন্নয়নশীল  দেশগুলোকে কৃষি খাতের প্রতি হেলাফেলার মনোভাব ত্যাগ করতে হবে। কৃষি উৎপাদনকে তার নিজস্ব শক্তির ওপর দাঁড় করাবার উদ্যোগ-আয়োজন গ্রহণ করতে হবে। আর এটাই হতে হবে একুশ শতকের প্রধান অবলম্বন।

বৃক্ষরোপণে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]