ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০ ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০

ঝুঁকিতেই ‘ভবিষ্যৎ সুরক্ষা’ দেখছেন স্বেচ্ছাসেবী টেকনোলজিস্টরা
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৭.০৭.২০২০ ২:৪৩ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 431

তীব্র জনবল সঙ্কটের কারণে প্রথম দিকে করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা কোভিড-১৯ সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা সংগ্রহসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করেন। কিন্তু গেল প্রায় ১২ বছর ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ বন্ধ থাকার কারণে দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংখ্যা একেবারে অপ্রতুল ছিল। আর এ কারণে রোজ গোটা দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা হাজারের নিচে ছিল। এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত না থেকেও করোনা মোকাবিলায় শামিল হন দেশের কয়েকশ’ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট।
কোভিড সংক্রমণের পর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে দেশের প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় কাজ করছেন এই মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। দিন দিন এ সংখ্যা বেড়েছে, যারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন করোনা যুদ্ধে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী সদস্যও ফ্রন্টলাইনে আছেন, যারা রোগীর ঘরে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছেন।
বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সারা দেশে পাঁচ শতাধিক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১৫, কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় ও মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে ১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আট, লক্ষ্মীপুরে সাত, ভোলায় নয়, পটুয়াখালীতে ১০, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব রেফারেল ল্যাবরেটরিতে ৩০ ও আইইডিসিআরে ৩০, ঢাকায় ২০, রংপুর বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ে (স্বাস্থ্য) নয়, সিভিল সার্জন কার্যালয় গাইবান্ধায় ১০ ও যশোরে আটজনসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে করোনা নিয়ন্ত্রণে বিনাপারিশ্রমিকে কাজ করছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা।
করোনার শুরু থেকে উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় বাড়ি বাড়ি করোনার নমুনা সংগ্রহের কাজ করছেন হানিফা তুজ জাহান দম্পতি। স্বামী ফিরোজ খান বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদ গাইবান্ধা জেলার সভাপতি। স্বামী-স্ত্রী উভয়ই ঝুঁকি নিয়ে করোনায় আক্রান্তদের সেবা দিচ্ছেন। ফিরোজ খান বলেন, আমরা শুধু আমাদের নিজের জেলাকে করোনামুক্ত রাখতে নিরেট স্বেচ্ছায় কাজ করছি। কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পাইনি। ১৬ কিলোমিটার পথ নিজের পকেটের ভাড়া দিয়ে সিভিল সার্জনের অফিসে গিয়ে কাজ করছি। দুপুরের খাবারটাও নিজের গাঁটের টাকায় খাচ্ছি। প্রথম দিকে বাড়িওয়ালা ও আশপাশের লোকরা ঝামেলা করেছে নানাভাবে। হানিফা তুজ জাহান বলেন, শ^শুর ও স্বামীর বাড়ির নানা তির্যক ব্যঙ্গ কথা শুনেও কাজ থেকে সরে যাইনি। গ্রামের অনেকে বলেছেন, করোনায় কাজ করলে আমার সন্তানও করোনা হতে পারে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ভোলা জেনারেল হাসপাতালে স্বেচ্ছায় কাজ করছেন নয়জন টেকনোলজিস্ট। মো. হাসাবুল হাসান ও ইশরাত জাহান ইফা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন এপ্রিল থেকে। মাঠ পর্যায়ের কাজ করেও সরকারি নিয়োগের আওতায় আসতে পারেননি তারা। করোনা প্রাদুর্ভাবের পর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবক টেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশে বুথে এবং বাড়ি বাড়ি নমুনা সংগ্রহের কাজ করছেন তিনিসহ আটজন স্বেচ্ছাসেবক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামনের সারিতে কাজ করেও কোনো ধরনের ঝুঁকিভাতা কিংবা আর্থিক সহায়তা বাইরে তারা। করোনার ঝুঁকি যাতে তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা দেয় সেই প্রত্যাশা সবার। ফ্রন্টলাইনার হিসেবে সরকারের সুদৃষ্টি চান দিনের পর দিন পরিবার থেকে আলাদা থাকা মাহমুদুল হাসান।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) হিসেবে সাভারের সুপার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তানজিলা হুসাইন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারে কোভিটের কাজ শুরু করি। ঘরে সন্তান রেখে এই ঝুঁঁকিপূর্ণ কাজ করছি। বাইরে থেকে জমা হওয়া নমুনা ল্যাবে পরীক্ষা করি। আমিসহ আরও কয়েকজন নারী যোদ্ধা আছে। যারা আমার সঙ্গে কাজ করছেন। আমাদের মধ্যে অনেকেই করোনা পজিটিভ হওয়ার পর সুস্থ হয়ে আবারও কাজে যোগদান করেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার করোনার নমুনা নিয়ে ২৪ ঘণ্টা পিসিআর মেশিনে কাজ করছি।
ল্যাবের কাজগুলো তাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে এই নারী টেকনোলজিস্ট বলেন, নমুনা প্রসেসিং থেকে শুরু করে সঠিক পরিমাণে প্রিপেটিংয়ের মাধ্যমে রিলিজ রিএজেন্ট দেওয়া ও একটেনশন করা অর্থাৎ নমুনার মুখ খুলে সঠিক পরিমাণে নমুনা নিয়ে রিএজেন্টের সঙ্গে মিশ্রিত করা। এরপর পিসিআর মেশিনে নমুনা নিয়ে আরেকটি রিএজেন্টের সঙ্গে মিশিয়ে মেসিনে রান করাতে হয়। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নমুনার মুখ খোলা ও অপরিষ্কার থাকে। এগুলো প্রসেসিং করার সময় খুব বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তারপরও কাজ করে যাচ্ছি। ঝুঁকিযুক্ত পরিশ্রমের মূল্যায়ন চাই। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পিসিআর ল্যাবে কাজ করছেন টেকনোলজিস্ট ওয়ালীউল্লাহ। এর আগে করোর নমুনা সংগ্রহের কাজ করেন কিশোরগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জনের অফিস থেকে। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ১৮৩ জনের নিয়োগ তালিকায় নাম না থাকায় হতাশ তিনি। এই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বলেন, সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করার যোগ্যতা রাখা হয়েছে যারা মেডিকেল টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা পাস করেছে তাদের জন্য। কিন্তু আমরা যারা উচ্চতর ডিগ্রি হিসেবে মেডিকেল টেকনোলজিতে বিএসসি করেছি, তাদের আবেদনের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। করোনার শুরু থেকেই আমাদের প্রায় ৪০ জনেরও বেশি সরাসরি বিএসসি করা মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা স্বেচ্ছাশ্রমে দেশের বিভিন্ন কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানে পিসিআর টেস্ট এবং নমুনা সংগ্রহের কাজ করে আসছে। আবেদনের সুযোগ না পেলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পরিষদের (বিএমটিপি) সাধারণ সম্পাদক মো. আশিকুর রহমান বলেন, মহামারিকালে দেশের সাধারণ মানুষের কথা ভেবে, সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য বিএমটিপির মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা স্বেচ্ছাসেবক হয়ে ঝুঁকি ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন। আগে যেখানে ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হতো ১-২ হাজার, এখন স্বেচ্ছাসেবীদের কারণে হচ্ছে ১৫-১৬ হাজার। মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ১২ বছর টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ বন্ধ থাকায় দেশের অধিকাংশ টেকনোলজিস্টের বয়স চলে গেছে। এখন আমরা স্বেচ্ছাসেবী মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সরকারি নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। যশোর জেলা সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন সময়ের আলোকে বলেন, আমার এখানে আটজন টেকনোলজিস্ট স্বেচ্ছায় কাজ করছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে তাদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। তারা এখনও কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। আমি চাই এই সম্মুখযোদ্ধারা সরকারি নিয়োগের আওতায় আসুক। কেননা তারা এই ক্রান্তিলগ্নে স্বেচ্ছায় শ্রম দিচ্ছেন। করোনাভাইরাস ঠেকাতে লড়াই করছেন।
এদিকে করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমে জনবল বাড়াতে বিশেষ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির নির্দেশে প্রায় দেড়শ’ মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বাস্থ্যখাতে ডাক্তার-নার্সদের পাশাপাশি ১২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২৫ জুন সেই ১২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বণ্টন তালিকা প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (কন্ট্রোল রুম) ডা. আয়েশা আক্তার সময়ের আলোকে জানান, যারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তাদের সরকার ঝুঁকিভাতা দিচ্ছে। আর কিছুদিন আগে ১৮৩ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে সরকারিভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে। কোভিড যুদ্ধে যারা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, তাদের খুব শিগগিরই সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে। যারা কাজ করছেন, সবাইকেই ক্রমান্বয়ে সরকারিভাবে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক (স্বাস্থ্য) মো. শাহীন ইমরান বলেন, আমার পক্ষে বলা ঠিক হবে না। মন্ত্রণালয় এখানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। স্বেচ্ছায় সেবা দেওয়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়ে সরকারের ভাবনা কী, জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব জাকির হোসেন সময়ের আলোকে জানান, শনিবার এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি মিটিং হয়েছে। কতজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন এবং কেন টেকনোলজিস্টরা বিক্ষোভ করছেনÑ এসব তথ্য জানার চেষ্টা হয়েছে। আর আমি দায়িত্বে একেবারে নতুন, চূড়ান্ত কিছু এখনই আমার পক্ষে বলা সম্ভব হচ্ছে না। আর কিছুদিন আগে বদলি হয়ে যাওয়ায় মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও মিডিয়ার ফোকাল পয়েন্ট হাবিবুর রহমান খান এ বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]