ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ৫ আগস্ট ২০২০ ২০ শ্রাবণ ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ৫ আগস্ট ২০২০

রাজধানীতে এলাকাভিত্তিক লকডাউন করে করোনা প্রকোপ কমানো যাবে না
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০, ১২:০০ এএম আপডেট: ১৩.০৭.২০২০ ১:৫২ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 39

দীর্ঘ ২১ দিন লকডাউন ছিল রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার। লকডাউন পরবর্তী ‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফেরা মানুষের এতে কতটুকু লাভ হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে মতভেদ। আইইডিসিআর সূত্র বলছে, লকডাউনের শেষ দিনেও ১৮টি নমুনার মধ্যে ১১টি পজিটিভ এসেছে। লকডাউনের পর এখন অবাধ যাতায়াতে আবারও আগের মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পূর্ব রাজাবাজার এলাকায়। ঠিক একইভাবে করোনা সংক্রমণ রোধে ওয়ারী লকডাউন করা হলেও কমছে না আক্রান্তের সংখ্যা। গত সাত দিনে সেখানে ৫১ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন। ওয়ারীর কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, লকডাউন শুরুর দিন ৪ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত নমুনা দিয়েছেন ১২০ জন। এর মধ্যে ৫১ জনের রিপোর্ট পজিটিভ। পুরো ঢাকা শহর খোলা রেখে বিচ্ছিন্নভাবে এক বা দুটি এলাকা লকডাউন নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীদের মধ্যেও। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, তারা শুরু থেকেই বলে আসছেন এলাকাভিত্তিক লকডাউন করে করোনা প্রকোপ কমানো যাবে না। কারণ লকডাউন তুলে নেওয়ার পর আক্রান্তের সংখ্যাগত জায়গায় আবারও আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে শতভাগ।
পূর্ব রাজাবাজারের একাধিক বাসিন্দা জানান, লকডাউন উঠে যাওয়ার পর সেই আগের মতোই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে। এলাকার প্রধান সড়কে মানুষের অবাধ চলাচলের পাশাপাশি দোকানপাটও সব খোলা। এলাকার বেশিরভাগ জায়গায় লোকজনকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, যে কয়দিন লকডাউন ছিল, ঠিক সেই কয়দিন কড়াকড়ি দেখা গেছে। এখন কেউ আসেও না, কোনো কিছু দেখেও না। দোকানপাটে কোনো স্বাস্থ্যবিধি নেই। এলাকার যুবকরা রাস্তায় আড্ডা দিচ্ছে। কাউন্সিলর অফিস থেকেও কোনো তদারকি করা হচ্ছে না।
পূর্ব রাজাবাজারকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে পরীক্ষামূলক লকডাউন কার্যকর করার ঘোষণা করা হয় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে। আইইডিসিআরের হিসাব অনুযায়ী, সে সময় পূর্ব রাজাবাজারে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছিল ৩৯ জন। আর তিন সপ্তাহ পর লকডাউন শেষ হওয়ার আগে ২৭ জুনের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব রাজাবাজারে কোভিড-১৯ রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ জনে, অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। রাজাবাজারে কঠোর লকডাউনের পরেও সংক্রমণ কেন থামানো যায়নি, ভালোভাবে সেটা স্টাডি হওয়া জরুরি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারাও। তারা জানান, রাজাবাজারে লকডাউনের শেষ দিনে ১৮ জনের মধ্যে ১১ জন করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু লকডাউনের ভেতরে কী করে ১৮ জনের ভেতরে ১১ জন পজিটিভ হলেন, সেটা নিয়েও এখন জরুরিভিত্তিতে কাজ করা দরকার। তাহলে কি এলাকাভিত্তিক লকডাউন আদৌ কোনো কাজে আসছে না এমন প্রশ্ন উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও প্রিভেনটিভ মেডিসিনের চিকিৎসক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বারবারই আমরা বলেছি, এভাবে লকডাউন দিয়ে এলাকাকে লাল থেকে হলুদ জোনে এনে ফল পাওয়া যাবে না। কারণ, বাইরেরটা খোলা এবং ২২তম দিনে বাইরের সঙ্গে যখন লকডাউন এলাকার মানুষের মিথস্ক্রিয়া ঘটবে, তখন সেই আগের পরিস্থিতিই তৈরি হবে। তাহলে এধরনের লকডাউনে লাভটা কী। যখন কিনা পরীক্ষামূলক লকডাউন করছি কোন জায়গায়, সেটা কতটা সফল হলো, সেই তথ্যটাও কিন্তু মানুষকে জানাতে হবে।
লকডাউন করে রোগ না নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে দেশ আরও ভয়াবহ বিপদে পড়বে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, আগে বাঁচতে হবে। করোনা নিয়ন্ত্রণ না হলে অর্থনীতিও সবল হবে না। শুধু দেশের না আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অধ্যাপক হামিদ বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে আঞ্চলিক লকডাউন নয়। চিহ্নিত এলাকাগুলোতে একযোগে লকডাউন করতে হবে তা না হলে ভাল ফল পাওয়া যাবে না।
তবে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মোশতাক হোসেন মনে করেন এলাকাভিত্তিক লকডাউন খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। শহরের শুধূমাত্র একটি এলাকা ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত না করে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে লকডাউন দিলে সুফল আরও দ্রুত পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে করোনা সংক্রমণ রোধে ওয়ারী লকডাউন করা হলেও কমছে না আক্রান্তের সংখ্যা। গত সাত দিনে সেখানে ৫১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবকদের দাবি ওয়ারী থেকে এখনও মানুষের বের হওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ওই এলাকায় বসবাসরত ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা নানা উপায়ে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন। কখনও সহযোগিতা নিচ্ছেন এলাকার বড় ভাইদের। আবার কখনও ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। ওয়ারীর লকডাউন এলাকা থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হট কেক গলিতে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ সদস্যরা। গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ওই গেট দিয়ে ৭৪ জন মানুষ বের হয়েছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই ডাক্তার ও রোগী। ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার যারা জটলা করেছেন বের হওয়ার জন্য, তাদের বুঝিয়ে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। আর বারবার মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে, কেউ যেন আউট গেটে ভিড় না করেন।
লকডাউন শুরু থেকেই ওয়ারী এলাকায় ২০০ জন স্বেচ্ছাসেবক তিন শিফটে ভাগ হয়ে কাজ করছেন। চেষ্টা করে যাচ্ছেন এলাকাবাসীকে সহযোগিতা করতে। এলাকাবাসী যখন যেভাবে চাচ্ছে সেভাবেই সাড়া দিচ্ছেন তারা। তাদের কাজে এলাকাবাসীও সন্তুষ্ট। তারা বলছেন, স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। তারা সবসময়ই আমাদের সহযোগিতা করছে। কিন্তু যত সমস্যা রয়েছে বাইরে বের হওয়া নিয়ে। স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা আফরোজা হাসান বলেন, স্বেচ্ছাসেবকরা খুব দ্রুত রেসপন্স করেন। যখন যেভাবে চেয়েছি তাদের সাহায্য পেয়েছি। তাদের নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। আক্ষেপ শুধু বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নেই।
পূর্ব রাজাবাজারে এলাকাভিত্তিক লকডাউনে সুফল পাওয়ার পর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী এখন ওয়ারীতে লকডাউন চলছে জানিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, সব রেড জোনে একসঙ্গে বিধিনিষেধ দেওয়া যাবে না। যে জায়গায় বেশি সংক্রমণ, সে জায়গা আগে অবরুদ্ধ করা হবে। কারণ ইকোনমি চালু রাখতে হবে, এটা আমাদের স্ট্রাটেজি। পাশাপাশি ছোট ছোট করে এলাকাভিত্তিক সামর্থ্য অনুযায়ী অবরুদ্ধ করা হবে, যাতে নরমাল লাইফ বাধাগ্রস্ত না হয়। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো এলাকায় কতজন আক্রান্ত, সেটার ম্যাপিং আমাদের কাছে আছে। আশপাশের কতটা বাড়িতে কতজন আক্রান্ত সে তথ্য আছে। তাই ঢাকায় সব এলাকায় একসঙ্গে লকডাউন দিয়ে অযথা মানুষকে শুধু আটকে রাখা হচ্ছে না।







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]