ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০ ১৮ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০

এসএসসি উতরে গেল, এইচএসসি আটকে গেল
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২০, ১১:৪৮ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 111

করোনাভাইরাসে সবকিছুই বন্ধ। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও এর মধ্যে রয়েছে। ৩১ মে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। পরীক্ষাটি ফেব্রæয়ারি-মার্চের শুরুতে শেষ হয়ে যাওয়ার পর ১ মাস বিলম্বে হলেও ফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে ফেব্রæয়ারির শুরু থেকে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাসমূহের উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য যথাসময়ে বোর্ডগুলো বিতরণ করায় পরীক্ষকদের পক্ষে করোনা ছুটিতে ঘরে বসে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়েছে। সে কারণেই পরীক্ষার ফল শেষ পর্যন্ত বোর্ডগুলোর পক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। এসএসসি  বা সমমানের পরীক্ষায় এবার অংশ নিয়েছিল ২০ লাখেরও অধিক। কারিগরি, মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার মোট ১২টি শিক্ষা বোর্ড এই বিশাল পরীক্ষা কেন্দ্রিক কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করে থাকে। বিষয়টি মোটেও সহজ কাজ নয়। এত সব শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা, উত্তরপত্র বিতরণ ও মূল্যায়ন শেষে ফলাফল প্রস্তুতকরণ এবং সব কিছুকে একসঙ্গে ফল প্রকাশের জন্য গুছিয়ে আনা খুবই কঠিন কাজ। দেশের স্বাভাবিক সময়ে সেটি বোর্ডগুলো দক্ষতার সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে করে আসছে। সে কারণে পরীক্ষা শেষে ২ মাস সময় নিয়ে অতীতে বোর্ডগুলো এসএসসি-এইচএসসির  ফলাফল প্রকাশ করতে পেরেছিল। এখানে প্রযুক্তি একটি বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই বছর পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্নতর ছিল। করোনাভাইরাসের ছুটিকালে যোগাযোগসহ অনেক কিছুই বন্ধ ছিল। এরপরও সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগের ফলে বিশাল এই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল ৩১ মে প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে এসএসসির ফলাফল প্রকাশ নিয়ে অধীর অপেক্ষা করার লক্ষণ ছিল। সেটি ফল প্রকাশের ঘোষণা আসার পর অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়। অনেকের ধারণা ছিল পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা সহসা সম্ভব হবে কি না। করোনার কারণে ঘরে বসে থাকলেও পরীক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের উৎকণ্ঠা বিরাজ করেই। বলা চলে এই ফলাফল প্রকাশের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের সব উদ্বেগ ও অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। উতরে গেছে দেশের ২০ লাখের অধিক এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের এই ধাপটি। তবে যেহেতু করোনা পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি, কবে হবে তারও নিশ্চয়তা নেইÑ তাই উত্তীর্ণদের পরবর্তী উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হওয়া এবং ক্লাস করা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। এক্ষেত্রে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় কিছু নেই। এদের অন্তত সান্ত¡না যে তারা এসএসসি পরীক্ষার ফল পেয়েছেÑ যা বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছুটা হলেও তাদেরকে উদ্বেগমুক্ত রাখতে পারছে।
এই মুহূর্তে সবচাইতে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক শিক্ষক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও। এইসএসসি পরীক্ষা শুরু করার প্রাক্কালেই করোনা সংক্রমণের কারণে দেশব্যাপী সরকারকে সবকিছু বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষাও এর মধ্যে পড়ে যায়। যেসব পরীক্ষার্থী এক সপ্তাহ পরেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল তাদেও সব প্রস্তুতি ভেস্তে যায়, গত তিন মাস ধরে তারা এখন ঘরবন্দি, পরীক্ষার অপেক্ষার আর শেষ নেই, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং তাদের পরীক্ষার অনিশ্চয়তাও প্রলম্বিত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই শুধু তাদের পরীক্ষার তারিখ পুনঃনির্ধারিত হতে পারে। তারপরই শুধু মাসব্যাপী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা। এরপর ২ মাস উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের জন্য প্রয়োজন। সুতরাং বলতেই হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা একটা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে গেল। এরপর তাদের পরবর্তী শিক্ষাজীবন কবে শুরু হবে সেটিও একই সূত্রে যুক্ত হয়ে গেছে। মনে হয় এর জন্য দুঃখ বা আক্ষেপ করে কোনো সান্ত¡না খুঁজে পাওয়া যাবে না। ধৈর্যধারণ এবং স্বাভাবিক জীবনের অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো কিছু ভেবে লাভ নেই।
দেশে একটি মত গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রায়ই শুনছি। কোনো কোনো শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সরকারকে কারিকুলাম কমিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে পরীক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এমনকি প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এই নীতি অনুসরণ করার কথা তারা বলছেন। আমি জানি না সরকার এসব মতামত বা উপদেশ কতটা গ্রহণ করবে তবে সংক্ষিপ্ত কারিকুলামের পঠন-পাঠন ও পরীক্ষার ক্ষতিকর প্রভাব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে এমনকি জাতীয় জীবনেও কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় সেটি বোধ হয় অতীত ইতিহাস থেকে জেনে নেওয়া ভালো। পাকিস্তানকালে একবার অটোপাস দেওয়া হয়েছিল। এর বিড়ম্বনার যেমন স্বীকার হতে হয়েছিল অনেক শিক্ষার্থীকে, একইভাবে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব থাকা উত্তীর্ণদের চাকরিক্ষেত্রে প্রবেশ জাতির জন্য খুব একটা সুখকর হয়নি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সবকিছু বন্ধ ছিল। ১৯৭২ সালে সংক্ষিপ্ত কারিকুলামে এসএসসি ও এইচএসসির দুই দুটি ব্যাচকে একবছরে পার করানোর প্রভাবটিও আমাদের শিক্ষাসহ সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় জীবনে কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল সেটি আমরা কতটা তলিয়ে দেখেছি তা জানি না। তবে না পড়িয়ে কিংবা কম পড়িয়ে শিক্ষাজীবন গড়ে তোলা অসম্ভব ব্যাপার। এখন সবক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা আগের চাইতে বেড়েছে। সংক্ষিপ্ত কারিকুলাম দিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপে যেয়ে বিড়ম্বনা ও জ্ঞান শূন্যতায় পড়বেÑ সেটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এমনিতেই আমাদের শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই পাবলিক পরীক্ষায় যে ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে তা মোটেও বিষয় জ্ঞানকে খÐিত আকারের চাইতে সামগ্রিক ধারণা সৃষ্টির জন্য উপযোগী নয়। আগের বছর পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন এসে যায়,  পরের বছর ক্লাস ও পরীক্ষায় সেসবের অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানগত ধারণা তৈরিতে বড় ধরনের অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। এটি আমরা অনেকেই তলিয়ে দেখছি না, স্বীকারও করছি না। আমাদের পাবলিক পরীক্ষাগুলো এভাবেই অঘোষিতভাবে সংক্ষিপ্ত কারিকুলামভিত্তিক প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আমরা পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে খুবি উচ্ছ¡সিত। দেশে ৪টি শিক্ষা বোর্ড থেকে এখন ১২টিতে সম্প্রসারিত হয়েছে। অবশ্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কয়েকগুণ বেড়েছে। কিন্তু আমরা পাবলিক পরীক্ষার বেড়াজালে শিক্ষার্থীদের যেভাবে আটকে ফেলেছি তার নানাবিধ সমস্যার অন্যতম একটি হচ্ছে একসঙ্গে দেশব্যাপী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা ও ফল প্রকাশের কর্মযোগ্য ঘাড়ে নেওয়া। কিন্তু এর মাধ্যমে আমাদের অর্জন কতটুকু, সমস্যা কী কী, পৃথিবী কোন দিকে যাচ্ছে, আমরা উল্টো দিকে কতটা চলে গেছি এর কোনোটাই তলিয়ে দেখছি না। পাবলিক পরীক্ষা মূলতই মধ্যম ও নিম্নমধ্যম মানের ব্যবস্থার চাইতে বেশি কিছু নয়। গত ৩ দশক ধরে গণমাধ্যমে আমি পাবলিক পরীক্ষার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা নিয়ে ক্রমাগত লেখালেখি করে আসছি। উন্নত দুনিয়ায় অনেক আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং পরীক্ষার মূল্যায়ন দায়িত্বের সঙ্গে করে থাকে। সেসব দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই বিতর্কের ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতায় সফল হচ্ছে। সেসব প্রতিষ্ঠান কারিকুলামের শুরু থেকে শেষ অবধি পাঠদান ও পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে বিষয়গত ধারণা তৈরি ও যাচাই-বাছাই করার চেষ্টা করে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এর সংখ্যা ও পাশের হার নিয়ে যতই আমরা আনন্দ-উচ্ছ¡াস প্রকাশ করি না কেন বাস্তবে এর মধ্যে অনেক দুর্বলতা, অতি মূল্যায়ন, অবমূল্যায়ন ইত্যাদির ছড়াছড়িতে সবাই বিভ্রান্ত। বেশিরভাগ কৃতি শিক্ষার্থী কৃতিত্বের উচ্ছ¡াস ধরে রাখতে পারে না। এখন আমাদের যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক পাঠদান ও পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকত তাহলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আমরা মানসম্মত পাঠদান ও পরীক্ষার মূল্যায়নে পিছিয়ে পরতাম না। বর্তমান করোনার সংক্রমণকালে উন্নত দুনিয়ার দেশে দেশে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই শিক্ষাজীবন স্বাভাবিক রাখতে পারছে। আমরা কেন পারছি না তা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। ১৫-২০ লাখ শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষার কোটি কোটি উত্তরপত্র টানার বোঝা যখন শিক্ষা বার্ডগুলো  ঘাড়ে নিয়েছি তখন ব্যক্তি শিক্ষার্থীরা ওসবের নিচেই চাপা পড়ে থাকবে। করোনা-উত্তর বিশ্ব পরিস্থিতিতে সব কিছু দ্রæত বদলে যাচ্ছে। আমাদের চিন্তা-ভাবনায় পরিবর্তনের সেই লক্ষণ আদৌ আছে কি? কয়েক দশক আগের পুরনো ব্যবস্থা দিয়ে নতুন শিক্ষা ও বিশ্ব ব্যবস্থায় আমরা আদৌ টিকে থাকতে পারব না।

ষ শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]