ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১ ৬ বৈশাখ ১৪২৮
ই-পেপার মঙ্গলবার ২০ এপ্রিল ২০২১

হালাল ট্যুরিজম: প্রমোটের সময় এখনই
মাহবুবুর রহমান তুহিন
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০, ৬:২২ পিএম আপডেট: ২৪.০৮.২০২০ ৬:৪১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 802

পর্যটন একদিকে দেশকে দেয় সমৃদ্ধি অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র দূরীকরণে রাখতে পারে বিরাট অবদান। তাই দেশকে এগিয়ে নিতে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। সময়ের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পর্যটন এখন শুধু দেশ দেখার মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। এখন হালাল ট্যুরিজম, রিলিজিয়াস ট্যুরিজম, হেলথট্যুরিজম, কালচারাল ট্যুরিজম, এডভেঞ্চার ট্যুরিজমহ নানা অনুষঙ্গে বিশ্বব্যাপি পর্যটন দুর্বার গতিতে বিকশিত হচ্ছে। এর মাঝে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায় পর্যটনের ক্ষেত্রে হালালট্যুরিজম একটি উপাদান হিসেবে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে।

মুসলিম পর্যটকদের প্রয়োজন আর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ‘হালাল ট্যুরিজম’ এর জন্ম, বিকাশ এবং প্রসার চলছে। ২০২৬ সালের মধ্যে এই বাজারের আয়তন হবে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গ্লোবাল মুসলিম ট্রাভেল ইনডেক্স (জিএমটিআই) ২০১৮ অনুযায়ী ক্রমবর্ধমান মুসলিম পর্যটক আয় বৃদ্ধি এবং হালালসেবা সহজলভ্য হওয়ার কারণে এই বাজার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলাম বর্তমান পৃথিবীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সর্বোচ্চ হারে ক্রমবর্ধমান ধর্ম।

ওআইসি (অর্গানাইজেশন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন) ভূক্ত রাষ্ট্রসমূহই শুধু হালাল ট্যুরিজমকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে তা নয়; এর বাইরে জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশগুলোও হালালট্যুরিজম নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। হালালটুরিজমের পূর্বশর্ত হচ্ছে হালাল খাবার, সালাত বা নামাজের জায়গার সহজলভ্যতা, পানিবান্ধব টয়লেট, রমজান পরিসসেবা, হালাল কার্যক্রম, হোটেল কক্ষগুলোতে কিবলা চিহ্নিত সুবিধা এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক সুযোগ বিদ্যমান থাকা। মাস্টারকার্ডের সহযোগিতায় জিএমটিআই প্রতিবছর সেরা মুসলিম টুরিস্ট ডেস্টিনেশন নির্বাচন করে থাকে। গত আট বছর ধরে মালেশিয়া শীর্ষমুসলিম ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসেবে তার আসন ধরে রেখেছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। এরপরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সউদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ওমান, মরক্কো এবং কুয়েত। ওআইসি দেশসমূহের বাইরে প্রথমেই সিঙ্গাপুরের স্থান। তারপরের অবস্থান থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, জাপান, তাইওয়ান, হংকং, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানী, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান। এখানে উল্লেখ্য ২০১৭ সালে ওআইসিভূক্ত দেশসমূহের মাঝে ৫৯.৮ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো ২১তম।

২০১৬ সালে ১.২৪ বিলিয়নের বেশি সংখ্যক পর্যটক বিশ্বব্যপী ভ্রমণ করেছেন। তারা ব্যয় করেছেন ১২২৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার। তবে বিশ্বপর্যটনে আজ বড় এবং প্রভাবশালী অংশ হচ্ছে মুসলিম ট্যুরিস্টরা।

২০১৪ সালে ১০ কোটি ৮০ লাখ মুসলিম পর্যটক ভ্রমণ করেছেন এবং তারা ব্যয় করেছেন ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা বিশ্ব পর্যটন বাবদ ব্যয় হওয়া মোট খরচের ১০ শতাংশ। আর ২০২০ সাল নাগাদ এই পর্যটকের সংখ্যা দাড়াবে ১৫ কোটি। তারা ব্যয় করবেন ২০ হাজার কোটি ডলার।  একই বছর বাংলাদেশ সফর করেছেন ৬৭ হাজার মুসলিম টুরিস্ট, যা বাংলাদেশ ভ্রমণ করা টুরিস্টের ১৯ শতাংশ।

হালাল ট্যুরিজম পর্যটনবান্ধন দেশগুলোতে আজ শুধু জনপ্রিয়ই নয়, রাস্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম দেশগুলোও বিশ্বপর্যটনে বাজার দখলের জন্য হালাল টুরিজমকে বিপণন করছে। শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতমান, কাম্বোডিয়া সাম্প্রতিককালের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

হালাল ট্যুরিজমের পাদপীঠ হতে পারে বাংলাদেশ। ৮৫ শতাংশেরও বেশি মুসলিম অধ্যুষিত এ দেশে হালাল ট্যুরিজম বিকাশের লীলাভূমি হতে পারে। হযরত শাহজালাল, শাহপরান, শাহ মাখদুম, শাহ আমানতের পূণ্যভূমিতে অসংখ্য পীর দরবেশ, আউলিয়া, সাধক জন্মেছেন তারা ইসলামের সাম্য-মৈত্রী ও সম্প্রীতির বাণী ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করেছেন। হালাল ট্যুরিজমের বিকাশে এসব মাজারকে পরিকল্পিত ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে গড়ে তোলা যায় সহজেই। টঙ্গীর তুরাগের পাড়ে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত যা বিশ্ব ইস্তেমা নামে পরিচিত; ইস্তেমায় আগত মুসল্লীরা হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটক। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রেকর্ড অনুযায়ি দেশব্যাপি মসজিদের সংখ্যা তিন লাখের বেশি। মসজিদের দেশ বাংলাদেশ। মূঘল, সুলতানী, নবাবী আমল ছাড়াও ইসলাম প্রচারের প্রথম দিগের বহু ঐতিহাসিক মসজিদ জালের মত ছড়িয়ে রয়েছে এখানে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সমাহারে নির্মিত মসজিদসমূহ হতে পারে মুসলিম পর্যটকদের অন্যতম সেরা গন্তব্য। প্রয়োজন শুধু উদ্যোগের। হালাল ছাড়া কোনো খাবার সাধারণভাবে বাংলাদেশে বিক্রি হয়না। এই দুটি ফ্যাক্টরকে বিবেচনায় নিয়ে ‘ক্রিয়েটিভ ক্যামপেইন’-এ গেলে আগামিতে বাংলাদেশ হালালটুরিজমে ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারে।

বাংলাদেশের মতো মালয়েশিয়াতে এত মসজিদ নেই। কিন্তু পাম্প স্টেশন, মার্কেট, অফিসসহ সবখানে নামাজের জন্য ছোট ছোট জায়গার ব্যবস্থা আছে। প্রতিটির হোটেল রুমের কক্ষে ‘কিবলা’ মার্ক করা বাধ্যতামূলক। অথচ বাংলাদেশকে এখন এই বিষয়ে আরো কার্যকরভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ গত ১২ মার্চ বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের গৌরবোজ্জল স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশকে এখন যে ১৭টি এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) অজর্ন করতে হবে তার মধ্যে ৮, ১২ ও ১৪ সরাসরিভাবে পর্যটনের সাথে যুক্ত। এক্ষেত্রে মুসলিম তথা হালাল টুরিজম নিঃসন্দেহে তাৎপর্যময় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

গত ৫-৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসির পর্যটন মন্ত্রীদের সম্মেলনে(আইসিটিএম) বাংলাদেশের বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়াও  গত ৫-৭ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। এ সম্মেলনে ঢাকাকে ‘সিটি অভ ট্যুরিজম’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে ওআইসিভূক্ত দেশসমূহের মানবসম্পদ উন্নয়নে ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব ইতিবাচক অনুষঙ্গ বিবেচনায়  হালাল ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করার এখনই সময়।

একজন পর্যটকের আগমনে ১১টি কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে যায়। পর্যটন বিমান পরিবহন, হোটেল, মানি এক্সচেঞ্জ, ট্রান্সপোর্ট, গাইড প্রভৃতি সেক্টরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত।তাই পর্যটন শিল্প এগিয়ে যাওয়া মানে এসব ইন্ডাস্ট্রি সচল থাকা। বাংলাাদেশের বিশাল সংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ খুজছে। এ ক্ষেত্রে পর্যটন হতে পারে অন্যতম  হাতিয়ার।

অর্থনৈতক সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস দূর করে  সৌহার্দ-সম্প্রীতি স্থাপনে হালাল ট্যুরিজম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, তথ্য মন্ত্রণালয়

 







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক: হারুন উর রশীদ, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড
এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]