ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০ ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০

করোনা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও করণীয়
উৎপল ভট্টাচার্য
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২০, ১১:২৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 344

মাত্র ছয় মাসের করোনা ঝড়ে ভেঙে পড়েছে সারা পৃথিবীর অর্থনীতির অবস্থা। পৃথিবীতে ইতিপূর্বে বহুবার এর থেকেও বড় বিপর্যয় এসেছে তারপরও অর্থনৈতিক অবস্থা এভাবে ভেঙে পড়েনি।

১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম যুদ্ধ চলাকালীন সময় ১৯১৮ স্প্যানিশ ফ্লুর আগমন ঘটে। প্রায় এক কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে কিন্তু তৎকালীন সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়েনি বরং বিশ্ব অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়। দীর্ঘদিন চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সারা পৃথিবী আক্রান্ত হয় কয়েক কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে।সারা পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো ভেঙে যায় কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধের সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ জাপান, জার্মানি এবং আমেরিকার অর্থনীতি পুনরায় শক্তিশালী অবস্থায় ফিরে আসে এবং সারা পৃথিবীর অর্থনীতি এক গতিধারায় পরিচালিত হয়।

কিন্তু এবারের করোনাভাইরাস মাত্র ৬ মাসে সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে একেবারে ভেঙে ফেলেছে । ৪ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ লোকের মৃত্যু হলেও অর্থনৈতিক অবস্থা এত বাজে দিকে যাচ্ছে যে অর্থনীতিবিদরা বলতে পারছে না কবে অর্থনীতি পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা খুবই নাজুক। মাত্র তিন মাসে এই ঝড়ে আমাদের অর্থনীতির এত বড় ক্ষতি হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষা এবং পেশাভিত্তিক চরম বাণিজ্যিকরণ এবং অতি অবাধ পেশাভিত্তিক স্বাধীনতা।
প্রথমেই দেখা যাক আমাদের এই অর্থনৈতিক ধসের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা কতখানি দায়ী। আমাদের দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় অতি বাণিজ্যকরণ লক্ষণীয়। শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে আর্থিক সুবিধা বেশি পাওয়া যাবে শুধুমাত্র সেই বিষয়ের প্রতি অতিমাত্রায় আকর্ষিত হয় যার ফলাফল খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৯০ দশকের পর পর যখন কম্পিউটার বিজ্ঞানের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায় তখন আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয় কম্পিউটার বিজ্ঞান শিক্ষাকে লোভনীয় পর্যায়ে নিয়ে যান। যার ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী কম্পিউটার বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স পাশ করেন। কিন্তু আস্তে আস্তে পাশ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত পরিমাণে হয়ে যায় যে অনেক স্নাতকোত্তর ধারীকে অতি অল্প বেতনে অনেকটা টেকনিশিয়ান এর ভূমিকায় কাজ করতে দেখা যায়। 

এ পড়ে বাণিজ্যে পড়ার  হিড়িক পড়ে যায়। হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাশ করে কিন্তু সে তুলনায় কর্মসংস্থানের পরিধি না বাড়ায় অতি অল্প বেতনে অনেককেই বিক্রয় কর্মীর নয় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। 
আইন শিক্ষা একই অবস্থা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাস করার কারণে আমাদের আইনজীবী সমিতি গুলো আইনজীবীর সংখ্যায় দিন দিন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা বারের আইনজীবীর সংখ্যা ২৫ হাজারের উপরে যা এশিয়া কেন একক কোন বার হিসেবে পৃথিবীর কোথাও নেই। কিন্তু সে তুলনায় মামলার সংখ্যা না বাড়ায় অনেক আইনজীবী অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়েছে। আমাদের দেশের সুপ্রিম কোর্ট বারের  একই অবস্থা।এখানকার আইনজীবীর সংখ্যা ও কলকাতা কিংবা এলাহাবাদ হাইকোর্ট বার থেকে বেশি ছাড়া কম নয়। 

তেমনি আমাদের দেশে পেশাভিত্তিক অতি প্রতিযোগিতা লক্ষণীয়। যখন আমাদের দেশ উবার তার ব্যবসা শুরু করে তখন অনেকেই তা সঞ্চয় কিংবা কৃষি জমি বিক্রি করে গাড়ি ক্রয় করে উবারে বিনিয়োগ করে। কিন্তু তিন মাস বন্ধ থাকায় অনেকে পুঁজি হারিয়ে গাড়ি বিক্রি করে পথে বসে গেছে। এ ধরনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করার মতন কোনো জ্ঞান বা চিন্তাভাবনা বিনিয়োগকারীর ছিলনা। তেমনি শেয়ারবাজারে লাভ দেখে অনেকেই তাঁর কৃষি জমি বিক্রি করে সেখানে বিনিয়োগ করেন যখন শেয়ার মূল্য নিম্ন পর্যায়ে চলে যায় তখন তাদের আর কিছু থাকে না কিন্তু শেয়ার বাজারের নতুন অনিশ্চয়তা জনক ব্যবসায় বিনিয়োগ করার মত জ্ঞান তাদের ছিল কি? 

তেমনি ডেসটিনির মত চিটফান্ড ব্যবসায় বিনিয়োগ করে অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন শুধুমাত্র ব্যবসা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান না থাকায় এবং অতি লোভের বশবর্তী হয়ে। বাংলাদেশের অতি সহজে পেশা বেছে নেয়ার মত সুযোগ পৃথিবীর সর্বোচ্চ পুঁজিবাদী দেশেও নেই। আমেরিকা কিংবা ইংল্যান্ড ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা আইনজীবী হতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয় যে কারণে সে সমস্ত দেশে পেশাভিত্তিক অতি প্রতিযোগিতা থাকলেও সেখানে কারো কাজের খুব একটা অভাব হয়না। কিন্তু আমরা অতি সহজ করে দেওয়ায় অমেধাবীদের আগমন ঘটে। যে কারণে আমাদের পেশাজীবীরাও এই সমস্ত বিপর্যয়ের সময় ব্যাপক আর্থিক কষ্টে পড়ে যান। বিশেষ করে আমাদের দেশের চিকিৎসকদের কথা চিন্তা করলে দেখা যায় যে যে পরিমাণ গাইনী বিশেষজ্ঞ কিংবা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় সে তুলনায় গবেষণাধর্মী চিকিৎসকের সংখ্যা নেই বললেই চলে। যে কারণে গতানুগতিক চিকিৎসা পেলেও নতুন কোন ওষুধ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের দেশ থেকে খুব কম উদ্ভাবিত হয়। সার্বিক বিবেচনায় শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ, অবাধ পেশাভিত্তিক স্বাধীনতা উপর শর্ত আরোপ করা এবং অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত প্রদান না করা হলে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং  স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংসের হাত থেকে কোনভাবেই রক্ষা করা যাবে না।

লেখকঃ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, ঢাকা।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]