ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১ ১০ কার্তিক ১৪২৮
ই-পেপার সোমবার ২৫ অক্টোবর ২০২১

নবীজির হিজরত ও হিজরি ক্যালেন্ডার
আরিফ খান সাদ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০, ১০:১৭ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 486

ইসলামের ইতিহাসে মহানবী (সা.) হিজরতের ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নবুওতের ১১তম বছর নবীজি (সা.) প্রিয় জন্মভ‚মি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। মক্কার কাফের-মুশরিকরা ইসলামের উদীয়মান আলো নির্বাপিত করতে সব রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তার অনুসারীরা চরমভাবে নিগৃহীত ও নিপীড়িত হতে থাকল। সামাজিকভাবেও বয়কট করা হয়। অনেক পুরুষ ও নারী সাহাবিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে করতে তপ্ত মরুভ‚মিতে প্রকাশ্যে হত্যাও করা হয়। এমনকি আশৈশব আল-আমিন উপাধিতে ভ‚ষিত সমগ্র আরবজুড়ে পুণ্যবান হিসেবে স্বীকৃত নবী মুহাম্মদকে (সা.) হত্যা করে ইসলামের আলো চিরতরে নিস্তব্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
মক্কায় বিভিন্ন গোত্রের সামাজিক সমস্যা মীমাংসা ও শলাপরামর্শ করার জন্য ‘দারুণ নদওয়া’ নামে কাফেরদের একটি জায়গা নির্দিষ্ট ছিল। সেখানে প্রতিটি গোত্রের প্রধান ব্যক্তিরা জমায়েত হলো। কেউ কেউ পরামর্শ দিল, মুহাম্মদকে শৃঙ্খলিত করে কোনো ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত। কিন্তু কয়েকজন মতামত দিল, মুহাম্মদের সঙ্গী-সাথিরা হয়তো আমাদের কাছ থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এবং এর ফলে আমাদের পরাজয়ও ঘটতে পারে। তাই এ পরামর্শ বাতিল হলো।
কেউ কেউ পরামর্শ দিল, তাঁকে নির্বাসিত করা উচিত। কিন্তু তিনি যেখানে যাবেন, সেখানেই তাঁর অনুগামী বাড়তে থাকবে এবং আন্দোলনও যথারীতি সামনে অগ্রসর হবেÑ এ আশঙ্কায় এ পরামর্শও নাকচ করা হলো। অবশেষে আবু জাহেল পরামর্শ দিল, প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক মনোনীত করা হবে, তারা সবাই একসঙ্গে মুহাম্মদের ওপর হামলা করবে এবং হত্যা করবে। এর ফলে তার রক্তপণ সব গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাবে। আর সবার সঙ্গে একাকী লড়াই করাও হাশেমি গোত্রের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ অভিমত সবাই পছন্দ করল এবং শেষ পর্যন্ত এ কাজের জন্য একটি রাতও নির্দিষ্ট করা হলো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্মরণ কর, কাফেররা তোমাকে বন্দি বা হত্যা করার জন্য কিংবা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করে। তারা চক্রান্ত করে; আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী।’ (সুরা আনফাল : ৩০)
তাদের সব পরিকল্পনা আল্লাহ নস্যাৎ করে দেন। রাতেই আল্লাহ তায়ালা অহির মাধ্যমে এই চক্রান্তের কথা নবীজিকে (সা.) জানিয়ে দিলেন। হিজরতের নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজ বাড়িতে আপন চাচাতো ভাই হজরত আলীকে (রা.) নিজ বিছানায় রেখে আবু বকরকে (রা.) সঙ্গে নিয়ে মহানবী (সা.) মদিনার পথে রওনা হন। রওনা হওয়ার মুহূর্তে বাইতুল্লাহর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে মক্কা! আল্লাহর কসম, তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় শহর, আমার প্রতিপালকের কাছেও বেশি পছন্দের শহর তুমি। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বের করে না দিত, আমি কখনও বের হতাম না।’ (তিরমিজি : ৩৯২৫)
ইসলামের ইতিহাসের এ ঐতিহাসিক হিজরতের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছেন আল্লামা ইবনে কাসির রহ.। তিনি লিখেছেন, ‘মদিনায় সর্বপ্রথম হিজরত করেন হজরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। মহানবী (সা.) সাহাবাদের হিজরতের দুই মাস পর রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার হিজরত করেন। হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আবু বকর (রা.) ও তাঁর গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা ও পথনির্দেশক আবদুল্লাহ ইবনে আরিকত দুয়ালিও ছিলেন। তিনি বাইয়াতে আকাবার তিন মাস পর ২৭ সফর বৃহস্পতিবার রওনা দেন। তিন দিন গোপন থাকার পর সোমবার প্রথম রবিউল আউয়াল আবার রওনা দেন। সোমবার ১২ রবিউল আউয়ালে তিনি কুবায় পৌঁছেন। ১৪ দিন থাকার পর মসজিদে কুবা প্রতিষ্ঠা করে তিনি মদিনায় পৌঁছেন দ্বিপ্রহরের সময়।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩/১৮৮)। এভাবে অল্প কিছু সংখ্যক সাহাবি ছাড়া সবাই মক্কা পরিত্যাগ করে মদিনায় স্থায়ীভাবে পাড়ি জমান। এটাকেই হিজরত বলা হয় এবং হিজরতের এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফত অমলে ১৭ হিজরিতে হিজরি ক্যালেন্ডার চালু হয়।
হিজরি সন ও ক্যালেন্ডার প্রচলনে ওমর (রা.)-এর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। একটি নতুন সন গণনা ও ক্যালেন্ডার প্রচলনের কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ অনেক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী (রহ.) লিখেছেন, ‘হিজরি সন প্রণয়নের কারণ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ইবনে সমরকন্দি বলেন, হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে চিঠি লিখেছেন যে, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অনেক ফরমান আসে; কিন্তু তাতে তারিখ লেখা থাকে না। সুতরাং সময়ক্রম নির্ধারণের জন্য সন গণনার ব্যবস্থা করুন। তারপর ওমর (রা.) হিজরি সনের গোড়াপত্তন করেন। আল্লামা ইবনুল আসির (রহ.) ‘আল কামিল ফিত তারিখে’ এটিকে প্রসিদ্ধতম ও বিশুদ্ধতম অভিমত বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবুল ইকজান বলেছেন, হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে একটি দলিল পেশ করা হয়, যেখানে শুধু শাবান মাসের কথা লেখা হয়। তিনি বলেন, এটি কোন শাবান! এ বছরের শাবান, নাকি আগামী বছরের শাবান? তারপর হিজরি সন প্রবর্তন করা হয়। (আল কামিল ফিত তারিখ : ১/৮)
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ওমর (রা.) যখন বর্ষ গণনা পদ্ধতি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন তিনি পরামর্শসভার আহŸান করেন। সভায় হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত থেকে সন গণনার প্রস্তাব দেন। হজরত তালহা (রা.) নবুয়তের বছর থেকে সন গণনার অভিমত ব্যক্ত করেন। হজরত আলী (রা.) হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে বর্ষ গণনার প্রস্তাব দেন। তারপর তাঁরা সবাই আলী (রা.)-এর প্রস্তাবে ঐকমত্য পোষণ করেন। এরপর কোন মাস থেকে শুরু হবেÑ এ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) রজব থেকে শুরু করার প্রস্তাব দেন। কেননা এটি চারটি সম্মানিত মাসের মধ্যে প্রথমে আসে। হজরত তালহা (রা.) রমজান থেকে শুরু করার কথা বলেন। কেননা এটি উম্মতের মাস। হজরত আলী (রা.) ও উসমান (রা.) মহররম থেকে শুরু করার পরামর্শ দেন। (উমদাতুল কারি : ১৭/৬৬)
হিজরি বর্ষ গণনার ক্ষেত্রে হিজরতের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কী? অথচ মহানবী (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তিসহ আরও অনেক বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্ষ গণনা শুরু করা যেত। এ প্রশ্নের উত্তরে আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি (রহ.) লিখেছে, ‘সাহাবায়ে কেরাম বর্ষ গণনার ক্ষেত্রে হিজরতকে প্রাধান্য দিয়েছেন সুরা তাওবার ১০৮ নম্বর আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে। সেখানে প্রথমদিন থেকে তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদে নামাজ আদায় করতে বলা হয়েছে। এই ‘প্রথমদিন’ ব্যাপক নয়। এটি রহস্যাবৃত। এটি সেই দিন, যেদিন ইসলামের বিশ^জয়ের সূচনা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিরাপদে, নির্ভয়ে নিজ প্রভুর ইবাদত করেছেন। মসজিদে কুবার ভিত্তি স্থাপন করেছেন। ফলে সেদিন থেকে সন গণনার বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম মতৈক্যে পৌঁছেছেন। এ ছাড়া মহানবী (সা.)-এর জন্ম, নবুয়ত, হিজরত ও ওফাতÑ এ চারটির মাধ্যমে বর্ষ গণনা করা যেত। কিন্তু জন্ম ও নবুয়তের সন নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য আছে, আর মৃত্যু শোকের স্মারক। তাই অগত্যা হিজরতের মাধ্যমেই বর্ষ গণনা শুরু করা হয়। (ফতহুল বারি : ৭/২৬৮)
মহানবী (সা.)-এর হিজরতের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে আরবি রবিউল আউয়াল মাসে। তাহলে হিজরি ক্যালেন্ডারে প্রথম মাস হিসেবে মহররমকে নির্বাচন করার কারণ কী? এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, সাহাবায়ে কেরাম হিজরতের দিন থেকেই বর্ষ গণনা শুরু করলেন। আর মহররমকে প্রথম মাস হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। কেননা তৎকালীন আরবে মহররমই প্রথম মাস হিসেবে পরিচিত ছিল। জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে বিঘœ না হয়, সে জন্য এটিকে পরিবর্তন করা হয়নি। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৫১৩)।
আল্লামা ইবনে হাজর (রহ.) লিখেছেন, রবিউল আউয়ালকে বাদ দিয়ে মহররম থেকে সন গণনা শুরু করা হয়েছে। কেননা হিজরতের সূচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে মহররম থেকে। আর আকাবার দ্বিতীয় শপথও হয়েছে মধ্য জিলহজে। আর আকাবার দ্বিতীয় শপথ হিজরতকে ত্বরান্বিত করে। আর এ ভাঙা মাসের পর নতুন চাঁদ উদিত হয়েছে মহররম মাসে। তাই একে দিয়েই বছর গণনা শুরু করা হয়েছে। আমার জানা মতে, এটিই শক্তিশালী অভিমত। (ফতহুল বারি : ৭/২৬৮)। এ থেকেই বিশ^ মুসলিম উম্মাহ মহররম মাস থেকে নতুন বর্ষ গণনা করে আসছেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]