ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ৩ কিশোরকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০, ১০:৫২ পিএম আপডেট: ১৪.০৮.২০২০ ১১:৩১ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 17

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও আনসার সদস্যদের অমানুষিক নির্যাতন ও মারধরে তিন কিশোর নিহত ও আরও অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এই ঘটনা ঘটলেও সন্ধ্যারাতে লাশ হাসপাতালে আনার পর ঘটনা জানাজানি হয়। প্রথমে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা এটিকে দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা দাবি করলেও পরবর্তীতে নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও প্রাথমিকভাবে  বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় ওই কেন্দ্রের ১০ কর্মকর্তা, কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
এদিকে শুক্রবার দুপুরে যশোর জেনারেল হাসপাতালের ডা. আহম্মেদ তারেক সামস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রট হাফিজুল হকের উপস্থিতে বৃহস্পতিবার রাতে নিহত তিন কিশোর বন্দির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। পরে পুলিশ প্রহরায় স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ প্রশাসন। একই সঙ্গে নিহত তিন কিশোর বন্দির লাশ পুলিশ প্রহরায় নিজ নিজ এলাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন যশোরের জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা শিশু ও কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের নিরাপত্তা ঢেলে সাজানো হচ্ছে। কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অপরদিকে পুলিশ প্রহরায় আহত ১৪ কিশোরের চিকিৎসা চলছে যশোর জেনারেল হাসপাতালে।
সূত্র জানায়, গত ৩ আগস্ট যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কিশোরদের দুই গ্রুপের মারামারি হয়। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ওই ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আনসার সদস্য ও তাদের নির্দেশে কয়েকজন কিশোর ওই অন্তত ১৮ জনকে বেধড়ক মারধর করে। মারধর নির্যাতনের অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। কয়েকজন অচেতন থাকায় অজ্ঞান হয়ে গেছে মনে করলেও পরে তারা বুঝতে পারে এরা নিহত হয়েছে। এরপর সন্ধ্যারাতে একেক করে তাদের লাশ হাসপাতালে এনে রাখা হয়।
আহত কিশোরদের দাবি, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ১৮ জন বন্দিকে রুম থেকে বাইরে বের করে আনা হয়। এরপর বিকাল ৩টা পর্যন্ত পালাক্রমে তাদেরকে লাঠিসোটা, রড ইত্যাদি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। পালাক্রমে এভাবে মারধরের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। পরে কয়েকজন মারা গেলে সন্ধ্যারাতে তাদের লাশ যশোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
শুক্রবার যশোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, দুপক্ষের বক্তব্যে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত, সংঘর্ষ নয়, মারধরেই তিনজন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছে। কেন্দ্রের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে, সেখানে অভ্যন্তরীণ শাস্তির রেওয়াজ আছে। সেটি করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি আমরা যাচাই-বাছাই করছি।
হতাহতের ঘটনায় কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সিলর মুশফিকুর রহমানসহ ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, হতাহতের ঘটনায় স্বজনদের মামলার প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তারাই এই ঘটনার মূল সাক্ষী। মৃত্যুপথযাত্রী কেউই মিথ্যা কথা বলে না। তাদের কথার সত্যতা ও যৌক্তিকতা রয়েছে। আমাদের অনুসন্ধানে তাদের বিষয় গুরুত্ব পাবে।’
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাদী যে কেউ হতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের স্বজন অথবা তৃতীয় কোনো পক্ষ; সবশেষ কাউকে না পাওয়া গেলে পুলিশ তো রয়েছে। তদন্তাধীন ঘটনা হওয়ায় এরচেয়ে বেশিকিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, কীভাবে এই কিশোররা হতাহত হলো তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের পরই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
এদিকে ওই ঘটনায় দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমাজসেবা অধিদফতর। শুক্রবার প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই কমিটি গঠন করা হয়। তিন কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির দুই সদস্য হলেনÑ সমাজসেবা অধিদফতরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) যুগ্ম সচিব সৈয়দ মো. নূরুল বাসির ও সমাজসেবা অধিদফতরের উপরিচালক (প্রতিষ্ঠান-২) এমএম মাহমুদুল্লাহ।
 ঘটনার পর বৃহস্পতিবার রাতে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি বন্দি কিশোররা তুলে ধরেন তাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা। তারা জানান, ঘটনার সূত্রপাত ৩ আগস্ট, ঈদের দুদিন পর। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের আনসার সদস্য নূর ইসলাম কয়েকজন কিশোরের চুল কেটে দিতে চান। কিন্তু কিশোররা চুল কাটতে রাজি না হওয়ায় তিনি কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেন, ওই কিশোররা নেশা করে। এর প্রতিবাদে ওই দিন কয়েকজন কিশোর তাকে মারধর করে।
আহত কিশোরদের দাবি, ওই ঘটনার সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে ১৮ জন বন্দিকে রুম থেকে বাইরে বের করে আনা হয়। এরপর বিকাল ৩টা পর্যন্ত পালাক্রমে তাদেরকে লাঠিসোটা, রড ইত্যাদি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। পালাক্রমে এভাবে মারধরের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের ফেলে রাখা হয়। পরে কয়েকজন মারা গেলে সন্ধ্যার দিকে তাদের লাশ যশোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বন্দি চুয়াডাঙ্গার পাভেল জানায়, ‘৩ আগস্টের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে আমাদের অফিসে ডাকা হয় এবং এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। আমরা ঘটনার আদ্যোপান্ত জানানোর এক পর্যায়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, প্রবেশন অফিসার মুশফিকসহ অন্যান্য স্যাররা মারধরে অংশ নেন।’
আহত আরেক কিশোর নোয়াখালীর বন্দি জাবেদ হোসেন জানায়, ‘স্যাররা ও অন্য বন্দি কিশোররা আমাদের লোহার পাইপ, বাটাম দিয়ে কুকুরের মতো মেরেছে। তারা জানালার গ্রিলের ভেতর আমাদের হাত ঢুকিয়ে তা বেঁধে মুখের ভেতর কাপড় দিয়ে এবং পা বেঁধে মারধর করেন। অচেতন হয়ে গেলে আমাদের কাউকে রুমের ভেতর আবার কাউকে বাইরে গাছতলায় ফেলে আসেন। জ্ঞান ফিরলে ফের একই কায়দায় মারধর করেছেন।’
যশোরের বসুন্দিয়া এলাকার বন্দি ঈষাণ জানায়, ‘নিহত রাসেল আর আমি একই রুমে থাকতাম। আগামী মাসেই তার জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। স্যারদের বেদম মারধর আর চিকিৎসা না পেয়ে সে মারা গেছে।’
সে অভিযোগ করে, ‘প্রবেশন অফিসার মারধরের সময় বলেন, তোদের বেশি বাড় বেড়েছে। জেল পলাতক হিসেবে তোদের বিরুদ্ধে মামলা করে ক্রসফায়ারে দেওয়া হবে।’ আহতরা জানায়, মারধর করে তাদের এখানে-সেখানে ফেলে রাখা হয়। পরে একজন করে মারা গেলে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। বৃহস্পতিবার রাত ৮-১১টার মধ্যে চার দফায় আহতদের হাসপাতালে আনা হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় পর সন্ধ্যা ৭টায় রাব্বি, সুজন ও নাঈমকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অমিয় দাস বলেন, দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি মরদেহ আসে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে। সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিটে নাঈম হাসান, সাড়ে ৭টায় পারভেজ হাসান এবং রাত ৮টায় আসে রাসেলের মরদেহ। এ চিকিৎসক বলেন, একজনের মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অন্যদের শরীরের আঘাতের কোনো চিহ্ন এখনও শনাক্ত হয়নি।
কেন্দ্রের প্রশিক্ষক মুশফিক দাবি করেন, কয়েকদিন আগে সংশোধনাগারে শিশুদের দুগ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়। ওই ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর আবার সংঘর্ষ হয়।
যশোর পুলিশের ডিএসবি ডিআই-১ পুলিশ পরিদর্শক এম মশিউর রহমান জানান, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে এই ঘটনা দুপুরে ঘটলেও লাশ হাসপাতালে আনা হয়েছে সন্ধ্যার পর। ঘটনা জানাজানির পর রাতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে যান যশোরের জেলা প্রশাসন তমিজুল ইসলাম খান, পুলিশ সুপার আশরাফ হোসেনসহ পুলিশের কর্মকর্তারা। মধ্যরাতে খুলনা থেকে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশের খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম নাহিদুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, বালকদের জন্য দেশে দুটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র আছে। যার একটি গাজীপুরের টঙ্গিতে, অন্যটি যশোর শহরতলির পুলেরহাটে। কিশোর অপরাধীদের জেলখানায় না পাঠিয়ে সংশোধনের জন্য এই উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়।










সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]