ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০ ১৬ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০

গভর্নর পদে কেন একই ব্যক্তির ফিরে আসা
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 22

তিনি তখন অর্থসচিব থেকে অবসরকালীন প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে। তার কিছু ব্যক্তিগত কাজ ছিল সচিবালয়ে। ব্যক্তিগত কাজ করতে গিয়ে তিনি কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার রুমে বসেননি। কিংবা কারও কাজে কোনো ব্যাঘাত ঘটাননি। তিনি নীরবে সচিবালয়ে এসেছেন। বসেছেন নিরিবিলি এক সহকারী সচিবের রুমে কিংবা প্রশাসনিক কোনো কর্মকর্তার রুমে। তাও আবার সেই অর্থবিভাগে। এই কথা জানাজানি হওয়ার পর অনেকে অবাক হয়েছেন। এমনকি, দৃশ্যটি কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা মেনে নিতে পারেননি। কারণ, দুদিন আগে যিনি ছিলেন এই বিভাগের সচিব, তিনি কীভাবে নীরবে নিভৃতে তার ব্যক্তিগত কাজ সারেন সবার চোখের আড়ালে। আর তিনি হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে তৃতীয় দফা নিয়োগ পাওয়া ফজলে কবির।
২০১৬ সালের ১৫ মার্চের ঘটনা অনেকের মনে থাকার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি নিয়ে হইচই পড়ে যায়। তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ওইদিন সরকার চার বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সদ্য বিদায়ি অর্থসচিব ফজলে কবিরকে। কেন দিল তা সরকারই ভালো বলতে পারবে। তবে দীর্ঘদিন পর একজন আমলা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পায় সে কথা সবার জানা। তবে সরকারের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ফজলে কবির একজন দক্ষ আমলা হলেও সরকারের আর্থিক নীতি নিয়ে তার বেশ পড়াশোনা রয়েছে। শুধু কি তাই? তিনি যে মাঠ প্রশাসন থেকে উঠে এসেছে সে বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে একেবারে কৃষকের নাড়ি নক্ষত্র সম্পর্কে তার জানা রয়েছে।
আর যে মাত্রাটি তাকে আরও সহায়তা করেছে তা হলোÑ তার সততা, দক্ষতা ও একাগ্রতা। এর আগে ড. সালেহউদ্দিন ও ড. ফরাসউদ্দিন আমলা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে ফজলে কবিরের পার্থক্য হলোÑ অন্য দুজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ে চাকরির সময়ে পড়ালেখার জন্য বিদেশে গেলেও তিনি সার্ভিসের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন। অন্যরা যুগ্ম সচিব পর্যায়ে চাকরির সময় পড়ালেখার জন্য বিদেশে চলে যান পড়াশোনার জন্য। কিন্তু ফজলে কবিরের আমলাতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
আজ অনেকেই বলছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে যোগ্যতা ও বেশ কিছু শর্ত থাকা প্রয়োজন। শর্তগুলো কীÑ তা অবশ্য স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে এ কথা সত্য যে, যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হবেন তাকে অবশ্যই দেশের আর্থিক ব্যবস্থা থেকে শুরু করে মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির শুধু অর্থবিভাগের সচিব হিসেবে নয়, অনেক আগে থেকে তার এসব ব্যাপারে বেশ আগ্রহ রয়েছে বলে তার বন্ধুমহল থেকে শোনা যায়। অনেক দেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে এমন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেন যার আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু তাই বলে গভর্নরকে অঙ্ক শাস্ত্রে পারঙ্গম হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তা না হলে বাংলাদেশে এমন অনেক আমলা অর্থসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তারা কেউ ইতিহাসের ছাত্র, আবার কেউ ইংরেজির ছাত্র। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই তাদের অবস্থান থেকে ভালো পারফরমেন্স দেখিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে নাসিমউদ্দিন আহমেদ, ড. আকবর আলি খান,
জাকির আহমেদ খানসহ আরও অনেকের নাম বলা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক এমন একটি ইনস্টিটিউশন যেখানে সরকার খুব ভেবে চিন্তে গভর্নর নিয়োগ দেন। কারণ উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের পাশাপাশি আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে সংপৃক্ত। বর্তমান গভর্নর ফজলে কবির বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করার পরপরই তার কার্যক্রম নিয়ে অনেকে গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন। অনেকে ভুল ধরতে চেয়েছিলেন। কারণ আমলা থেকে গভর্নর হওয়া অনেকেই পছন্দ করেননি। যে কারণে তার চলার পথে ছিল অনেক বাধা। কিন্তু তিনি সব বাধা অতিক্রম করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন। কেউ হয়তো প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও, নেপথ্যে অনেক বাধা সৃষ্টি করার জন্য ওঁৎ পেতে বসেছিলেন। কিন্তু ফজলে কবিরের দূরদৃষ্টি, বিচক্ষণতা ও সততা সব সময় পথ দেখিয়ে দিয়েছে। তবে এর মধ্যে তার বেশ কয়েকজন শুভাকাক্সক্ষী তাকে বেশ সহায়তা করেছেন। আর এর মধ্যে অন্যতম হলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজর মরহুম আল্লাহ মালিক কাজেমি। সে কথা ফজলে কবির নিজেই স্বীকার করেছেন তার সর্বশেষ মুদ্রানীতি ঘোষণাপত্র প্রকাশ উপলক্ষে।
কেন তাকে সরকার আবারও গভর্নর নিয়োগ দিল? কেনই বা তাকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আইন সংশোধন করতে হলো? এই প্রশ্ন এখনও অনেকের মনে। তবে সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, করোনাকালে সরকার নতুন কাউকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী ছিল না। কেন উৎসাহী ছিল না? এই প্রশ্নের উত্তরে জানা গেছে, করোনাকালে সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তা বাস্তবায়ন নতুন একজন গভর্নরের পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ফজলে কবিরের নখদর্পণে রয়েছে সব। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর এই বিষয়ে প্রতিটি সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, বেশ কিছু গাউড লাইন সরকারের সামনে উপস্থাপনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ফজলে কবিরের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। নতুন একজন গভর্নর এলে তাকে দিয়ে হয়তো কাজ হতে পারে। কিন্তু এত নিখুঁতভাবে কার্যক্রম সম্ভব হয়তো হবে না বলে সরকারের পক্ষ থেকে ধারণা করা হয়েছে। তাই ফজলে কবিরকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে সরকার। করোনাকালে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে তা সুষ্ঠুভাবে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন হবে বলে সরকার মনে করছে। তবে ফজলে কবিরের এখন দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে বলে মনে করছে সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। করোনার সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা। এই বন্যায় কৃষকেরা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হলো, আর তাদের আগামীদিনের ঋণ কর্মসূচির সহায়তা কতটুকু পাবে তা অনেকাংশে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংয়ের ওপর নির্ভর করছে। যে কারণে ফের দুই বছরের জন্য গভর্নর নিয়োগ পাওয়া ফজলে কবিরের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াতে পারে।
নতুনভাবে দায়িত্ব পাওয়ার পর ফজলে কবির ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছেন। অবশ্য অনেকেই আগে মনে করেছিলেন তিনি হয়তো মুদ্রানীতি ঘোষণার সুযোগ পাবেন না। কিন্তু সরকারই তাকে সেই সুযোগ এনে দিল। মুদ্রানীতিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, করোনার দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তার কারণে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পুনরুদ্ধারের গতি প্রকৃতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আশার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, বিদ্যমান খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ব্যাংকগুলো অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ঋণ প্রদানের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তবে এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, ফজলে কবির এমন একসময় নতুনভাবে দায়িত্ব পেলেন যখন মহামারির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাÐে শ্লথ গতি। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে গেছে। তবে সামনে আরও দিন রয়েছে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। যার নেতৃত্ব দেবেন ফজলে কবির।
সামনে দিনগুলো খুব মসৃণ হবেÑ সে কথা হলফ করে বলা যায় না। যে কারণে এখন থেকে দেখেশুনে পা ফেলতে হবে। দূরদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে পথ চলতে হবে। গুণীজনের বাণী হচ্ছেÑ যে পথ দিয়ে হাঁটছ তুমি সেই পথে দুটো দিক রয়েছে। একদল একদিক থেকে ইট-পাথর ছুড়ে দেবে, আর অন্যদল অন্যদিক থেকে ফুলের পাপড়ি ছড়াবে। এরই মধ্যে দিয়ে তোমায় পথ অতিক্রম করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার জন্য কেউ কেউ বিভিন্নভাবে তদবির করেছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। আর এই তদবির করার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা গেছে, ফজলে কবির যেন আবারও গভর্নর পদে নিয়োগ না পান। কিন্তু সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ফজলে কবিরকে আবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল বিভিন্ন বিষয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেই এ পদক্ষেপ নেয়। অনেকের তদবির ও সুপারিশ অগ্রাহ্য করেই প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ষ সাংবাদিক





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]