ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০ ১৮ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০

ভার্চুয়াল কোর্ট যোগাযোগ প্রযুক্তিতে নতুন মাইলফলক
সৈয়দ নুরুর রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 75

ভার্চুয়াল আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে যোগাযোগ প্রযুক্তির নতুন এক জগতে। এর নাম ভার্চুয়াল জগৎ। এর ফলে আরও গতিময় হয়ে উঠছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন। ভার্চুয়াল আদালতের নতুন ধারণা ইতোমধ্যে দেশব্যাপী বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। ১১ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথম ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। ঐতিহাসিক এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের বিচারাঙ্গনেও শুরু হয় প্রথাগত বিচার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ভার্চুয়াল আদালত ব্যবস্থাপনা। ইন্টারনেট কেন্দ্রিক ভার্চুয়াল জগৎ প্রতিনিয়ত আমাদের প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে। এই জগতের কল্যাণে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে নিমিষেই। একসময় যা ছিল খুবই অকল্পনীয়। ভার্চুয়াল জগত হচ্ছে এমন এক জগত যেখানে মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটে কম্পিউটার, মোবাইল তথা যন্ত্রের সহযোগিতায়। মূলত আমরা বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল ফোনে যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তা সম্পর্কে একটু চিন্তা করলেই এই ভার্চুয়াল জগতের বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল ও চ্যাটরুমের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে তৎপর। বিশ্বায়নের যুগে এই জগতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। ভার্চুয়াল জগত মানুষের সামনে নতুন নতুন সব দিগন্ত খুলে দিয়েছে। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে এ করোনাকালে অধিকাংশ টকশোই ভার্চুয়াল টকশো। পারস্পরিক আড্ডাও এ সময় ভার্চুয়াল জগতকে ঘিরেই জমজমাট হয়ে ওঠে। তারই সর্বশেষ মাইলফলক সংযোজন হচ্ছে ভার্চুয়াল আদালত।
চীনের হুবেই প্রদেশের উহানের করোনাভাইরাস যখন বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেয় তখন আমাদের দেশও নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি হয়। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ১৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ২৬ মার্চ থেকে প্রথম দফায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। ঘোষিত সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে আদালতগুলোতেও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ক্রমেই সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সাধারণ ছুটির মেয়াদ পঞ্চম দফায় ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে দেশের বিচার ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে আসে। বিচার প্রত্যাশী মানুষের বিচার প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে আদালত বন্ধ থাকায় বিচারবিভাগ সংশ্লিষ্ট অনেকেই ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনার জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে সুপ্রিমকোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘ফুল কোর্ট সভা’ থেকে ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে ভার্চুয়াল আদালত চালু করতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করা হয়। এ বিষয়ে এগিয়ে আসে আইন মন্ত্রণালয়। ৬ মে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০-এর খসড়ায় নীতিগত ও চ‚ড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এরপর মহামান্য রাষ্ট্রপতি ৯ মে ভার্চুয়াল উপস্থিতিকে স্বশরীরে আদালতে উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করে ‘আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ-২০২০’ নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করেন। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ, ২০২০’ নামে ভার্চুয়াল আদালতের গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এই অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে ভার্চুয়াল উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আদালতকে মামলার বিচার, বিচারিক অনুসন্ধান, দরখাস্ত বা আপিল শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক গ্রহণ, আদেশ বা রায় দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এই অধ্যাদেশ জারি পর সুপ্রিমকোর্টের বিচারকাজ পরিচালনার জন্য ভার্চুয়াল ব্যবস্থা হাইকোর্ট রুলসে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভার্চুয়াল আদালতের গেজেট প্রকাশ হওয়ার পরদিন ১০ মে প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে ফুলকোর্ট সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভা শেষে ওইদিনই সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের স্বাক্ষরে আদালতের জন্য ২১ দফা নির্দেশনা সম্বলিত ‘প্র্যাকটিস নির্দেশনা’ এবং আইনজীবীদের জন্য ‘ভার্চুয়াল কোর্টরুম ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া হাইকোর্টে তিনটি ভার্চুয়াল বেঞ্চ ও আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতের বেঞ্চ গঠন করা হয়।
করোনাভাইরাসকেন্দ্রিক সাধারণ ছুটি ও অবকাশকালীন ছুটি বা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত, হাইকোর্ট ও সারা দেশের অধস্তন আদালতগুলো ভার্চুয়াল উপস্থিতির মাধ্যমে পরিচালনার জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়। সুপ্রিমকোর্ট অধস্তন আদালতগুলোকে ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে শুধু জামিন শুনানির অনুমতি প্রদান করে। নির্দেশনায় বলা হয়, ভার্চুয়াল আদালত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। প্রত্যেক আদালত একটি ই-মেইল আইডি এবং মোবাইল ফোন নাম্বারের মাধ্যমে চিহ্নিত হবে। আইনজীবীরাও একইভাবে চিহ্নিত হবেন। জামিন আবেদন এবং শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনলাইনে দাখিল করতে হবে। এই শুনানি এবং আদালতের কাজে অ্যাপ ব্যবহার করা হবে। আদালতের কাজ পরিচালনা করা হবে আদালতের প্রচলিত অফিস সময়ের মধ্যে। আর ভার্চুয়াল উপস্থিতি শারীরিক উপস্থিতি হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
এরপর ১১ মে দেশের ইতিহাসে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথম ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমদিন হাইকোর্টে বেশকিছু আবেদন দাখিল করা হয়। ওইদিনই কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজের ভার্চুয়াল আদালত থেকে একজন আসামির জামিন মঞ্জুরের আদেশ হয়। সারা দেশে ভার্চুয়াল আদালতে ১১ মে থেকে ২৮ মে পর্যন্ত ১০ কার্যদিবসে ৩৩ হাজার ২৮৭টি মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৯৩৮ জনের জামিন মঞ্জুর হয়েছে। এই সময়ে ভার্চুয়াল হাইকোর্ট থেকেও বেশকিছু জামিন আদেশ হয়েছে। আর এরই মধ্যে জামিন পেয়েছে দুই শতাধিক শিশু। ৩০ মে’র পর সরকার সাধারণ ছুটি না বাড়ালেও সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত ‘ফুল কোর্ট সভা’ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ভার্চুয়াল আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই ভার্চুয়াল আদালতের জন্য সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারকের অধীনে ইউএনডিপি প্রশিক্ষণ, অনলাইন টিউটোরিয়াল ও সফটওয়্যারের কাজ করছে। উচ্চ আদালত প্রাথমিকভাবে অধস্তন আদালতের ৮৩ জন বিচারককে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। এই প্রশিক্ষণে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসকেও সংযুক্ত করা হয়েছে। বিচারকদের এই প্রশিক্ষণ ধারাবাহিকভাবে চলার পরিকল্পনা রয়েছে। আইনমন্ত্রী এ আইনটিকে যুগান্তকারী এবং এ আইন বাংলাদেশে আর একটি নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে বলে সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করে বলেছেন, বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজ করার জন্য আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পনা ছিল। ই-জুডিশিয়ারি করার জন্য একটি পরিকল্পনা একনেকে আছে। একনেকে পাস হলেই ওটার কাজ শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, করোনায় আদালত বন্ধ থাকায় দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে মামলা জট। তাই ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে কিছুটা হলেও মামলা জট কমানো এবং বিচার প্রার্থীদের বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ।
অবশ্য ভার্চুয়াল আদালত পরিচালনা শুরু করার পর অনেক ক্ষেত্রেই আইনজীবীদের মধ্যে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। যদিও দেশের অধিকাংশ আইনজীবী সমিতির অভিমত, এটি সরকারের খুব ভালো সিদ্ধান্ত।  কিন্তু তড়িঘড়ি করে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব না। এ জন্য আইনজীবীদের সময় দিতে হবে। এক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়নের জন্যে বিচারক, বেঞ্চ সহকারী, আইনজীবী, পুলিশ, কারা কর্তৃপক্ষ প্রত্যেককেই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি ছিল। কিন্তু তা হয়নি। আদালতে বিচারকরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় দ্রæত লজিস্টিক সাপোর্ট নিতে পারলেও একজন আইনজীবীকে এগুলো করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবে শুরুতে কেউ কেউ দ্বিধায় থাকলেও জীবিকার তাগিদেই সবাই নিজে বা জুনিয়র বা সহকারীদের দিয়ে অনলাইন আদালতের প্রক্রিয়ার সঙ্গে অভ্যস্থ হওয়ার চেষ্টা করছেন।
শুরুতে আইনজীবীরা এতে অভ্যস্ত না বলে কেউ কেউ একটু অসুবিধার মধ্যে পড়লেও দ্রæততম সময়ের মধ্যে অনেক আইনজীবী এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। নানা প্রতিক‚লতা ডিঙ্গিয়ে প্রযুক্তির নতুন ধারণার সঙ্গে আইনজীবীরা সম্পৃক্ত হতে পেরে আনন্দিত। তবে প্রতিদিন আদালতপাড়ায় গিয়ে জামিন আবেদন, ওকালতনামা, মামলার প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র, বেইলবন্ড, রিলিজ অর্ডার, জিম্মাদারের পরিচয়পত্র স্ক্যান করা,  প্রতিনিয়ত কারাগার থেকে ওকালতনামা সংগ্রহ, দরখাস্ত, জামিননামা কিনে প্রস্তুত করার যাবতীয় ছুটাছুটির কাজগুলো করতে হয়েছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। এক্ষেত্রে আইনজীবী কিংবা আইনজীবী সহকারীদের ঘর থেকে বের হয়েই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যেও আইনজীবীদের নিরন্তর প্রত্যাশা, এ অদ্ভুত আঁধার কেটে যাক। অচিরেই যেন সেই নতুন প্রভাতের আলো ছড়িয়ে পড়ে, আবারও যেন চিরচেনা আদালত অঙ্গন সরব হয়ে ওঠে।

ষ সাবেক সাধারণ সম্পাদক
      কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]