ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৪ জুলাই ২০২০ ২০ আষাঢ় ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ৪ জুলাই ২০২০

বৈশ্বিক মহামন্দা মোকাবিলায় প্রস্তুত সরকার
ঢামেকে খাবারের ২০ কোটি টাকার ‘অস্বাভাবিক’ বিল পরীক্ষা হচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী
সংসদ প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ৩০.০৬.২০২০ ৩:৪৯ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 15

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবাদানকারী চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এক মাসের খাবারের বিল ২০ কোটি টাকা কী করে হয়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এটা আমরা পরীক্ষা করে দেখছি। যদি কোনো অনিয়ম হয় আমরা ব্যবস্থা নেব। সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন মন্তব্য করেন। এর আগে আলোচনায় সংসদ উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের হাসপাতালের খাবারের বিল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বৈশি^ক অর্থনৈতিক মহামন্দা মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনা মহামারির কারণে বৈশি^ক অর্থনীতি এখন মহামন্দার দ্বারপ্রান্তে। তাই দেশ ও জাতি একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ^ব্যাপী একই সমস্যা। তবে দেশের সব ধরনের মানুষ যাতে উপকৃত হয়, এ জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। ইতোমধ্যে ১৯টি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের যাবতীয় ব্যবস্থাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি করোনাভাইরাসে মৃত্যুবরণকারী সবার আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বলেন, এই প্রাণঘাতী বৈশি^ক মহামারির হাত থেকে দেশবাসী ও বিশ^বাসী যেন মুক্তি পান। চিকিৎসাধীনরা যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন।
করোনা মোকাবিলায় আরও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য অল্প সময়ের মধ্যে দুই হাজার ডাক্তার ও ছয় হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছি। আরও দুই হাজার চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। আমরা আরও চার হাজার নার্স নিয়োগ দেব। সেই নির্দেশ আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ইতোমধ্যে দিয়েছি। শিগগিরই এই নিয়োগ দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে তিন হাজার টেকনিশিয়ানের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্পূর্ণ সরকারি খরচে হোটেলে থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে থাকা-খাওয়ায় একমাত্র মেডিকেল কলেজের হিসাব অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে বলে বিরোধী দলীয় উপনেতা যেটা বলেছেন, এটাকে স্বাভাবিকভাবেই অস্বাভাবিক মনে হয়। আমরা তদন্ত করে দেখছি, এত অস্বাভাবিক কেন হলো? এখানে কোনো অনিয়ম হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, ‘যন্ত্রপাতি, টেস্ট কিট, সরঞ্জামাদি কেনাসহ চিকিৎসা সুবিধা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে আমরা দ্রæততম সময় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছি। আরও একটি প্রকল্প চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে করোনা মোকাবিলায় আমাদের সামর্থ্য আরও বাড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানার আহŸান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি কীভাবে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া যায়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য বারবার জনগণকে আহŸান জানাচ্ছি। নিজেকে সুরক্ষিত রাখা এবং সেইসঙ্গে অপরকে সুরক্ষা দেওয়াÑ এটা প্রত্যেকের দায়িত্ব। আশা করি সবাই এটা পালন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২০ সালে বৈশি^ক অর্থনীতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে প্রাক্কলন দিয়েছে। করোনার প্রভাবে বিশ^ব্যাপী ১৯ কোটি ৫০ লাখ কর্মীর চাকরি হ্রাস, বৈশি^ক এফডিআই প্রবাহ ৫-১৫ শতাংশ হ্রাস এবং বৈশি^ক রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে আমরা একটি বাজেট প্রণয়ন করেছি। এই বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত কঠিন ও দুরুহ কাজ ছিল। এই বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতদের ধন্যবাদ জানাই।
করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও জীবন জীবিকা রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেট দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সংসদ নেতা বলেন, অনেকে বলছেন বাজেট একটু বেশি, আমরা খুব বেশি আশাবাদী, হ্যানো ত্যানো। সব সময় আমাদের একটা লক্ষ্য থাকতে হবে। কোভিড-১৯-এর জন্য সব কিছু স্থবির। আমরা আশা করি, সবসময় আমরা আশাবাদী যে, না এই অবস্থা থাকবে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে। যদি হঠাৎ উত্তরণ ঘটে আগামীতে আমরা কী করব সেটা চিন্তা করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছি। তিনি বলেন, এরই মধ্যে আমরা প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। এই প্যাকেজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত যখন হবে তখন ১২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ সুবিধা পাবে। এ ছাড়া প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ কর্মসুরক্ষা ও নতুন কর্মসৃজন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ অর্জন করব বলে নির্ধারিণ করেছিলাম। তবে প্রথম আট মাসে আমরা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ অর্জন করেছিলাম। করোনার কারণে সব কিছু বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সেটা কমে যায় এবং সংশোধন করতে বাধ্য হই। যেটা ৫ দশমিক ২ শতাংশ ধার্য্য করেছি। আমরা আশা করি ২০২১ সালে বিশ^ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কোভিড-১৯-এর প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে ধরে নিয়ে আগামী ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময় নিম্ন মূল্যস্থিতি ধরে রাখার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, অনেকে বলছেন বাজেট একটু বেশি, আমরা খুব বেশি আশাবাদী, হ্যানো-ত্যানো। সবসময় আমাদের একটা লক্ষ্য থাকতে হবে। কোভিড-১৯-এর জন্য সব কিছু স্থবির। আমরা আশা করি সবসময় আমরা আশাবাদী যে না এই অবস্থা থাকবে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে। যদি হঠাৎ উত্তরণ ঘটে আগামীতে আমরা কি করব সেটা চিন্তা করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছি।
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক্কলনের যে অনুমানসমূহ বিবেচনা করা হয়েছে তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, (ক) করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আমাদের উৎপাদন ব্যাহত হলেও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি। যা প্রাকৃতি দুর্যোগ বা যুদ্ধের সময় সাধারণত হয়ে থাকে। (খ) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে কর্মসৃজন ও ব্যক্তি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে এবং প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মহামারির পূর্ব অবস্থায় চলে আসবে। (গ) অক্টোবর বা নভেম্বর মাসের মধ্যে করোনাভাইরাস প্রতিষেধক টিকা বাজারে চলে আসলে ইউরোপ-আমেরিকায় জীবনযাত্রা দ্রæত স্বাভাবিক হয়ে যাবে আমাদের রফতানি আয় কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী অবস্থায় আবার ফিরে যাবে। (ঘ) বিশ^বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য খুব কমে গেছে কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা আশাবাদী এর ফলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রবাস আয়ের বর্তমান সঙ্কটও কেটে যাবে।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়গুলো তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, আমরা চারটি কৌশলগত কর্মপন্থা ঠিক করেছি। তা হচ্ছে (ক) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিকরণ, কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেওয়া বিলাসী ব্যয় নিরুসাহিত করা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় পিছিয়ে দেওয়া। (খ) আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ প্রণয়ন। (গ) সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধিকরণ, (ঘ) বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা।
সব বাধা মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে অতীতে আমরা ব্যর্থ হয়নি, ভবিষ্যতেও হব না। সামনে যতই সঙ্কট আসুক, অওয়ামী লীগ সরকার শক্ত হাতে তা মোকাবিলা করবে। যতই বাধা আসুক তা মোকাবিলা করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশের কোনো মানুষকে আমরা অভুক্ত থাকতে দেব না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনরুল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে, এ ব্যাপারে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করেই আমরা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
সাধারণ ছুটির মধ্যে তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাজেট প্রণয়ন করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে এটি দ্বিতীয় বাজেট। আওয়ামী লীগ সরকার এ পর্যন্ত ২০টি বাজেট দিয়েছে। বাজেটে আমরা স্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামাজিক নিরাপত্তা এগুলোতে জোর দিয়েছি। অতীতের মতো এই বাজেটও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]