ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০ ১৬ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০

ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার প্রতি ইন্দিরা গান্ধীর মাতৃসুলভ স্নেহ
স্বপন কুমার সাহা
প্রকাশ: রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 27

বাংলাদেশের জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিজ বাড়িতে সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত হয়েছিলেন বিপথগামী কিছু সেনা সদস্যের হাতে। যেসব পাকিস্তানি দালাল বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বিশ্বাস করত না তাদের প্ররোচনায় এই নির্মম হত্যাকাÐটি ঘটানো হয়। বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাÐ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, স্বাধীনতাবিরোধীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি, কারণ তারা পাকিস্তানি আদর্শে বিশ^াস করত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাÐের পর কয়েকটি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আমি প্রশ্ন করতে চাই, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাÐের পর কেন তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ওইসব দেশের নির্দেশনা ও প্ররোচনায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর হাতে ৩০ লাখ মানুষ নিহত ও তিন লাখ নারীর নির্যাতিত হওয়ার বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল এসব দেশ তাতে বিশ^াস করত না।
বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের প্রায় সব সদস্য নিহত হওয়ার পর কোনো নেতাই এই ভয়াবহ হত্যাকাÐের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াননি, যদিও বঙ্গবন্ধুর হাজার হাজার কর্মী ও অনুসারী ছিলেন। তৎকালীন নেতৃত্ব ১৫ আগস্টের হত্যাকাÐের পর কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। তৎকালীন নেতৃত্ব থেকে কোনো নির্দেশনা না আসায় আমরা বঙ্গবন্ধুর কর্মী ও অনুসারীরা হত্যাকাÐের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দুঃখজনকভাবে ব্যর্থ হই, কোনো নেতাকেই সেদিন প্রতিবাদ করতে কিংবা নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যরা নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ও কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার ভাগ্যে কী ঘটেছিল? আমরা সবাই জানি, সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমতে তারা রক্ষা পেয়েছিলেন, কারণ তারা সেদিন পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন। শেখ হাসিনার স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া তখন জার্মানিতে কর্মরত ছিলেন। তখন পশ্চিম জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।
বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকাÐের খবর পেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিস্তারিত জানতে রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে ছুটে যান। সবকিছু শুনে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন, হতবুদ্ধি হয়ে যান। তারা বিস্মিত হন এটা জেনে যে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ^াসী হাজার হাজার অনুসারী থাকা সত্তে¡ও হত্যাকাÐের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার কেউ ছিলেন না। রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ও তার স্ত্রী বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে সান্ত¦না দেন। তবে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয় এই নিয়ে যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের হাত থেকে কে তাদের রক্ষা করবে এবং নিরাপত্তা দেবে? এই পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপত্তা দান ও জীবন বাঁচানো অত্যন্ত জরুরি হওয়া সত্তে¡ও তাদের রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসেননি।
কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাদের নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষায় মাতৃস্নেহ ও সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসেন। তখন শ্রীমতী গান্ধী সত্যিকার একজন অভিভাবক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যাদ্বয়কে নিরাপদে নয়াদিল্লি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, শ্রীমতী গান্ধী বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে সাহস দেন এবং মনোবল না হারাতে বলেন। ভারতে পৌঁছার পর শেখ হাসিনা শ্রীমতী গান্ধীর মাতৃসুলভ স্নেহ ও ভালোবাসায় অত্যন্ত অভিভ‚ত হন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাদের জন্য সব রকম সাহায্য ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন যাতে তারা শান্তিতে ভারতে অবস্থান করতে পারেন। যে বাড়িতে তারা ছিলেন সেটা নিরাপত্তা বাহিনী ঘিরে রাখে যাতে কোনো দুষ্কৃতকারী কোনোভাবে তাদের ক্ষতি করতে না পারে। শ্রীমতী গান্ধী ‘একজন দেবদূত অভিভাবকের মতো’ তাদের বিশেষভাবে দেখভাল করেন যাতে তারা ন্যায়সঙ্গত ও সুন্দরভাবে জীবিকা অর্জনের মাধ্যমে জীবনধারণ করতে পারেন।
শেখ হাসিনার স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার জন্য ভারতীয় বৃত্তির ব্যবস্থা করে তাকে নয়াদিল্লিতে নিযুক্তি দেওয়া হয়। যাতে তিনি ভারতে থেকে তার গবেষণার কাজ অব্যাহত রাখতে পারেন। ইন্দিরা গান্ধী আবারও তার মানবিক গুণাবলি ও গতিশীল নেতৃত্বের প্রমাণ দেন। শ্রীমতী গান্ধী বাংলাদেশে প্রতিক‚ল পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের ভারতে সম্মানজনক আশ্রয় দিয়ে বিশে^র কাছে তার মানবিক মহানুভবতা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ নেতৃত্বের পরিচয় রাখেন। শ্রীমতী গান্ধীর দূরদর্শিতা আবারও শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের প্রতি
মাতৃসুলভ স্নেহ প্রমাণ করে, যার মধ্য দিয়ে মানবিক গুণাবলিও প্রকাশ পেয়েছে।
মাতা-পিতা, ভাই ও ঘনিষ্ঠজনদের হারানোর পর শেখ হাসিনা যে দুঃসময় অতিবাহিত করছিলেন, ভারতে থাকার যথাযোগ্য অধিকার দিয়ে তাকে সম্মানিত করেন শ্রীমতী গান্ধী। যতদিন ধর্মনিরপেক্ষ জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা বেঁচে থাকবেন শ্রীমতী গান্ধীকে তারা সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করবেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে মাতৃভ‚মিতে ফিরে আসেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে।
ইন্দিরা গান্ধী আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তার দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে জনপ্রিয় নেতায় পরিণত হন। শেখ হাসিনা ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের ১৬ মে পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর ভারতে ছিলেন। ২১ বছর ধরে সংগ্রাম ও গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখন চতুর্থ বারের মতো দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

ষ সিনিয়র সাংবাদিক




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]