ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০ ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০

করোনাকালের গল্প
করোনা ও মানবিকবোধ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২০, ১১:৫২ এএম আপডেট: ২৩.০৬.২০২০ ১২:১০ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 286

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে ‘উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা’ হিসেবে কর্মরত মো. আহসান হাবীব। করোনাকালীন নিজ দপ্তরের নির্ধারিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এ দুর্যোগ মোকাবিলায় তৃণমূল পর্যায়ে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন সরকারি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন । এরই মাঝে সস্ত্রীক কোভিড-১৯ পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন আহসান হাবীব।  বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাংবাদিকতা, আবৃত্তি, রোটার‌্যাক্টসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী এই মানবপ্রেমী করোনায় আক্রান্ত হয়েও দমে যাননি। কঠিন এই সময়ে যখন অনেকেরই মনোবল ভেঙ্গে পড়ে, তখন তিনি ঘরে বসেই নতুন উদ্যমে শুরু করেছেন মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখার প্রক্রিয়া। সবাইকে সচেতন করার ব্রত নিয়ে করোনা মোকাবিলা ও জীবনবোধের বিষয় নিয়ে নিয়মিত ফেসবুক লাইভে এসে তুলে ধরছেন নিজের অভিজ্ঞতা আর আত্মবিশ্বাসের গল্প। আহসান হাবীবের বলে যাওয়া সেসব অভিজ্ঞতা অনুলিখন করে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সময়ের আলো’তে। আজ দ্বিতীয় পর্বে থাকছে- করোনা ও মানবিকবোধ


করোনা শুধুমাত্র রোগ না। এটি আমাদের মানবজাতির জন্য একটি পরীক্ষা। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সময় এসেছে মানুষ হিসেবে নিজেদের মানবিকতার প্রমাণ দেবার। মানুষের উপকার করার মাধ্যমে পৃথিবীতে মানবতাকে বিজয়ী করার সুযোগ একমাত্র আমাদেরই আছে।

আমাদের প্রত্যেকের উচিত যার যার নিজস্ব জায়গা থেকে করোনা রোগীদের সাহায্য-সহযোগিতা করা। তাদের চিকিৎসা ও সামগ্রিক জীবনযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে মানবিক সহায়তার হাত প্রসারিত করা।

পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজপতি, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ প্রত্যেককে করোনা রোগ ও রোগাক্রান্তের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা জরুরি। এই রোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যে বৈরিতা তৈরি হয়েছে তা প্রতিহত করতে হবে। এই পরিস্থিতির বিপরীতে মানবিক বোধের চর্চা আবশ্যক। এতে আমি-আপনি সবাই ভালো থাকব। এই রোগের বিষয়ে সৃষ্ট ‘সামাজিক ট্যাবু’ ভাঙতে আমাদের প্রত্যেককে প্রভাবক বা অণুঘটকের ভূমিকা রাখতে হবে।

বিধর্মী বা পাপী লোকদেরই করোনা হয় -এমন হাস্যকর ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ও মনোভাব পরিহার করতে হবে। এই ভ্রান্তি মোকাবিলায় আওয়াজ তোলা, এমন কী কাউন্সিলিং করা প্রয়োজন। এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন যে, “করোনা একটি রোগমাত্র এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কেউ যে কোন সময় এতে আক্রান্ত হতে পারেন”।

প্রতিবেশীর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। বাড়িওয়ালাগণ যদি পারেন দুর্যোগকালীন বাড়ি ভাড়া সাময়িকের জন্য কমিয়ে দিন। এটা সম্ভব না হলে আপনার ভাড়াটিয়াকে সাহস দিন, ভাড়া পরিশোধের জন্য সময় দিন।

আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। করোনা হয়েছে মানে এই পরিবারকে সমাজচ্যুত করতে হবে, অবরুদ্ধ করতে হবে এমন ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রথমে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। তারপর পরিবারকে এ বিষয়ে বোঝাতে হবে এবং সমাজের প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। এই রোগের বিষয়ে সৃষ্ট ‘সামাজিক ট্যাবু’ ভাঙতে আমাদের প্রত্যেককে প্রভাবক বা অণুঘটকের ভূমিকা রাখতে হবে।

মনে রাখতে হবে, করোনা খুবই ভয়াবহ একটি রোগ। হাজার নিরাপত্তা নেবার পরও যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এ জন্য করোনা রোগীকে ঘৃণা করার কিছু নেই। আজ আপনি সুস্থ, কাল হয়তো করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। আজ আপনি আরেকজনকে ঘৃণা করলে কাল অন্যজন আপনাকেও ঘৃণাই করবে। তাই আসুন, ঘৃণা নয়, মানবিকতার চাষ করি।

নৈতিকতা হারিয়ে ফেলেছি আমরা। ৫ টাকার মাস্ক ২০ টাকা, হ্যান্ড স্যানিটাজারের দাম ৩ গুণ বৃদ্ধি করেও আমরা তৃপ্তি পাচ্ছি না। করোনায় অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো নিয়ে শুরু করেছি অমানবিক ব্যবসা। অক্সিজেনের দাম ১০ গুণ বাড়ানো হয়েছে। সব অবস্থায় অতি মুনাফার হীন মানসিকতা পরিহার করুন। একটু সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করুন। একটু মানবিক হোন। এত টাকা দিয়ে কী করবেন? কবরে তো টাকা নিয়ে যেতে পারবেন না। কারণ, কাফনের কাপড়ের তো কোন পকেট থাকে না।
সর্বোপরি, পরবর্তী প্রজন্মকে মানবিক বোধের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করুন। শুধু এ প্লাস আর অর্থ রোজগারের উপযোগী করে সন্তানকে গড়ে তুললে আপনার সন্তান তো অমানবিক মানুষই হবে। তাকে মানবিকতার ন্যূনতম শিক্ষাটুকুও দয়া করে দিন। আপনার সন্তানের সামনে মিথ্যা বলবেন না, বাবা-মার সাথে খারাপ আচরণ করবেন না, ভিক্ষুককে অমানবিকভাবে তাড়িয়ে দেবেন না, কাজের মানুষদের সাথে রূঢ় ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ করবেন না। এতে আপনার সন্তানের মানবিক বোধ অবচেতনভাবেই বিনষ্ট হবে। এতে আপনারই চুড়ান্ত ক্ষতি হবে।

পৃথিবী থেকে মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই মানবিকতাকে পৃথিবীর বুকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নইলে পৃথিবী দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে। নানাবিধ আধুনিক উপকরণ আর সোশ্যাল মিডিয়ানির্ভর জীবন কিন্তু আমাদের ভালো রাখতে পারবে না। বরং সমাজের কাছে, পরিবারের কাছেই ফিরতে হবে আমাদের। আর সেটার ভিত্তি মানবিকতার বুননে গড়া।

সবশেষে বলব, মানুষ, মানুষ এবং মানুষই সেরা। মানুষই আরাধ্য। মানুষেই সব কিছুর শুরু, মানুষেই শেষ। পৃথিবীর সব ধর্ম-মত-আদর্শেই মানুষের গুরুত্ব সবার উপরে। “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”। তাই আসুন, করোনাকে কেন্দ্র করে হারিয়ে যেতে চলা মানবিক বোধগুলোকে আমরা আবার জাগ্রত করতে প্রয়াসী হই। মানবিক এক পৃথিবী গড়তে সবে মিলে কাজ করি আমরা।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]