ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ১ পৌষ ১৪২৬
ই-পেপার রোববার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা
আরিফ খান সাদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 57

হাশর আরবি শব্দ। এর অর্থ সমাবেশ, সম্মেলন, সমাগম ইত্যাদি। কেয়ামত ও পুনরুত্থানের পর যে ময়দানে পৃথিবীর প্রাণিকুলের বিচার ও প্রতিদানের জন্য সমবেত করা হবে, সেটাই হাশরের ময়দান। হাশরের ময়দান হবে খুব ভয়াবহ ও বিভীষিকাময়। এ সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরা হলো।
হাশরের ময়দানের অবস্থান
পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘সেদিন এই পৃথিবী ও আকাশ পরিবর্তিত হয়ে অন্য এক পৃথিবীতে রূপান্তরিত হবে আর মানুষকে উপস্থিত করা হবে আল্লাহর সামনে, যিনি একক ও পরাক্রমশালী।’ (সুরা ইবরাহিম : ৪৮)। হাশরের ময়দানে মূল কেন্দ্র হবে শামভূমি। বর্তমান সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন, ইসরাঈল, লেবানন, ইরাক, তুরস্ক, মিসর ও হেজাজ অঞ্চল হাদিসে বর্ণিত শামভূমির অন্তুর্ভুক্ত। হজরত হাকিম ইবনে মুয়াবিয়া বাহজি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এ স্থানেই তোমাদের হাশর হবে, এ স্থানেই তোমাদের হাশর হবে, এ স্থানেই তোমাদের হাশর হবে (তিন বার বললেন)। তোমরা কেউ সওয়ারির ওপর আরোহণ করে, কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ চেহারায় ভর করে এখানে উপস্থিত হবে।’ ইবনে আবু বুকাইর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) তখন শামের দিকে ইশারা করলেন (তিরমিজি : ২২১৭; মুসনাদে আহমাদ : ৪৫৩৬)
মানুষের উপস্থিতির অবস্থা
ইসরাফিল (আ.) দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুঁ দিলে মানুষ যার যার কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানের দিকে ছুটতে থাকবে। মানুষ সাধারণত পা দিয়ে ভর করে হাঁটে। কিন্তু হাশরের ময়দানে কিছু মানুষ চেহারার ওপর ভর করে হাঁটবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, হাশরের ময়দানে মানুষকে তিনভাবে উপস্থিত করা হবে। একদল মানুষ পায়ে হেঁটে উপস্থিত হবে। একদল সওয়ারিতে আরোহণ করে উপস্থিত হবে। একদল মুখের ওপর ভর করে উপস্থিত হবে। এক সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! মানুষ মুখের ওপর ভর করে কীভাবে চলবে? তখন রাসুল (সা.) বললেনÑ যে মহান সত্তা পৃথিবীতে তোমাদের দুটো পায়ে ভর করে হাঁটার শক্তি দিয়েছেন, হাশরের ময়দানে চেহারায় ভর করে হাঁটার শক্তিও তিনি দিতে পারেন। ভালোভাবে বুঝে নাও; তারা তাদের মুখের দ্বারাই জমিনের প্রতিটি টিলা ও কাঁটা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে।’ (বুখারি : ৪৭৬০; মুসলিম : ২৮০৬; তিরমিজি : ৩১৪২)। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তাদের জাহান্নামের পথে হাশর করব চেহারায় ভর করে হাঁটিয়ে; দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকশক্তিরোহিত অবস্থায়। সেটা সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা ও বক্র পথ।’ (সুরা ফুরকান : ৩৪)
অন্যান্য প্রাণীর উপস্থিতি
পৃথিবীতে যত রকম প্রাণীর আবির্ভাব ঘটেছে সব প্রাণীকেই হাশরের ময়দানে উপস্থিত করা হবে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সব রকম প্রাণী, নিজ ডানায় উড়ন্ত পাখিÑ তারা সবাই তোমাদের মতো এক একটি জাতি। কিতাবে কোনো কিছুই আমি বাদ দেইনি। সবশেষে সবার প্রভুর সামনে সবাইকে হাশর করা হবে।’ (সুরা আনআম : ৩৮)। অন্যান্য প্রাণীদেরও মানুষের মতোই হিসাব ও বদলা নেওয়ার জন্য উপস্থিত করা হবে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন সব সৃষ্টিজীবকে জমা করা হবে; এমনকি চতুষ্পদ জীবজন্তু, হিংস্র প্রাণী, পাখি সব কিছুকেই। আল্লাহ সবার প্রতি ন্যায় বিচার করবেন। ফলে পৃথিবীতে যে প্রাণী শিং থাকার কারণে শিংবিহীন প্রাণীর ওপর অত্যাচার করেছিল, সেদিন সে অত্যাচারিত প্রাণীকে অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। বিচার শেষ হলে আল্লাহ বলবেন সবাই মাটির সঙ্গে মিশে যাও। (মানুষের মতো অনন্তকাল তাদের স্বর্গ কিংবা নরক নেই।) তখন কাফেররা বলবেÑ ‘হায় আমরা যদি মাটি হতাম!’ (সুরা নাবা : ৪০; মুসতাদরাকে হাকেম : ৩২৩১)
সবাই সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকবে
হাশরের ময়দানে উপস্থিত হয়ে সবাই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘সেদিন রুহ ও ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। আল্লাহর আদেশ ছাড়া কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না। যা বলবে সব ঠিক ঠিক বলবে। সেদিন অবশ্যই আসবে।’ (সুরা নাবা : ৩৮-৩৯)। অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে পরিপূর্ণভাবে। আগমন করবেন তোমার রব। আর ফেরেশতারা উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। সেদিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে। সেদিন মানুষ পৃথিবীর জীবনের সব কিছুই স্মরণ করবে। কিন্তু সেই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে? মানুষ বলবেÑ হায়! যদি আমি কিছু প্রেরণ করতাম আমার এ জীবনের জন্য!’ (সুরা ফজর : ২১-২৪)
মাথার ওপরে সূর্য ও ঘামের নদী
হাশরের ময়দানের চিত্র হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। সেদিন সূর্যকে মানুষের অনেক কাছাকাছি করে দেওয়া হবে। ফলে তীব্র উত্তাপে সবাই ছটফট করতে থাকবে। প্রতেকেই ঘর্মাক্ত শরীরে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ কেউ ঘামের নদীতে হাবুডুবু খেতে থাকবে। হজরত মিকদাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলকে (সা.) এ কথা বলতে শুনেছি, ‘কেয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টির অনেক নিকটবর্তী করে দেওয়া হবে। এমনকি মানুষের এক মাইলের কাছাকাছি উচ্চতায় নেমে আসবে। ফলে মানুষ তার তীব্র উত্তাপে আপন আপন আমল পরিমাণ ঘর্মাক্ত হবে। যার আমল যে পরিমাণ মন্দ হবে তার ঘাম সে পরিমাণ বেশি হবে। কারও ঘাম তাদের পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত হবে। কারও ঘাম তাদের হাঁটু পরিমাণ হবে। কারও ঘাম তাদের কোমর পরিমাণ হবে। কারও ঘাম তাদের মুখমণ্ডল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। রাসুল (সা.) নিজের মুখের দিকে হাতের ইশারা করে বললেনÑ তাদের ঘাম এই পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।’ (বুখারি : ৬৫৩১; মুসলিম : ৭২০৬)
সবাই নিজেকে নিয়ে পেরেশান থাকবে
সেদিন ভয়ে ও আতঙ্কে সবাই নিজেকে নিয়ে পেরেশান থাকবে। সবাই ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি করতে থাকবে। হাদিসে এসেছে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি হাশরের ময়দানে ভয়ে ও আতঙ্কে বলতে থাকবেÑ ইয়া রব! ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি! আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান! আর রাসুল (সা.) বলবেন, উম্মাতি, উম্মাতি!’ (বুখারি : ২৭১২; কিতাবুত তাজকিরাহ, ইমাম কুরতুবি : ১২৮৪; আদ্দুররুল মানসুর : ৫/৬৪)
পরিবার-প্রিয়জন থেকে আত্মগোপন
হাশরের বিভীষিকাময় ময়দানে কেউ কারও হবে না। আতঙ্ক ও ব্যস্ততার কারণে কেউ কারও পরিচয় দেবে না। পরিচিত কাউকে দেখামাত্র দূরে ও আড়ালে পালিয়ে বেড়াবে। এমনকি পরিবার-প্রিয়জন থেকেও নিজেকে লুকিয়ে ও আড়াল করে রাখবে। কোরআনে এসেছে, ‘যখন কর্ণবিদারী বজ্রনির্ঘোষের দিন আসবে, মানুষ পালিয়ে বেড়াবে তার আপন ভাইয়ের কাছ থেকে, মা ও বাবার কাছ থেকে, স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে! সেদিন প্রতিটি মানুষের অবস্থা এমন গুরুতর হবে যে, সবাইকে তা অন্যের কাছ থেকে ফিরিয়ে-তাড়িয়ে রাখবে। সেদিন কিছু মুখমণ্ডল হবে উদ্ভাসিত, হাস্যোজ্জ্বল ও প্রফুল্ল আর কিছু মুখমণ্ডল হবে বিবর্ণ ও ধূসর; তাতে আচ্ছন্ন করে রাখবে বিষাদ-কালিমা! তারাই কাফের ও পাপাচারী।’ (সুরা আবাসা : ৩৩-৪২)
বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষা
হাশরের ময়দানে মানুষ দীর্ঘ বছর ধরে অবস্থান করবে। একেকটি দিন হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের মতো দীর্ঘ। এর ভেতর সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর বিচারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। মানুষ চাইবে দ্রুত যেন বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা হাশরের ময়দানে পৃথিবীর আরম্ভ থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত সব মানুষকে জমা করবেন। সবাই চল্লিশ বছর দৃষ্টি স্থির করে দাঁড়িয়ে থাকবে আল্লাহর বিচারকার্য আরম্ভ হওয়ার প্রতীক্ষায়। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা মেঘের মতো ঘন ছায়ায় অবতরণ করবেন।’ (আল-মুজামুল কাবির: ৯৭৬৩)। যদিও এই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা আল্লাহর নেককার বান্দার জন্য কষ্টকর হবে না। আল্লাহর বিশেষ রহমতে তারা স্বাভাবিক দিনের মতোই থাকবেন। এরপর মানুষ পৃথিবীতে যেসব আমল করেছে সেসবের বিচার করা হবে এবং প্রত্যেকের প্রতিদান দেওয়া হবে।

আগামী বৃহস্পতিবার পড়ুন
‘হাশরের মাঠে মানুষের বিচার’






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]