ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ৮ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ধ্বংসযজ্ঞ আর কত?
এফ এম শাহীন
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২০, ১২:২৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 274

‘অর্ধশত বছরের পুরনো সংগীত ভবনে ভাঙচুর’ শিরোনামে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন এ প্রকাশিত খবরটি দেখে খুব বেশি বিস্মিত হয়নি! সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা একটার পর একটা ঘটেই চলেছে। কারা করছে কেন করছে সেই বিষয় সবার জানা। 

কোন অপশক্তি বাঙালির সংস্কৃতির উপর বারবার আঘাত হেনেছে অজানা নয়। ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ প্রিয়দারঞ্জন ও বনবীথি সেনগুপ্তের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সংগীত ভবন’। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সংগীত চর্চার প্রতিষ্ঠান প্রবর্তক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। অর্ধশত বছরের পুরনো সংগীত ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে হারমোনিয়াম, তবলা, আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং ভবনের আশপাশ এলাকায় তাণ্ডব চালায় ।

আমরা জেনেছি এই প্রতিষ্ঠানটি শাস্ত্রীয় সংগীতের জন্য বিখ্যাত। এ প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক গুণী শিল্পী বের হয়েছেন। ভবনের প্রতিষ্ঠাতা প্রিয়দারঞ্জন সেনগুপ্তের ছেলে বিভাষ সেনগুপ্ত বলেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তরা ৫৪ বছরের পুরোনো সংগীত ভবনটি ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ৪০-৫০ জনের একটি দল হাতে দা, লাঠি, খুন্তি নিয়ে হামলা চালায়। এতে আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। কি নির্মম ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে কেনা স্বাধীনদেশে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে আর আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি! লোক দেখানো প্রতিবাদ করে আবার চুপ হয়ে যাচ্ছি।

সম্প্রতি দেখেছি করোনা মহামারীকালেও সুনামগঞ্জ এর দিরাইয়ে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দেয়া আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে বাউল রণেশ ঠাকুরের ঘর, গান ও ৪০ বছরের সংগ্রহের নানা বাদ্যযন্ত্র। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল উজানধল গ্রামে নিজ বাড়িতে থেকে সঙ্গীত চর্চা করতেন বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের অন্যতম এই শিষ্য। কি কারণে কোন অপরাধে তাঁর ৪০ বছরের সাধনার গানের খাতা পুড়িয়ে ছাই করলো তা জানা নাই এই বাউলের । তাই পুড়িয়ে দেওয়ার দুই দিন পর কেঁদে কেঁদে লিখে গাইলেন এই গান-

“আমার ৪ দশকের বাদ্যযন্ত্র গানের খাতা-নথিপত্র পুড়াইয়া করেছে ছাই
মনের দুঃখ কার কাছে জানাই?
ও ভাই গো ভাই আমার দোষ কি শুধু গান গাওয়া
না ভাটির দেশে উজান বাওয়া?
কোন দোষেতে শাস্তি পাইলাম একবার শুধু জানবার চাই?
চোখের সামনে এহেন কান্ড আমার ঘরবাড়ি হয় লন্ডভন্ড
আসমান তলে হইল ঠাঁই মনের দুঃখ কার কাছে জানাই।
ও ভাই লো ভাই
গুরু আমার আব্দুল করিম বলেছিলেন গানে গানে
মানুষ ভজো পরম খোঁজ সুরেই তারে কাছে আনে।
আজকে তারে স্মরণ করি গানের কথা খুঁইজা মরি!
মুখে কোন ভাষা নাই।
ও ভাই গো ভাই মনের দুঃখ কার কাছে জানাই।”

এই বাউলের কথার উত্তর কি জানা আছে রাষ্ট্রের। বাঙালি সংস্কৃতির একজন বাহক বাউল সাধকের কান্নার রঙ কি তাদের ছুঁয়েছে কোন কালে। অসাম্প্রদায়িক সমাজ, রাষ্ট্র বিনির্মাণে জাতির পিতার আজীবন সংগ্রামকে আমাদের নীতিনির্ধারকগণ ধারণ করতে পারছেন। ক্ষমরার মোহে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সাথে আপোষ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতাও করতে দেখছি নানা ভাবে। সকল জাতি, বর্ণ, ধর্মের মানুষের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশকে আজ কোথায় নিয়ে যাচ্ছি আমরা?

আমরা জানি বাঙালি সংস্কৃতিকে কারা রুদ্ধ করতে চায়। কারা পাকিস্তানী ভাবধারায় জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে মরিয়া। কারা ধর্মীয় আইনে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দূরেঠেলে কিংবা পাশ কাটিয়ে আজ তাদের বিছানো জালে একে একে বন্দী করছি শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের দর্শন। দিনেদিনে সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য এক অনিরাপদ সমাজ নির্মাণে এগিয়ে চলেছি।

ইতিহাসের দিকেও ফিরে তাকালে দেখবো কট্টর মৌলবাদিরা চিরকালই উদারনৈতিক সুফি মতবাদের বিরুদ্ধে। সাধক লালন শাহকেও জীবিত থাকাকালীন মৌলবাদিদের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল। অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে শাহ আবদুল করিমকেও। বাউল শিল্পী শরিয়ত বয়াতীকে জেলে যেতে হয়েছে, রীতা দেওয়ানকে হেনস্থা করা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতি জাদুঘরও পুড়িয়ে ছাই করেছিল কারা তা স্পষ্ট হয়েছে সবার কাছে। কারা সেদিন ঢাকার অদূরে লালন শাহের ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলেছিল। তারাই যুগে যুগে আমার বাংলা ভাষাকে, বাংলা সংস্কৃতিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য ধর্মের মুখোশ পরে মাঠে নেমেছে। তারা কখনো বাউল, কখনো শহীদ মিনার, কখনো যুক্তিবাদী, লেখক, গণজাগরণের কর্মী, বুদ্ধিজীবী আবার কখনো স্রেফ মূর্তি বা ভাস্কর্যের উপরে নির্মমভাবে হামলা করেছে বারবার ।

মনে পড়ে ৫-ই মে এর সেই ভয়াল দিনের কথা। ঢাকার বুকে একে দিল ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ক্ষত চিহ্ন। ২০১৩ সালের এই দিনে রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থান নিয়ে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-হেফাজতে ইসলাম। ধর্মের নামে এত জঘন্য ভয়াবহ তাণ্ডব, মানুষ খুন, বাঙালি জাতি আর কখনো দেখেনি! বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ভিতরে আগুন দিল, মুসলিমদের হাজার হাজার পবিত্র গ্রন্থ কোরআন পুড়িয়ে দিল। মতিঝিল শাপলা চত্বর হয়ে উঠলো রণক্ষেত্র। আর বাংলাদেশকে তালেবান রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্নে এতদিন যারা বিভোর ছিল, তারা সেদিন আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল !

সেদিন সকাল থেকে আমাদের জাগরণ যোদ্ধারা শাহবাগে জড় হতে থাকে। যদিও অনেক চেনা মুখ সেদিন ভয়ে এইদিকে আসতে সাহস পাননি। আমাদের অনেকের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছিল একটি খবর পেয়ে যে, হেফাজত-জামায়াত শাহবাগে আক্রমণ করবে। প্রতিরোধ করার মত আমাদের কোন প্রস্তুতি নেই। কিছু গজারি ও বাঁশের লাঠি যোগাড় করা হয়েছিল কিন্তু এই ভয়ানক উগ্র জঙ্গি গোষ্ঠীকে তা দিয়ে মোকাবেলা করা মুশকিল। বিকেল গড়াতে শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের দিকে তারা রওনা হল বিশাল এক জমায়েত নিয়ে। কিন্তু যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ২৬ মার্চের পর থেকে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচী না আসলেও ঐ দিন সবার আগে তারাই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নেতৃত্বে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ মৎস ভবনের সামনে প্রতিরোধের গড়ে তুললে খুব বেশি জামায়াত-হেফাজত এর উগ্র জঙ্গিরা শাহবাগে আক্রমণ করতে পারেনি।

আজ অনেকের কাছে অনেক বড় অপরাধী মনে হলেও এই স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-হেফাজত নামক উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়ে প্রতিহত করা নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। সেদিন সে আমাদের কাছে ছিল হিরো কিন্তু আজ বড্ড ভিলেন! সেই বিকেলে আজকের অনেক সুশীল বনে যাওয়া বামেরা বারবার খোঁজ করছিলো যুবলীগের সম্রাট আর ছাত্রলীগের নাজমুলদের। সেদিন মতিঝিলের তাণ্ডব মনে করিয়ে দেয়, সেদিনের সেই বড় জমায়েত নিয়ে শাহবাগে আক্রমণ করলে আমাদের কতজনের লাশ ফেলতো ওরা। কিভাবে ওরা রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠতো!  

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি নানাভেবে বিভাজিত! একে অপরের গায়ে কালিমা লেপনে ব্যস্ত সময় পার করছি। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতিকে রুদ্ধ করে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন যাত্রাকে যেকোন মূল্যে রুখতে তারা ঐক্যবদ্ধ। এইদিকে আমাদের অনেক আদর্শহীন নেতারা ভোগ-উপভোগ-সম্ভোগে উন্মাদ হয়ে তাদের রাষ্ট্রের নানা জায়গায় পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছে। প্রতিনিয়ত জন্ম দিচ্ছে শাহেদ-সাবরিনা,মিঠু-জিকে শামিম আর পাপিয়াদের।

আজ জামায়াত-বিএনপির এজেন্ট ও মৌলবাদী ধর্মান্ধ শক্তিকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয়ে এদেশের সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের শেকড় গড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। যা আগামীতে প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ ও ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত লাল সবুজ পতাকাকে নিশ্চিত ক্ষতবিক্ষত করবে। যত উন্নয়ন বা প্রবৃদ্ধির কথাই বলা হোক না কেন, সাম্প্রদায়িক শক্তির বীজে বেড়ে ওঠা মৌলবাদীদের থাবায় সবই ভেস্তে যাবে এবং মনে রাখা দরকার তাদের চাপাতির কোপের রেঞ্জের বাইরে কোন প্রগতিশীলই নয়। টার্গেট যেন আমরা সবাই, সব ধর্মের মানুষ।

তাই আসুন, সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসন থেকে বাংলা সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুদৃঢ় করে সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীকে রুখে দিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এখন সময় আমাদের সব ধরনের সক্ষমতা একীভূত করে শক্ত হাতে এদেরকে নির্মূলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা। আমাদের আজকের দৃঢ় পদক্ষেপই পারে আগামীতে আমাদের সন্তানদের জন্য এক প্রগতিশীল ও নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ রেখে যেতে।

বিশ্বাস করি, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের আবহমান বাংলায়। লালন-হাছনের সুরে বিমোহিত হওয়া সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সম্প্রীতির দেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ঠাই হতে পারে না। মনে রাখবেন-একমাত্র মানুষের মিলিত প্রতিরোধই পারে এই অন্ধকার শক্তির উৎস বিরুদ্ধে লড়াইটা জারি রাখতে। মানবতার জন্য-মুক্তিযুদ্ধের জন্য-প্রগতির জন্য একত্রিত হওয়ার এখনই সময়।   

লেখক : এফ এম শাহীন 
প্রধান সমন্বয়ক, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]