ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৫ আগস্ট ২০২০ ২০ শ্রাবণ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ৫ আগস্ট ২০২০

বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণা থেমে নেই
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: রোববার, ৫ জুলাই, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৫.০৭.২০২০ ২:০৭ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

বিদেশি নাগরিকরা অপরাধ কর্মকাÐে জড়িয়ে পড়ছে। করোনাতেও তারা থেমে নেই। একের পর এক প্রতারণা করেই যাচ্ছে তারা। তবে এসব অপরাধ করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ধরাও পড়ছে সেই চক্রের সদস্যরা। এসব প্রতারক চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশ ছাত্র, চিকিৎসক ও খেলোয়ার ভিসায় দেশে প্রবেশ করেই প্রতারণা শুরু করছে। এমনই প্রতারক চক্রের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ধরাও পড়ছে। এইত গেল সপ্তাহে এক বাংলাদেশিকে আমেরিকায় নিয়ে সে দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এ ঘটনায় তিন নাইজেরিয়ানকে প্রতারণা অভিযোগ গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আর এমন প্রতারণা ঘটনা প্রতি মাসেই কম বেশি ঘটছে। আর এসব চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে এসব কর্মকাÐ করছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিদেশি এই নাগরিকদের প্রতারণা মূলত বেশি ধরা পড়তে শুরু ২০১৩ সালের পর থেকে। এ অবধি কয়েক শতাধিক নাগরিক শুধু প্রতারণা দায়েই গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগেই সাজাও হয়েছে। অনেকে কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। তবে বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণা তালিকায় বেশি জড়িয়ে পড়ছে নাইজেরিয়ান, আলবেনিয়ান ও আফ্রিকান নাগরিকরা। তারা বাংলাদেশে ছাত্র ভিসা নিয়ে এসেই এসব অপরাধ কর্মকাÐ করছে। কখনো ডলারের ব্যবসা আবার কখনো উন্নত দেশে চাকরির প্রলোভন এবং উপহার দেয়ার নাম করে খরচাবাবদ টাকাও তারা হাতিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ এখন বুথ থেকে টাকা জালিয়াতি, নকল টাকা তৈরি, মাদক বিক্রি ও ক্যাসিনোর মতো কর্মকাÐেও বারবার আসছে বিভিন্ন দেশের বিদেশি নাগরিকদের নাম। যাদের কেউ কেউ অবস্থা আঁচ করতে পেরে গাঁও ঢাকা দিয়েছে।
নীলফামারীর শাহজাহান। চাকরি করেন উত্তরা ইপিজেডের একটি কারখানায়। গত এক সপ্তাহ আগে তার ফোনে হঠাৎ একটি মেসেস আসে। তাতে লেখা ছিল, লটারিতে আপনার মোবাইল নাম্বারটি উঠেছে। আর আপনি ৪৫ হাজার পাউন্ড বিজয়ী  হয়েছেন। এজন্য আপনার মেইল ঠিকানাটি মেসেস করে পাঠাতে হবে। সরল মনে বিশ^াস করে যুবক শাহজাহানও সেই নাম্বারে ফিরতে পাঠায়। কিন্তু আবারও একদিন পর তার কাছে আরেকটি মেসেস আসে। সেটিতে তাকে একটি ফরম পূরণ করে তাদের কাছে পাঠাতে বলা হয়। এরপরই তার মনে খটকা লাগে। শাহজাহান হয়তো তার ভুলটি বুঝতে পেরে সাবধান হয়েছেন আর পা বাড়াননি। শাহজাহানের মতই যুবক-যুবতীদের টার্গেট করে প্রতারণ চক্র এসব করছে। বিভিন্ন সময়ে দেশের অনেক মানুষই এ প্রতারকচক্রের খপ্পড়ে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন এমন নজিরও রয়েছে। শুধু গ্রামের সহজ সরল শাহজাহান নয়, শহরে বাস করা শিক্ষিত মানুষরাও এই প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ছেন।
২০১৭ সালের ২৮ জুলাই প্রতারণা অভিযোগ দুই নাইজেরিয়ানসহ সাত নাগরিককে গ্রেফতার করেছিল ডিবি। তখন ডিবি জানিয়েছিল, তারা সুকৌশলে বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং বিনিয়োগসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অনেকদিন ধরেই প্রতারণা চালিয়ে আসছে। প্রতারকরা ১২টি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা এসব অর্থ বিদেশে পাচার করছে। কিছু বাংলাদেশি অসাধু নাগরিক এ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এ ছাড়াও ২০১৬ সালের আগস্টের শুরু দিকে জাতিসংঘের চিকিৎসক পরিচয়ে রাজধানীর এক নারীর সঙ্গে ফেসবুকে সম্পর্ক গড়ে তোলেন লেবানন থেকে নাসির উদ্দিন নামে এক বাংলাদেশি। তার সঙ্গে ছিল আরও দুই নাইজেরিয়ান। তারা মিলে বাংলাদেশে ক্লিনিক স্থাপনের কথা বলে ওই নারীর কাছ থেকে ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে সেই চক্রের ৫ জনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারের পর আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে। তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশিদের যোগসাজশে দুই নাইজেরিয়ান দেশে বসেই এসব প্রতারণা করেছেন। একই বছরের এপ্রিলে ডেফোডিল বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে আসা চার শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার, পদক বা লটারি পাওয়ার কথা বলে ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ গ্রেফতার করেছিল পিবিআই। ডিবি বলছে, বিদেশি পার্সেলের নাম করে প্রতারক চক্রের সদস্যরা প্রতি মাসেই কম বেশি অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তবে বেশিরভাগ ঘটনাতে থানায় মামলা বা অভিযোগ না আসায় ধামাচাপা পড়ছে। এ ছাড়াও কোকাকোলা লটারি, ইউনাইটেড ন্যাশন্স পুরস্কার, আইসিসি টুর্নামেন্ট পুরস্কার, ইউএনডিপি পুরস্কার প্রাপ্তিসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ পুরস্কারের বার্তা পাঠায়। সেখানে ইমেইল ঠিকানাও দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রতারণা করে আসছে। তবে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা অভিযোগ এসব চক্রকে দ্রæত আইনের আওতায় আনা সম্ভব।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একটি বিভাগের এক পরিচালক বলেন, উত্তরা ও গুলশান এলাকায় ছাত্র, চিকিৎসক ও খেলোয়ার পরিচয়ের আড়ালে বিদেশি নাগরিকরা মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝে তাদের গ্রেফতারও করি। কিন্তু আবারও তারা জেল থেকে বেরিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। একমাত্র সব বাহিনীর সমন্বিত চেষ্টায় পারে তাদের অপরাধগুলো বন্ধ করতে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, প্রতি ছয় থেকে আট মাস অন্তর অন্তর এসব বিদেশি নাগরিক ধরা পড়ছে। তবে তাদের কোনো সদস্য আটক হলেও তারা গা ঢাকা দেয়। তারপর কিছুদিন বন্ধ থাকে এসব অপরাধ। আবারও জড়িয়ে পড়ে। তবে সব বিদেশি নাগরিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে না। বিশেষ করে কয়েকটি দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উচ্চ হারে আসছে। এসব নাগরিক দেশে নামকাওয়াস্তে কোন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। তারপর উত্তরা, ভাটানা, বারিধারা, বাড্ডা ও ধানমন্ডি এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে সেই সঙ্গে বাংলাদেশি লোকদের সঙ্গে নিয়ে প্রতারণা করছে।
গুলশান জোনের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী সময়ের আলোকে বলেন, সম্প্রতি আমরা নাইজেরিয়ান, আফ্রিকান ও আলজেরিয়ান নাগরিকের ব্যাপারে নানা অপরাধ কর্মকাÐের অভিযোগ পাচ্ছি। অভিযোগ পাওয়ার পরই আমরা সেটি সেই দেশের দূতাবাস সংশ্লিষ্টকে অবহিত করছি। ছোট অপরাধ হলে তারাই ব্যবস্থা নিচ্ছে আর বড় অপরাধ হলে তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি ডলার ক্রস ও উপহার দেওয়ার নাম করে তারা এসব প্রতারণা করছে। আমরা সেই চক্রের সদস্যদের চিহিৃত করতে পেরেছি। তাদের তালিকায়ও আমাদের কাছে রয়েছে।
উত্তরা জোনের ডিসি নাবিদ কামাল শৈবাল সময়ের আলোকে বলেন, গত মাসের একটি প্রতারণা অভিযোগ এসেছিল। তবে আগের মত এই এলাকায় তারা সক্রিয় নয়। তারপরও আমরা তাদের নজরদারিতে রেখেছি। কোন ধরনের অভিযোগ পেলে দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সমাজ ও অপরাধ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, যেসব দেশের নাগরিক আমাদের দেশে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তাদের একটি ডাটাবেজ থাকবে। অন্য দেশ থেকে যারা আসবে তারা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়া। আসলে তারা পড়াশুনার আড়ালে কি করছে তা দেখভাল করা উচিত। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতি তিন মাস পরপর আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি রিপোর্ট জমা দিতে পারে। আর কোন বিদেশী শিক্ষার্থী পড়তে আসলে সে যেই এলাকায় থাকবে সেখানকার বাংলাদেশী নাগরিকদের বিষয়টি অবগত করা যাতে তারআচার আচরণ পযবেক্ষণ করতে পারে। আচরণে কোন অসংগতি পরিলক্ষিত হলে নিটকস্থ থানায় তা জানানো। তিনি আরো বলেন, ভিসার দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব দেশের নাগরিকরা অপরাধ কর্মকাÐে জড়িয়ে পড়ছে তাদের ব্যাপারে খুবই সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের ভিসা দেওয়ার আগে অবশ্যই ভাইভার ব্যবস্থা করতে হবে। ভাইভায় যদি নেতিবাচক কিছু মনে হয় তবে তাকে ভিসা না দেওয়া। নতুন করে যাতে তারা কোনো অপরাধ করতে না পারে সে বিষয়টির প্রতি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবশ্যই নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের (মিডিয়া) এআইজি সোহেল রানা সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিদের তালিকা সবসময় চলমান প্রক্রিয়ায় হালনাগাদ করা হয়, হচ্ছে। ভিসা আইন ভঙ্গকারীদের বিষয়ে কালো তালিকাভুক্তিসহ নানাবিধ আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। অবৈধভাবেভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের চলমান আইনি প্রক্রিয়া, দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভিসা কর্তৃপক্ষসহ সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে বিদেশি নাগরিকদের দ্বারা প্রতারণার বিষয়ে আমাদের সম্মানিত নাগরিকের আরও বেশি সচেতন হতে হবে।














সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]