ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০ ১৮ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০

করোনাকালীন বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বশিরুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২০, ১১:৪৮ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 62

আজ ৫ জুন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছর দিবসটির এমন এক সময় এসেছে যখন সারা পৃথিবী থমকে আছে করোনাভাইরাসের কারণে। যে ভাইরাস প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ। ইতোমধ্যে যে রোগ আন্তর্জাতিক মহামারী বলে ঘোষিত। আমাদের দেশেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। যার প্রতিষেধক এখনও আয়ত্বের বাইরে। তা নিয়ে আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা তো হবেই। যদিও এর থেকে কোনো অংশে কম নয় এর পরোক্ষ বা পরবর্তী প্রভাব। এই অবস্থা থেকে কখন মুক্তি মিলবে তার কোনো সুস্পষ্ট ধারণা কেউ দিতে পারছে না। প্রশ্ন উঠেছে কেন এই সংক্রমণ এত আতঙ্ক, কেন করোনাভাইরাস এত শক্তিশালী, করোনাভাইরাস কি প্রকৃতির প্রতিশোধ? এক বাক্যে হয়তো প্রকৃতিপ্রেমীরা বলে উঠবেন, হ্যাঁ। সত্যিকার অর্থেই আমাদের চেনা পৃথিবী আজ বদলে গেছে পুরোপুরি। আসলে শতাব্দীকাল এই পৃথিবী আমরা ভোগ করেছি। এখন কিছুদিন উপভোগ
করছে প্রকৃতি।
প্রকৃতির এমন সঙ্কটময় মুহূর্তের মধ্যে এ বছর পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। মানুষ আর পরিবেশের দূরত্ব ঘুচিয়ে এক সবুজ নির্মল পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে দিবসটিকে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতার মধ্যে এবার পরিবেশ দিবস ঘরে থেকেই উদযাপনে জোর দিচ্ছে জাতিসংঘ। আসলে প্রতিবছরই নানা আয়োজনে মধ্যে দিয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু পরের দিন আবার সব কিছু আগের মতো। এ বিষয়ে কঠোর আইন ও জনমত তৈরি প্রয়োজন। সেই সঙ্গে সচেতন হতে হবে সবার আগে আমাদের নিজেদের। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দশ বছর পর বাসযোগ্য শহরের সংখ্যা কমে আসবে অনেক।
একবার ভেবে দেখুন প্রকৃতির সঙ্গে, মাটির সঙ্গে, পানির সঙ্গে, বৃক্ষের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করে আসছি আমরা? আইন করেও পলিথিনের অধিক ব্যবহার আমরা আজও কমাতে পারেনি। ঢাকার আশপাশের ইটভাঁটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। নগরায়ণ নামে আমরা বনাঞ্চল কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছি, যার ফলে পশুপাখির অভয়ারণ্য এই পৃথিবীর জায়গা ছোট করে দিচ্ছি। পানি, মাটি সবকিছু দূষণ করে চলছি। করোনাকালীন ব্যবহৃত হ্যান্ড গøাভস, সার্জিক্যাল হ্যান্ড গøাভস, সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতলের বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলে দিচ্ছি। এগুলো পানিতে মিশে মারাত্মকভাবে সংক্রমণের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এতে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু নদী ছাড়াও ঢাকার ভেতরে ও চারপাশের ডোবা-নালা, মজাপুকুর, ড্রেন সর্বত্রই মারাত্মক দূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। যার পরিণাম আমরা ভেবে দেখি না। ফলে জীববৈচিত্র্য আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন।
মনে হচ্ছে, এই নতুন ভাইরাসটি যেন এক অদৃশ্য দÐ হয়ে আমাদের সতর্ক করতে চাইছে। যেন সাবধান করতে চাইছে এই বলে, প্রকৃতি ও পরিবেশের এমন নির্বিচার ধ্বংস অভিযানে লাগাম ধর। তা না হলে তার মূল্য কিন্তু চুকাতেই হবে। করোনাভাইরাস মানুষের জন্য অভিশাপ হলেও প্রকৃতি জন্য আশীর্বাদ। কারণ আজ আমরা গৃহবন্দি বলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে প্রকৃতি। দূষণ কমেছে বলে আমাদের ঘিরে থাকা জীবজগৎ, প্রকৃতি আজ নতুন প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। পাহাড়-বন-সাগর প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে হারানো রঙ। খবরে দেখেছি, দূষণ না থাকার কারণে মার্চ মাসের শেষ দিকে কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে ডলফিনসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর অবাধ বিচরণ করেছিল। যা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। এমনকি করোনার প্রথমদিকে বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরের অন্যতম ঢাকায় বায়ুদূষণ কিছুটা কমে যায়। বুড়িগঙ্গার পানিও ফিরে পায় অক্সিজেন। কিন্তু রাজধানী ঢাকার পরিবেশ এখন ‘যেই লাউ সেই কদু’ অবস্থা। গণপরিবহনসহ মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় দূষণ আরও বেড়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, মানুষের নীরবতার কারণে যে প্রকৃতি সরব হয়ে উঠেছিল, মানুষের গৃহবন্দিত্বের কারণে যে হরিণেরা বন থেকে রাস্তায় ছুটে এসেছিল। দূষণ না থাকায় যে ডলফিনেরা সৈকতে চলে এসেছিল। পৃথিবীর উষ্ণায়নের জন্য দায়ী পরিবেশবৈরী উন্নয়নকর্মকাÐ স্থবির থাকায় যে ওজন স্তরের গর্ত ভরাট হয়ে গেল। সেই পরিস্থিতি আসলে কতদিন টিকবে? আমি মনে করি, করোনা বিপর্যয় আমাদের অনুভব করার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্য জীবদের বেঁচে থাকার, নিজের মতো করে আনন্দে থাকার অধিকারের কথা। এই পৃথিবী শুধু আমাদের নয়, একই সঙ্গে তাদেরও, এই উপলব্ধিটুকু এই বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে আমাদের শিক্ষা। এই বর্তমান পরিস্থিতি আসলে সমগ্র মানবসমাজকে আয়নার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই আয়নায় তাকিয়ে নিজেদের সংশোধন করার এটাই আদর্শ সময়।
এই পৃথিবী কলেরা মহামারি দেখেছে। প্লেগ দেখেছে। স্প্যানিশ ফ্লু দেখেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৃত্যু মিছিল থেমে গিয়ে নতুন শুরু দেখেছে এই পৃথিবী। একই রকমভাবে এই করোনাভাইরাসে বিপর্যন্ত, দিশাহারা সময় অতিক্রম করে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরব আবার আমরা। অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়তো কয়েক বছর বাদে কাটিয়ে উঠবে গোটা পৃথিবী। এই দুঃসময় হয়ত আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে জানবে একদিন। কিন্তু আমরা যারা আজ এই দুঃসময় প্রত্যক্ষ করলাম, তাদের জীবনে, যাপনে, মননে, চিন্তনে কি এই অভিজ্ঞতা কোনো প্রভাব রেখে যাবে? শুধু পরিবেশ দিবসে পরিবেশ সচেতনতায় কথা না ভেবেÑ এ ভরাবহতার কথা সারা বছর ভাবি। পরিবেশ রক্ষা একসঙ্গে কাজ করি। আইন মানি। সচেতন হয়। নতুবা আমরা আমাদের  পরবর্তী প্রজন্মকে হুমকির মুখে রেখে দিব। এ হুমকির মুখে ফেলে দেওয়ার আগে আরেকবার ভাবুন। পরিবেশ দিবস সচেতনতা সৃষ্টির দিন, পরিবেশকে নতুন চোখে দেখার দিন, পরিবেশ সংরক্ষণের কাজে নিজেকে জড়ানোর দিন। এই দিনের কাজ, এই দিনের শিক্ষা ছড়িয়ে দিন সারা বছর জুড়ে। তবেই পরিবেশ দিবস পাবে তার সার্থকতা।

ষ জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত)
    শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]