ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৫ আগস্ট ২০২০ ২০ শ্রাবণ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ৫ আগস্ট ২০২০

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সাময়িক বন্ধ হলেও রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে পাট
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৫.০৭.২০২০ ২:৩৫ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 35

অর্থনীতির সোনালি স্বপ্ন দেখিয়েছে পাট। সোনালি আঁশে সমৃদ্ধ করেছে এই বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরপরই অর্থাৎ ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি)। আর এই বিজেএমসি নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময় পাটকল ছিল ৭০টির বেশি। কিন্তু লোকসানের কারণে পাটকল কমে দাঁড়ায় ২৫টিতে। সেই পাটকল এখনও লোকসান গুনছে। সরকারকে এই লোকসান বহন করতে হচ্ছে। বর্তমানে পুঞ্জীভ‚ত লোকসানের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর কতদিন এই লোকসান গোনা যায়। তাই তো বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে এই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো আপাতত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই পাটকলগুলো আবার হয়তো সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) চালানো হবে। পাটও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও কয়েকটি পাটকল বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। কিন্তু বেসরকারি খাতে যাওয়ার পর অনেকে সরকারের সঙ্গে চুক্তি ঠিক রাখতে পারেনি। শুধু তাই নয়, অনেকে পাটকলে যাবতীয় মেশিনারি ও স্থাপনা সরকারের অজান্তে বিক্রি করে দেয়। যে কারণে সরকার যে চারটি পাটকল বেসরকারি খাতে দিয়েছিল তা আবার ফেরত নেওয়া হয়। এদিকে পাট গবেষক সংশ্লিষষ্টরা বলছেন, সারাবিশ^ এখন
সবুজায়নে জোর দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ২৮টি দেশ পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে ওই দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণে পাটের ব্যাগের চাহিদা সৃষ্টি হবে। পাট বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশে^ বছরে ৫ হাজার কোটি পিস শপিংব্যাগের চাহিদা রয়েছে। ২০২০ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দেড় হাজার কোটি ডলারের শপিংব্যাগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পাটের শৌখিন ও আসবাবসামগ্রী তৈরির কাঁচামাল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বিশ^বাজারে শুধু পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বিলিয়ন পিস। ফলে দেশগুলোতে বছরে বিপুল পরিমাণ পাটের ব্যাগের চাহিদা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ জুট ডাইভারসিফায়েড প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. রামেদুল মুন্না মনে করেন, বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের কারণে পাটের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। পাট দিয়েই বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব, যদি আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের একটি অংশ ধরতে পারি। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে দক্ষ জনবল।
জানা গেছে, ঘরের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস থেকে শুরু করে বিশে^র নামিদামি গাড়ির ভেতরের কাপড়, বডি, কাপড়, বিছানার চাদর, টুপি, ফার্নিচার, শার্ট, প্যান্ট তৈরি হচ্ছে পাট দিয়ে। সম্ভাবনা রয়েছে হোম টেক্সটাইল, হোম ফার্নিশিংবিশেষ পর্দার কাপড়। এ ছাড়া লাইফস্টাইল পণ্য, গিফট তৈরির সম্ভাবনা প্রচুর। এখন তৈরি হচ্ছে পাট পাতার চা। সব মিলিয়ে পাটের সম্ভাবনার দ্বার এখন উজ্জ্বল।
এদিকে, এই প্রথম রফতানি আয়ে পাটের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পাট ও পাটজাতপণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৭৯ কোটি ১৩ লাখ ডলার, যা টাকার অঙ্কের হচ্ছে ৬ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। আর চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি। এ তথ্য রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর। তবে চামড়ার রফতানি আয় কমে যাওয়ার ফলে পাটের অবস্থান দ্বিতীয়তে চলে এসেছে।
এদিকে সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে করোনাভাইরাস বিস্তার কমানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় পাটের রফতানি আয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। একই সঙ্গে পাটের চাষ আরও বাড়ানোর জন্য পাটচাষিদের কীভাবে আরও সহায়তা করা যায় সে বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে পাটশিল্পের সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে পাটের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, পাট কেনাবেচা সহজীকরণ, কাঁচা পাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারের সহাযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
জানা গেছে, চামড়া রফতানি আয় কমে যাওয়ার কারণে পাটের অবস্থান দ্বিতীয়তে উঠে এসেছে। কী কারণে কমে গেছে, এ বিষয়ে ইপিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মূলত বেশ কয়েক মাস ধরে চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজার ভালো যাচ্ছে না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ^জুড়ে করোনাভাইরাসের প্রভাবে অনেক পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। বিদেশি ক্রেতারা এখন স্বাস্থ্য বিষয়ক পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। তবে আসন্ন কোরবানির ঈদে চামড়ার বাজার আরও খারাপ হতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে।
পাট কেন এত ভালো করছে? এ প্রশ্নে পাট অধিদফতরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, পাটখাতের রফতানি আয়ে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে পাটজাত পণ্য। একদিকে এই পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বেড়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা খুব বেশি একটা কমেনি। তবে কাঁচা পাটের অবদান খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। বৈশি^ক কাঁচা পাটের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কাঁচা পাট উৎপাদন ছিল ৭৫ লাখ ৫ হাজার বেল, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এসে দাঁড়ায় ৭৩ লাখ ১৫ হাজার বেলে। একই সঙ্গে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কাঁচা পাটের রফতানির পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ১ হাজার বেল। আর আয় ছিল ৮১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কাঁচা পাট রফতানি হয়েছে ৪ লাখ ৭৫ লাখ বেল। পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পাটজাত পণ্যের রফতানি আয় ছিল ৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২২ কোটি টাকায়। তবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রফতানি আয়ে বাম্পার হয়। অর্থাৎ এই সময় রফতানির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮০১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
চীনের অর্থায়নে এবার সরকারি পাটকল আধুনিকায়নের উদ্যোগ : চীন সরকারের অর্থায়নে এবার সরকারি পাটকল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সংস্কারের ক্ষেত্রে পাটকলের আধুনিকায়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আর আধুনিকায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো, সাশ্রয়ী ব্যয়ে ট্র্যাডিশনাল পাটপণ্য প্রস্তুত ছাড়াও অত্যাধুনিক মেশিনে নতুন প্রযুক্তিতে পাট থেকে বহুমুখী পণ্য তৈরি করা। এর মধ্যে রয়েছেÑ দামি গাড়ির ড্যাশবোর্ড, জানালা ও দরজার পর্দা, আসবাবপত্রের ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী, ওয়ালম্যাট, ঘর সাজানোর সামগ্রী, লিলেন ক্লথ, জুট জিও টেক্সটাইল, গাড়ির সিট কভার ইত্যাদি। পাশাপাশি পাট থেকে তুলা বা অন্যান্য কৃত্রিম তন্তুর মতো উন্নতমানের সুতা তৈরি করা, যা দিয়ে রেডিমেট গার্মেন্টসে ব্যবহার করা যাবে। আধুনিকায়নের জন্য চীনের একটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, যা ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গত ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পাটকলগুলোর পুরনো মেশিন বাদ দিয়ে আধুনিক মেশিন বসানো। এমনকি বন্ধ ও পরিত্যক্ত পাটকলগুলো চীনের সহযোগিতায় চালু করা যায় কি না সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন। বিজেএমসি প্রতিষ্ঠার সময় জাতীয়করণ করা পাটকলের সংখ্যা ছিল ৭৬টি। বর্তমানে এর সংখ্যা ২৬টি। এসব পাটকলের যন্ত্রপাতি ৬০-৭০ বছরের পুরনো। ফলে এসব পাটকলে উৎপাদনের পরিমাণও কমে এসেছে। তাই আধুনিকায়নের বিষয়টি এখন জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, পাট ও পাটজাতপণ্য পরিবেশবান্ধব হওয়ার ফলে এখন বিশ^ব্যাপী বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাট শিল্পগুলো বিএমআরই করা হলে পরিবেশ যেমন উন্নত হবে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। পাটচাষিরাও তাদের ন্যায্যমূল্য পাবেন।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]