ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

মহাদুর্ভোগে করোনা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা
অরূপ তালুকদার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০, ১২:০০ এএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 23

একটা ভালো খবর দিয়েই শুরু করা যাক আজ। কারণ এখন এই সময়ে কোথাও থেকে যেন ভালো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। জানি না, আর কতদিন পরে খারাপ খবর কমে গিয়ে শুধু ভালো খবর পাওয়া যাবে। কদিন আগে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে খবর পাওয়া গেল যে, বিষয়টা অনেকটা অবিশ^^াস্য মনে হলেও আসলে সত্যি খবর হচ্ছেÑ চলমান করোনা মহামারির মধ্যেও, যেখানে বিশ^^ জুড়ে অর্থনৈতিক ধস নেমেছে, সেখানে আমাদের প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। প্রবাসী আয়ে জুন মাস ছাড়িয়ে পরের মাসে অর্থাৎ জুলাইয়ের ২৭ দিনে রীতিমতো রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই মাসের ২৭ দিনেই ২.২৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এক মাসে প্রবাসী আয় আসা এটাই সর্বোচ্চ আমাদের দেশে। জুন মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১.৮৩৩ মিলিয়ন ইউএস ডলার। এটা ছিল ২০১৯-এ আসা রেমিট্যান্সের চেয়ে ৩৯ শতাংশ বেশি। ঠিক এই সময়ে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই খবরটি আশার আলো দেখায়।
আমরা অনেকেই টিভিতে বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ছবি দেখার সময় অধিদফতরের দেওয়ালে একটি সাইনবোর্ডের লেখার মতো লেখা দেখেছিÑ ‘আমি এবং আমার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত।’ বড় করে এই লেখাটির নিচে স্বাক্ষরসহ নাম ছিল, ডা. আবুল কালাম আজাদ, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদফতর। জানি না, তার পদত্যাগের পর এই লেখাটি এখনও আছে কি না। এখন নতুন মহাপরিচালকের নেতৃত্বেই চলছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ইতোমধ্যে অধিদফতরের হাসপাতাল বিভাগের পরিচালকও অব্যাহতি নিয়েছেন। পঁচিশ জনেরও বেশি বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা কর্মচারী বদলি হয়েছেন। সবাই আশা করছেন নতুন মহাপরিচালক দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর কথিত নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অবসান হবে ধীরে ধীরে।
গত সপ্তাহে নতুন খবর হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেনের বিষয়ে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেন, তার ভাই মুন্সী ফারুক হোসেন এবং আব্দুল্লাহ আল মামুন নামীয় এবং তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা এফডিআর, সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে লেনদেন ফ্রিজ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। অভিযোগ আছে, তারা পরস্পরের যোগসাজশে বিভিন্ন হাসপাতালে মেডিকেল যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে যে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছে সে সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত চলছে।
এদিকে দুদক মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক এবং হোটেল সুপার স্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের হোটেলে থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য তথ্যাদি এবং রেকর্ডপত্র চিঠি দিয়ে তলব করেছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও অধ্যক্ষ মুগদা মেডিকেল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতাল এবং অন্যদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজসের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে ৯ আগস্টের মধ্যে এসব তথ্যাদি ও রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই ইতঃপূর্বে হোটেল ৭১-এর কাছ থেকেও এমন তথ্যাদি ও রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, দীর্ঘ সময় ধরেই আমাদের স্বাস্থ্য খাত নানা ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়মে ডুবে আছে। আগে যেটা ছিল মানুষের মুখে মুখে করোনাকালে তা প্রকাশ্য হয়েছে নানাভাবে। সাহেদ, আরিফ, ডা. সাবরিনার মতো দুর্নীতিবাজ আর প্রতারকরা কাদের সাহায্য সহযোগিতায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সেসব এখন সাধারণ মানুষ জেনে গেছে।
গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোহাম্মদ সাহেদ, ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফের নানা কীর্তিকাহিনির যত অজানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি দফতরসমূহের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নাম পরিচয়ও এখন আলোয় আসছে ধীরে ধীরে। তাদেরকে কি কখনও ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করা যাবে? এ প্রশ্নের উত্তর কবে কার কাছ থেকে পাওয়া যাবে? সবচেয়ে অবাক বিষয়টি হচ্ছে দুর্নীতিবাজরা শত শত কোটি টাকার সরকারি তহবিল তছনছ করে দিল মেডিকেল যন্ত্রপাতি, মাস্ক, হ্যান্ডওয়াশ, পিপিই ইত্যাদি স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয় ও সরবরাহের নামে, সে টাকা কি কোনোদিন আর ফেরত আসবে?
অথচ এর মধ্যেই অর্থ সাশ্রয়ের অজুহাতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনা চিকিৎসাকালীন সময়ে তাদের আবাসন সেবা বন্ধ করে দেওয়া হলো কাদের দুর্নীতি আর অনিয়ম আড়াল করতে? এভাবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে ফেলা হলো রীতিমতো বিপদে এবং সেই সঙ্গে তাদের পারিবারিক সুরক্ষাও বিঘ্নিত করা হলো কোন যুক্তিতে। এবং কাদের পরামর্শে? স্বাভাবিকভাবেই এসব নিয়ে এখন সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন চিকিৎসকদের স্বার্থ রক্ষাকারী সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিব)। তবে ইতোমধ্যেই তারা অর্থাৎ এসব সংগঠনের নেতারা মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু এ লেখা শেষ হওয়া পর্যন্ত কিছুই হয়নি। জানি না চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কেমন করে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন? দিনের পর দিন
তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে থেকে ছোট-বড় সব সদস্যের মধ্যে করোনা সংক্রমণ
ছড়াতেই থাকবেন।
সবচেয়ে অবাক বিষয়টি হচ্ছে, রাষ্ট্রের উচ্চপদে আসীন যারা, তারাও এসব দেখেশুনে কীভাবে চুপ করে আছেন, সেটা ভাবতেই সাধারণ মানুষ আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে। বলা যাচ্ছে না, এই করোনাকালে ফ্রন্ট লাইনার্সদের উদ্বেগ ও মানবিক যন্ত্রণা কীভাবে কমবে। এ রকম দুর্ভোগ আর নিশ্চয়তায় তারা আর কখনও পড়েছেন বলে মনে পড়ে না। ইতোমধ্যে বর্তমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল পর্যায়ে আসছে। সংক্রমণের হার সময় সময় কিছুটা বেড়ে গেলেও মৃত্যুহার ১.২০ থেকে ১.৫০ শতাংশের মধ্যেই ওঠানামা করছে। মৃত্যুর মিছিল বলতে আমরা যা বুঝি, পরিস্থিতি তেমন পর্যায়ে এখনও যায়নি।
এদিকে, দেশের সাধারণ মানুষ আগের চেয়ে ক্রমশ সচেতন হয়েছে বলে মনে হয়। কিছুদিন আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘরের বাইরে বের হলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে। রাত ১০টার পরে বাইরে বের হওয়াও নিষিদ্ধ করেছে। আসলে এটা সাধারণ মানুষকে বর্তমানের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই করা হয়েছে।
বাইরের পৃথিবীতে অনেক স্থানেই মাস্ক পরে চলাফেরা করার ব্যাপারটা অনেকে একেবারেই মানতে চান না। আমেরিকার মতো সভ্য দেশে মাস্ক পরতে বলায় গুলিও খেতে হয়েছে। আর হয়তো তাদের এই উচ্ছৃঙ্খলতার কারণেই করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার বিশে^^র সব দেশকে ছাড়িয়ে শীর্ষ রয়েছে। প্রতিদিন এখনও শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটছে। সামগ্রিক অবস্থা এখনও নিয়ন্ত্রণে না আসার আরও একটা বড় কারণ হয়তো ইতোমধ্যে সামার এসে যাওয়া। ফলে সামারে কেউ আর ঘরে থাকতে চাইছে না, কোনো বাধাই মানতে চাইছে না। পার্ক থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, সিবিচগুলো মানুষে একাকার। কোথাও কেউ ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আমাদের দেশে ঈদের সময় মানুষজন নাড়ির টানে সুদূর গ্রাম-গঞ্জে মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য চলে গেছে এবং রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর আপন কর্মস্থলে ফিরেও এসেছে। তবে ঈদুল ফিতরের চেয়ে এ ঈদে মানুষের যাতায়াত তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তারপরেও আশা করা যাচ্ছে, সংক্রমণের তীব্রতা এমন হবে না। আসলে আমরা তো এমনটাই চাই।

ষ কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক








সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]