ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০ ১৬ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ
এস এ মালেক
প্রকাশ: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২০, ১০:১৭ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 29

বিশ্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখন কোনো দেশ, জাতি বা জনগোষ্ঠী ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, তখন দৈবক্রমে এমন এক বা একাধিক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয়, যারা ওই সঙ্কট থেকে জনগণকে উদ্ধার করে প্রগতির ধারায় অগ্রসরমাণ করেন। মুক্তির পথ দেখান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ একসময় ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান নামক একটা ধর্ম রাষ্ট্রের প্রদেশ। দ্বি-জাতিভিত্তিক তত্তে¡র ওপর ভিত্তি করে এই উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একটি হিন্দুস্তান এখন ভারত। আর অন্যটি পাকিস্তান। নানা ধর্মাবলম্বী মানুষ এই উপমহাদেশে বাস করলেও হিন্দু-মুসলমান ধর্মগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও এই দুই রাষ্ট্রে স্থান করে নেয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে হিন্দু ও মুসলমান দুই পৃথক সম্প্রদায়ের জন্য দুটো পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হলেও জন্মলগ্ন থেকেই ভারতে অগণিত মুসলমান ও পাকিস্তানে বহুসংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক থেকে যায়। শুধু ধর্মভিত্তিক দুটি বৃহৎ সম্প্রদায়ের জন্য দুটি রাষ্ট্র গঠন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, বৃহত্তর দুটি সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমান সাম্প্রদায়িক মন-মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে।
সাম্প্রদায়িক মন-মানসিকতার জন্য তারা সহাবস্থানের নীতি থেকে সরে এসে পারস্পরিকভাবে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা পারস্পরিক সংঘাতে অবতীর্ণ হতেও দ্বিধাবোধ করেনি। ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতার বিরোধের কারণে এই উপমহাদেশে বারবার মানবতা যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে ও শর্তসহস্র মানব সন্তানকে জীবন দিতে হয়েছে; তা লোমহর্ষক। এর মধ্যে পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো হয়েছে। মাত্র
২৩ বছরের ব্যবধানে পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শোষণ ও শাসনে সর্বস্বান্ত হয়ে সুদীর্ঘ দিনের সংগ্রাম ও ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তর করে। পাকিস্তানি নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রথম শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন।
এই স্বায়ত্তশাসনের দাবিই মূলত স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তর হয়। যে মহান নেতা ‘১৮৪৮ থেকে ১৯৭১’ পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন; তিনি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন সম্পর্কে আলোকপাত করতে হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই তা করতে হবে। ১৯২০ সালে বঙ্গবন্ধু যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন বাংলাদেশসহ ভারত পাকিস্তান ছিল ব্রিটিশের কলোনি। প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশরা ভারতের রাজদÐ হাতে নিয়ে এদেশকে শাসন ও শোষণ করেছিল। (১৯২০-১৯৪৭) এই ২৭ বছর বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক। স্কুলজীবন থেকেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট হন। সেই সময় ভারতীয় মুসলিম লীগ ছাড়া আর অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না। তাই স্কুলজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধু মুসলিম লীগ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর বঙ্গবন্ধু উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং অতি অল্প সময়ে সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এ সময়ে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সাহচার্য যেমন পান তেমনি তিনি মুসলিম ছাত্রসংগঠনের নেতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
 ১৯৪৬ সালে কলকাতায় যখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়, সেই দাঙ্গা প্রতিরোধে বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এরপর পাকিস্তানের জন্ম হলে তিনি কলকাতা থেকে বাংলাদেশে ফিরে ঢাকা বিশ^^বিদ্যালয়ে আইনের ছাত্র হিসেবে লেখাপড়া শুরু করেন। এ সময় চতুর্থ শ্রেণির আন্দোলনে সচেষ্ট হয়ে পড়েন। তাঁর সঙ্গে আরও অনেকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও অনেকেই মুচলেকা দিয়েই জেলখানা হতে বের হন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুচলেকা দিতে অস্বীকার করায় তাকে ঢাকা বিশ^^বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এখানে বলা দরকার যে, গোপালগঞ্জে স্কুলের ছাত্র থাকাবস্থায় ছোটবেলা থেকেই তিনি মানবতাবাদী ক্রিয়াকলাপের জন্য অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর স্কুলজীবনেই তিনি প্রমাণ করেন, তিনি শুধু নিজের জন্য নন, অপরের জন্যেও সদা সর্বদা তৎপর ছিলেন। গ্রামে খাদ্য বিতরণ করা ছিল তাঁর অভ্যাস। স্কুলের সহপাঠীর প্রতি তিনি ছিলেন সদয়। গরিব সহপাঠীদের বই-পুস্তক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করতেন। এমনও দেখা গেছে নিজের সহপাঠীকে ছাতা দিয়ে তিনি বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরছেন। চটপটে, কোমলমন এই ছাত্রটি সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। খেলাধুলায় তাঁর ছিল অত্যন্ত মনোযোগ। তিনি ফুটবল খেলায় পারদর্শী ছিলেন এবং তাঁর ফুটবল টিমও ছিল। স্কুলে খেলার মাঠে বা সমাজকল্যাণ তৎপরতায়, যেখানেই তিনি নেতৃত্ব দেন, তা সফলভাবে পালন করতেন। গ্রাম-বাংলার যে পরিবেশে তিনি মানুষ হন, সেখানে তিনি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন।
এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিই হলেন বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা শেখ মুজিব। অনেককে বলতে শোনা যায় তিনি যদি অসাম্প্রদায়িক মানুষ হবেন, তাহলে মুসলিম লীগ করতে গেলেন কেন? উত্তরে বলতে হয়, সেদিন মুসলিম লীগ ছাড়া আর কোনো দল ছিল কি? আর মুসলিম লীগ করলেও যারা সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীলতায় বিশ^^াসী তিনি ওইসব মুসলিম লীগের ধারেকাছেও ভিড়েননি। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতা, যারা লাহোর প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন ও স্বাধীন স্বতন্ত্র বাংলাদেশ বিশ^^াস করতেন, তাদের সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু কাজ করতেন। ’৪৭-এ ভারত বিভক্তির পর তিনি কলকাতায় বলেছিলেন যে, পাকিস্তান সৃষ্টি বাঙালির জন্য কোনো সুখবর নয়। পাকিস্তান নামক ধর্মরাষ্ট্রে বাঙালি স্বাধীন হবে; এটা ছিল তাঁর কল্পনার বাইরে। কলকাতায় বসে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে। এরূপ মন-মানসিকতা নিয়েই তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। সুতরাং যারা বলেন, ’৭০-এর নির্বাচনের পরেও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান ভাঙতে চাননি, তাদের অতীত ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা প্রয়োজন। ’৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে এবং ’৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠন করে ভাষা ও অন্যান্য সৃষ্ট সঙ্কটের ব্যাপারে তিনি যে অভিমত ব্যক্ত করেন ও ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশনা দেন; তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, পাকিস্তান নামক সদ্য রাষ্ট্র সৃষ্টির অভিপ্রায়
তাঁর ছিল না।
বরং কেন্দ্রীয় সরকারকে দুর্বল করে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টিই ছিল তাঁর লক্ষ্য। অবশ্য এই কাজটি তিনি এমন সুকৌশলে করেন, যাতে করে পাকিস্তানি শাসকেরা তাকে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় অভিযুক্ত না করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে শোষণ শুরু করে ও যেভাবে দুই অঞ্চলের ভেতর বৈষম্য সৃষ্টি হয়, তাতে করে স্বায়ত্তশাসনের দাবি আবশ্যক হয় ওঠে। এরপর ভাষা আন্দোলনের ঠিক কিছু পূর্বে কেন্দ্রীয় শাসকেরা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা দেয় ও পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ এর প্রতিবাদ করে। ২১ ফেব্রæয়ারি বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ভাষার মর্যাদা ফিরিয়ে
আনে। তখন বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তর করেন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার জনগণ বুঝতে পারে বাঙালি জাতিসত্তাকে ধ্বংস করাই পাকিস্তানি শাসকের লক্ষ্য।
পাকিস্তানি শাসকেরা ভেবেছিল ১২০০ মাইল দূরেÑ যারা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যতে ভিন্ন তারা সুযোগ পেলেই স্বাধীন দেশ পেতে চেষ্টা করবে। তাই বাঙালি জাতিসত্তাকে ধ্বংস করতে পারলেই বাঙালিকে পাকিস্তানি অন্তর্ভুক্তকালীন প্রক্রিয়া সফল হতে পারে। তারা ভেবেছিল বাংলা ভাষাকে অস্বীকৃতি জানিয়ে বাঙালি জাতিসত্তাকে নির্মূল করতে সক্ষম হবে। ভাষা আন্দোলনের যে পরিণতি উচিত ছিল, তাই ঘটেছে। ভিন্ন ভাষা আর ঐতিহ্যপূর্ণ একটা জনগোষ্ঠীকে আরেকটা ভিন্ন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিকরণ যে সম্ভব নয়, তা পাকিস্তানি মূর্খরা বুঝবার চেষ্টা করেনি। তাই একদিকে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন এবং অপরদিকে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসনের কারণে ক্রমাগত সাংস্কৃতিক আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে।
এই দুই আন্দোলন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমন্বিত হয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। যারা বলেন, ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান উল্লেখযোগ্য নয়, তাদের জেনে রাখা উচিতÑ ’৫২ নয়, প্রকৃতপক্ষে ’৪৮-এ বঙ্গবন্ধু ভাষার প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলতে শুরু করেন। পাকিস্তান জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু একাধিকবার ভাষা ও পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করার প্রতিবাদ জানান। আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে ১৪৪ ধারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ কার্যকর করে। এ কথা ঠিক আন্দোলনের প্রথমেই কারারুদ্ধ হলেও কারাগার অভ্যন্তর থেকেই তিনি আন্দোলনের নির্দেশনামা দেন। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে যখন আদালত হাজির করা হতো, তখন আদালত থেকেই গণসংযোগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন।
এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনের অনেকেই তাকে সাহায্য করেছেন। আর কারাগার থেকে যখনই অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হতো, তখন বলতে গেলে হাসপাতাল থেকেই সব নির্দেশনা দিতেন। এ ছাড়া যখনই কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন, তখনই আন্দোলন বিশেষভাবে দানা বেঁধে উঠেছে। শুরু থেকে ভাষা আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে তাঁর নির্দেশনা ছিল সঠিক এবং তা কর্মীবাহিনী সঠিকভাবে রাজপথে বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল বলেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরপরই বঙ্গবন্ধু আন্দোলনকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বুঝতে পারেন রাজনৈতিক আন্দোলন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে সংযোজন ঘটাতে না পারলে প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করা কঠিন হবে। আসলে ভাষা আন্দোলনের পর্যায়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনাসম্পন্ন, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বৃদ্ধিজীবীরা যেভাবে আন্দোলন কাজে সমর্থন জুগিয়েছেন, তাতে করে আন্দোলনকে
সাংস্কৃতিক রূপদান সহজ হয়েছে। আর ওইসব সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। ভাষা আন্দোলনে যেভাবে বাম গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল শক্তি একত্রে কাজ করতে সক্ষম হয়েছে, অন্য কোনো আন্দোলনে সেই রূপটা ঘটেনি। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন ও সংগ্রামে প্রগতিশীল ও বাম শক্তির ওপর নির্ভর করেছেন।
স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে অনেকেই সমর্থন জুগিয়েছিল। একেক জনের দাবি-দাওয়ার প্রকৃতি একেক রকম। সেই ’৫৪-এর ২১ দফা স্বায়ত্তশাসনের দাবি অন্তর্ভুক্তি ছিল। এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠনের নেতারাও কখনও কখনও স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু তাই স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে একটা কংক্রিট রূপ দিতে চাইলেন এবং ওই স্বায়ত্ত¡শাসনের দাবির কংক্রিট হচ্ছে ঐতিহাসিক ৬ দফা। ৬ দফায় স্পষ্টতই কেন্দ্রের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের কী সম্পর্ক হবে, রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি কী হবে, ক্ষমতার ভাগাভাগি কীভাবে হবে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সবকিছুই নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।
একমাত্র বিদেশ মন্ত্রণালয় ও দেশরক্ষা ছাড়া সব দায়িত্ব ৬ দফায় আলাদা করা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাতে সম্পদ পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে, তার পূর্ণ রক্ষাকবজ ছিল ৬ দফায়। চিরস্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জন্য এমন একটা সংবিধান প্রণয়ন করতে চেয়েছিলেন, যার ভিত্তি হবে ৬ দফা।
তাঁর এই পরিকল্পনাকে পাকিস্তানি শাসকেরা পাকিস্তানের সংহতি ধ্বংসের কারণ বলে মনে করে এবং বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ১নং শত্রæ হিসেবে চিহ্নিত করে। ’৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় যখন পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা বলে কিছুই ছিল না। তখন লাহোরের মাটিতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৬ দফার ঘোষণা দেন। বিষয়টি এতই যৌক্তিক ছিল যে, পাকিস্তানি শাসকদের কিছু বলবার সাহস ছিল না। তারা বুঝতে পারল বঙ্গবন্ধু সুনিশ্চিতভাবে সৎভাবে ব্যবহার শুরু করেছেন। যা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তার পক্ষে সহায়ক হবে। আসলে পূর্ব বাংলার নিরাপত্তার মূল বিষয় ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন গোটা বাঙালিকে অধিকার সচেতন করতে এবং প্রয়োজনবোধে চরম মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকতে। ৬ দফা দাবির মাধ্যমে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাব প্রতিপত্তি ও মান ক্ষুণœ হতে থাকে। ৬ দফার মূলমন্ত্র ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্যাতন নিপীড়ন থেকে বাংলাদেশের মানুষকে মুক্ত করা। বাংলাদেশকে স্বাধীন করা।
যেহেতু স্বাধীনতার কথা তখন প্রকাশ্যে বলা সম্ভব ছিল না, তাই প্রস্তুতি পর্বে বাংলাদেশের মানুষকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে ৬ দফা এক অসাধারণ দায়িত্ব পালন করে। বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করলেন, বাংলার মানুষকে ইস্পাত কঠিন করতে পারলে, এদেশে এমন এক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হবে, যা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কখনও আয়ত্তে রাখতে পারবে না এবং তখনই বিদ্রোহ বা বিপ্লবের ডাক দিলে সফলতা অর্জন সম্ভব হবে। আসলে ৬ দফা শুধু একগুচ্ছ দাবি-দাওয়ার আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল বিদ্রোহ। পাকিস্তানকে না মানার এবং অগ্রাহ্য করার বিদ্রোহ। কৌশলগত কারণে ৬ দফাভিত্তিক সংবিধানের দাবি জানানো হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ভালো করেই জানতেন, পাকিস্তানিরা ৬ দফা মানবে না। ৬ দফাভিত্তিক একটা নির্বাচন করে একচ্ছত্রভাবে বিজয় করতে পারলে ৬ দফাই হবে বাংলাদেশের মূল ভিত্তি, হয়েছিলও তাই। ’৭০-এর নির্বাচনে ৬ দফা বাঙালির ম্যানডেট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।
ওই ম্যানডেট পাকিস্তান না মানার কারণেই শুরু হয় সশস্ত্র যুদ্ধ, আন্দোলনের একটা পর্যায়ে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকদের জানিয়ে দিলেন ৬ দফা তাঁর মূল লক্ষ্য নয়। মূল লক্ষ্য এক দফা। যা তিনি ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এর মাধ্যমে প্রকাশ করলেন। অসহযোগ আন্দোলনের পর্যায়ে যে বাস্তব পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, পূর্ব বাংলার জনগণ তাকে একচ্ছত্রভাবে ভোট দিয়েছে এবং সে অধিকারভিত্তিক বাংলাদেশ শাসন শুরু করলেন এবং তাঁর নিদের্শনা অনুযায়ী ৩ সপ্তাহ ধরে পূর্ব বাংলা শাসিত হলো। কেন্দ্রীয় সরকারের অস্তিত্ব বিলোপ হলো। ভোটের অধিকার যে দেশ শাসনের অধিকার তা বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করে ছাড়লেন। একটা দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বেই দেশের একচ্ছত্র নেতায় পরিণত হলেন, বিশে^^র ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। ভোটের অধিকার প্রয়োগ করে যে অসামান্য অর্জন সম্ভব, তা ’৭০-এর নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। যারা বলেন বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্রে বিশ^^াসী ছিলেন না তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব ২৩ বছরের বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ও আন্দোলনের প্রতি।
৬ দফা ঘোষণার পর জেনারেল আইয়ুব অস্ত্রের ভাষায় বললেও বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষায় জবাব দিয়েছেন। গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা থাকলেও বঙ্গবন্ধু বিপ্লবের দীক্ষাও গ্রহণ করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি তাঁর যতটা না আস্থা ছিল। ’৭০-এর নির্বাচনের পর কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকে তা বাতিল করলে ও সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি শুরু করলে বঙ্গবন্ধুর আর বুঝতে বাকি রইল না যে, পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করবে না। যুদ্ধের মাধ্যমে তা সমাধান করবে। আর সে যুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশ জয়লাভ করে। তাই ৭ মার্চের ভাষণে তিনি প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু একজন গণতান্ত্রিক নেতাই নন; প্রয়োজনবোধে গণতন্ত্রের ভাষা পরিবর্তন করে অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। তাই ৭ মার্চের ভাষণে ৪ দফা দাবি জানিয়ে তিনি যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন, একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, তবুও এদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ।’
এ কথা সত্য তিনি ৩০ লাখ বাঙালির এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করলেন। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি গণতন্ত্রের ভাষা যেমন তিনি ব্যবহার করেছেন একই সঙ্গে অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কীভাবে যুদ্ধ করে শত্রæকে পরাজিত করতে হবে। তার দিক-নির্দেশনাও ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষায়। তিনি অবরোধ করে প্রথমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল ও পরে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে হানাদার বাহিনীকে বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করার আহŸান জানিয়েছিলেন। এই ক্রিয়া কর্মের সঙ্গে পরবর্তী পর্যায়ে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করা হলেও বঙ্গবন্ধু কিন্তু যুদ্ধ শেষে দেশ পরিচালনায় কোনো অগণতান্ত্রিক ধারা অনুসরণ করেননি। আমি এবং আমার মতো অনেকে যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলাম; তারা বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলাম বিপ্লবী কাউন্সিল করে দেশ শাসন করতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আমাদের কথা শোনেননি। তাঁর যুক্তি ছিলÑ যে গণতান্ত্রিক ধারায় দেশের জনগণ অগ্রসর হয়েছিল সেই ধারা অব্যাহত রেখে স্বাধীন দেশ পরিচালনা করতে হবে। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করা
হলেও বৈপ্লবিক চেতনায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হয়নি।
তাই স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকল্প কিছু তিনি মনে করেননি। এ কারণেই ’৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করে ’৭৩-এর নির্বাচন দিয়ে দেশে প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। ৭২-৭৫ এই তিন বছর বাংলাদেশ যে সংবিধান অনুযায়ী অনুশাসিত হয়েছে, তার থেকে ভালো গণতান্ত্রিক সংবিধান বিশে^^র কোনো দেশ প্রবর্তন করেছে বলে মনে হয় না। অথচ কী দেখলাম আমরা এই তিন বছরে। জনগণকে দেওয়া হলো অবাধ অধিকার এবং সে অবাধ অধিকারের সুযোগ নিয়েই স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি ও একই সঙ্গে অতি বাম হঠকারীরা যেভাবে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করলÑ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি আক্রমণ, পাঁচজন সংসদ সদস্যকে হত্যা, আত্রাই থেকে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা, সিরাজ শিকদার নামক একজন বিপ্লবী কর্তৃক শ্রেণি-সংগ্রামের নামে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ হত্যা, পূর্ব বাংলার মাকসিস্ট ও সোস্যালিস্ট পার্টির অন্তঃদ্ব›দ্ব, হানাদার বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র হাতে পেয়ে তারা এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করল যে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে নীরব দর্শকের ভ‚মিকা পালন করা সম্ভব ছিল না। এভাবে গণতন্ত্র কার্যকর করার পরিবেশ তখন ছিল না।
জাতীয় সংসদে চতুর্থ সংশোধনী অনুমোদিত হয় এবং বাকশাল গঠিত হয়। অনেকে এখনও বাকশাল করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অভিযুক্ত করে থাকেন। কেউ কেউ এও বলতে ছাড়েন না যে, বাকশাল করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জীবন দিতে হয়েছে। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনবার যে পদক্ষেপসমূহ তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তাই যদি তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে কেন তিনি ওই পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন এবং কী কারণে কাদের স্বার্থে, তা করা হয়েছিল।
এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়ার চেষ্টা না করে এ ব্যাপারে বিশ্লেষণাত্মক সবকিছু বিবেচনায় না নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গণতন্ত্র হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে কঠোরভাবে দাঁড় করানো কখনও সমুচিত নয়। যারা বলেন, বাকশাল গঠন করার কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যা হয়েছে; তাদের কাছে জিজ্ঞাসা যখন তাকে হত্যা করা হলো, তখন তো সবেমাত্র বাকশাল শুরু। রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিকভাবে কোথাও বাকশালের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়নি। যে পদক্ষেপসমূহের কোনোকিছুই বাস্তবায়িত হয়নি; তাঁর ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া কি যুক্তিযুক্ত বা সঠিক হয়েছে? আরও প্রশ্ন জাগেÑ বাকশাল করার কারণে দেশের অভ্যন্তরে দলের ভেতরে ও বাইরে এবং বিদেশে বাকশাল সম্পর্কে কারা বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছিল।
স্বাধীনতাবিরোধীদের ভ‚মিকাই বা কী ছিল? স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রবর্তিত গণতান্ত্রিক পরিবেশে যারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিনষ্টের ষড়যন্ত্র করেছিল, সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রবর্তিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের পদক্ষেপে তাদের তুষ্ট না হওয়ারই কথা।

ষ চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]