ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৪ জুলাই ২০২০ ২০ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ৪ জুলাই ২০২০

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি, ৩২ লাশ উদ্ধার
সদরঘাটে দুই লঞ্চের সংঘর্ষ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ৩০.০৬.২০২০ ৩:৫১ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 60

আধা মিনিটেই ডুবে যায় লঞ্চটি ষ ঘটনা তদন্তে একাধিক কমিটি ষ মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড : নৌপ্রতিমন্ত্রী
রাজধানীর সদরঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে দুই লঞ্চের মধ্যে ভয়ঙ্কর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অনেক যাত্রী ডুবে গেলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩২ যাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার সকাল ৯টার দিকে  সদরঘাটের শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চ ময়ূরী-২ এর ধাক্কায় মর্নিং বার্ড নামের একটি ছোট লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে অর্ধ শতাধিক যাত্রী ছিলেন। পরে কিছু যাত্রী সাঁতরিয়ে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও বাকিদের নিয়ে লঞ্চটি তলিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ফায়ার সার্র্ভিস ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দল গিয়ে সোমবার বিকাল পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ মোট ৩২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আরও কিছু যাত্রীর সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল।
জানা গেছে, এ ঘটনার পরপরই ধাক্কা দেওয়া লঞ্চের চালককে আটক করেছে পুলিশ। ভয়াবহ এ ঘটনায় গঠন করা হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাÐ। অপরদিকে এ ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা দুই তলা মর্নিং বার্ড লঞ্চটি সদরঘাট কাঠপট্টি ঘাটে ভেড়ানোর চেষ্টায় ছিল। সে অনুযায়ী লঞ্চটি এগিয়েও যাচ্ছিল। কিন্তু মুহূর্তে চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ নামে একটি বড় লঞ্চ এসে সেটিকে দ্রæত ধাক্কা দেয় এবং তার ওপরে উঠে পড়ে। এতে সঙ্গে সঙ্গে ছোট লঞ্চ মর্নিং বার্ড দুভাগ হয়ে পানিতে ডুবে যায়। ধাক্কা দিয়ে ছোট লঞ্চটিকে ডুবিয়ে দেওয়ার পরই বড় লঞ্চটি পেছনে ফিরে যেতে থাকে। অন্যদিকে ছোট লঞ্চে থাকা কিছু যাত্রী জানালা, কেবিন থেকে বেরিয়ে সাঁতরিয়ে তীরে আসেন। বাকিরা বের হতে না পারায় সেখানে ডুবে যান। ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, যুবক ও কয়েকটি বাচ্চাও ছিল বলে জানিয়েছে প্রাণে বেঁচে আসা যাত্রীরা। স্থানীয়রা জানান, লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর কিছু যাত্রী সাঁতরে নদীর কিনারে উঠতে সক্ষম হন। তবে বেশিরভাগই উঠতে পারেননি। কতজন উঠতে পারেননি তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো কর্তৃপক্ষ। এ খবর পাওয়ার পরই সেখানে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ডুবে যাওয়ার আধা ঘণ্টা পর ডুবুরি দল সেখানে গিয়ে নিখোঁজ যাত্রীদের খুঁজতে শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। তবে এর আগে স্থানীয়রাও সহযোগিতা করে।
সকালে উদ্ধারকাজ শুরুর পরপরই ১৪ জনের লাশ উদ্ধার করে আনা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয় ১৬। সকালে উদ্ধারকাজ শুরুর সময়ে তেমন ভিড় না থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। বিভিন্ন নৌকায় করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা ডুবে যাওয়া স্থানটিতে নিখোঁজ যাত্রীদের খুঁজতে থাকে। এরপর রুদ্ধশ^াস অপেক্ষা চলছিল। আবারও কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ল মৃতদের মিছিল। একে একে তুলে আনা হলো আরও ৯টি মৃতদেহ। সর্বশেষ পর্যন্ত মোট ৩১টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার আগে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে সকাল ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা দিয়ে আসার পথে ব্রিজে আটকে যায়। পরে আবারও চেষ্টা করে বিকাল ৩টার দিকে বিআইডবিøউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় ডুবে যাওয়া স্থানটিতে আসতে সক্ষম হয়। এরপর প্রত্যয় উদ্ধার কাজ শুরু করে। তবে উদ্ধার কাজে সহযোগিতার জন্য ছুটে আসে র‌্যাবের হেলিকপ্টার। হেলিকপ্টার টহল দিতে থাকে আকাশে ঘুরে ঘুরে।
যেভাবে ঘটল লঞ্চডুবি : এই দুর্ঘটনার মুহূর্তে নদীর তীরে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে উঠে এসেছে সেই লঞ্চ ধাক্কা দেওয়া ও ডুবির দৃশ্য। সিসিটিভি ফুটেজে কীভাবে ময়ূরের এক ধাক্কায় ডুবে গেল মর্নিং বার্ড নামে ছোট লঞ্চটি। মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের ভিডিওটি অনুযায়ী সকাল ৯টা ১২ মিনিটে ঘটনাটি ঘটে। বড় লঞ্চ ময়ূর ঘাট থেকে পেছনের দিকে (ব্যাকে) যাচ্ছিল আর ছোট লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জ থেকে ঘাটের দিকে। হঠাৎই ব্যাকে আসা ময়ূরের ধাক্কায় মুহূর্তে উল্টে যায় ঘাটের দিকে যেতে থাকা ‘মর্নিং বার্ড’। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডবিøউটিএ) যুগ্মপরিচালক (বন্দর ও পরিবহন বিভাগ) একেএম আরিফ উদ্দিন বলেন, সিসি ক্যামেরার দুর্ঘটনার বিষয়টি ধরা পড়েছে। সেটাতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। তদন্ত টিম অবশ্যই তদন্তে এই বিষয়টি কাজে লাগাতে পারবে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা : ডুবে যাওয়া লঞ্চের জীবিত উদ্ধার হওয়া যাত্রী মো. মাসুদ বলেন, ঘাটে ভেড়ার জন্য আমাদের লঞ্চ (মর্নিং বার্ড) সোজা আসছিল। অন্য একটা লঞ্চ ত্যাছড়াভাবে (বাঁকা) রওনা দিয়েছে। ত্যাছড়াভাবে রওনা দেওয়াতে ওই লঞ্চটা ধাক্কা দিয়েছে আমাদের লঞ্চে। ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটা কাইত হয়ে ডুবে গেছে। তলায় যেতে ১০ সেকেন্ডও সময় নেয়নি। তিনি ওই সময় ডুবে যাওয়া লঞ্চের কেবিনে ছিলেন। ডুবে যাওয়ার সময় কেবিনের গøাস খুলে তিনি বেরিয়ে আসেন। ভেতরে তার দুই মামা থাকলেও তারা বের হতে পারেননি। নিখোঁজ থাকা দুই মামা হলেনÑ আফজাল শেখ ও বাচ্চু শেখ। মাসুদ আরও জানান, তার দুই মামাকে লঞ্চের একটি কেবিনে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। কিন্তু লঞ্চ পাড়ে ভেড়ার আগে মুহূর্তেই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তারা। তিনি তখনই সাঁতরিয়ে তীরে উঠলেও বাকিরা উঠতে পারেনি। লঞ্চটিতে দেড় শতাধিক যাত্রী ছিল বলে জানান তিনি।
মানুষের ভিড় উদ্ধার কাজে ব্যাঘাত : গতকাল এই দুর্ঘটনার পরই নদীতে উদ্ধার কাজ দেখার জন্য উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। উদ্ধারের পর মৃতদেহগুলো মাঝনদীতেই ফায়ার সার্ভিসের একটি বড় নৌকায় রাখা হয়। সেই বড় নৌকার চারপাশে ছোট ছোট নৌকা ভিড় করতে থাকে। প্রতিটি নৌকায় ছিলেন নিহতের স্বজনরা। কোনো মৃতদেহ নৌকায় তুলে আনার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনরা নৌকা নিয়ে সেটির আশপাশে ভিড় করে প্রিয় মানুষটিকে শনাক্তের চেষ্টা করেন। এ সময় স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তবে এতে উদ্ধার কাজে কিছুটা হলেও বাধার দৃষ্টি হয়। পরে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছোট ছোট নৌকাগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর লাশগুলো তুলে নৌকার মধ্যেই প্যাকেট করে তীরে আনার পর মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটি গঠন : এ ঘটনার পর ঘটনা তদন্তে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডবিøউটিএ)। এছাড়া আরও একটি সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন ও পিপিপি সেল) মো. রফিকুল ইসলাম খান। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। নৌপরিবহন সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব। কমিটি দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটন, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি/সংস্থাকে শনাক্তকরণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেবে বলে জানা গেছে।
জীবনের ক্ষতিপূরণ দেড় লাখ : লঞ্চডুবির ঘটনায় মৃত পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল লঞ্চডুবির ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন। এছাড়া মৃতদেহ দাফনের জন্য নগদ ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
এটি পরিকল্পিত হত্যাকাÐ : নৌপ্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাÐ। এটা যদি পরিকল্পিত হয় এবং সেটা যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ঘটনা দেখলে মনে হয় এটা পরিকল্পিত। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়ছে। ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে। ইতোমধ্যে চালককে গ্রেফতার করেছে নৌপুলিশ। আমরা সঠিক ঘটনা অনুসন্ধান করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। প্রতিমন্ত্রী বলেন, লঞ্চটি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যাত্রী নিয়েছিল। স্বাস্থ্যবিধি মানার পরও তাদের সলিলসমাধি হলো। লঞ্চে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি না তা আমরা তদন্ত করে দেখব। সেখানে কেউ দায়ী হলে ব্যবস্থা হবে।









সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]