ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা  বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০ ১৩ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার  বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০

হিরন আহমেদের নিপুন কারুকার্যের হস্তশিল্প
অরিন্দম মাহমুদ, নওগাঁ (ধামইরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২০, ৪:৫৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 575

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী। গান নাটক আর নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে নতুন কিছু সৃষ্টি করাই ছিল একমাত্র নেশা। তার এই উদ্ভাবনী চিন্তা চেতনা খুব সহজেই এলাকায় সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। তিনি দুই হাজার দশ এগারো সালে ঢাকায় এফডিসিতে লাইট গ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে তিনি লাইট গ্রাফারের পাশাপাশি ক্যামেরাম্যানের কাজও করেছেন। দুইহাজার আঠারো জানুয়ারিতে বাবা মারা গেলে আর ঢাকায় ফেরা হয়নি। ডিগ্রী পরীক্ষা আর দেওয়া হলনা তার। অতঃপর পড়াশোনার ইতি টানতে হয়েছে। আর সে কারণেই পরিবারের একমাত্র সন্তান হওয়ায় বোন আর মাকে নিয়ে সংসারের সকল দায়িত্ব বহন করতে হয়।

তবে তিনি হাল ছাড়েননি। প্রতিনিয়ত নতুন কিছু সৃষ্টির পেছনে ছুটে চলেছেন অবিরত। গ্রামের নিভৃত পল্লীতে এমন অসংখ্য তরুণ রয়েছে যাদের একটু পৃষ্ঠপোষকতা আর সাহায্য সহযোগিতা পেলে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও নিজের প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে দেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা এমন এক প্রতিভাবান তরুণ যুবক হিরন আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হয়।

শস্যভান্ডার খ্যাত ও ইতিহাস সমৃদ্ধ নওগাঁ জেলার  ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮-১০ কি, মি পশ্চিমে রাঙামাটি নামক বাজারে ছোট্ট একটি মাটির ঘরে নিজের হাতে শৈল্পিক কারুকার্যে গড়ে তুলেছেন বাঁশের তৈরি নানান রঙ্গের দৃষ্টিনন্দন হস্তশিল্প। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো  প্রশিক্ষণ ছাড়াই বাঁশ কেটে এত সুন্দর সুন্দর ঘর সাজানোর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করা যায় এখানে এসে স্বচক্ষে না দেখলে বর্ণনা করা অনেকটাই অসম্ভব। প্রতিভাকে ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করে দৃঢসংকল্প ও একাগ্রতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যায় তার একমাত্র বাস্তব নিদর্শন তরুণ যুবক হিরন আহমেদ।

এলাকার নিভৃত পল্লী রাঙ্গামাটিতে গিয়ে একটি মাটির ঘরের সামনে কিছু কাঁচা পাকা বাঁশ রোদে শুকাতে দেখা যায়। পেছনে ভাঙ্গাচুরা একমাত্র মাটির ঘরটি তার ব্যবসা কেন্দ্র। সেখানে টেবিলে থরে থরে সাজানো রয়েছে হরেক রকমের বাঁশের তৈরি ল্যাম্প, শোপিস, পানির বোতল, মগ, জগ, ডেস্ক কলমদানিসহ ফ্লাগ, এক্সট্রেসহ আরো অনেক কিছু। এগুলো তৈরি করার সময় প্রথমে বাঁশ কেটে তাকে ট্রিটমেন্টের জন্য তিন ধাপে রাসায়নিক উপকরণ দিয়ে তিনদিন ভিজিয়ে রেখে আয়ুকাল বাড়ানোর জন্য ৬০% রৌদ্রে শুকানো হয়। তারপর তা বিক্রয়ের জন্য উপযোগী হয়ে উঠলে কাস্টমারদের কাছে বিক্রি করা হয়।

ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে বাঁশের তৈরি এসব শোপিসের মূল্য খুব একটা বেশি নয়। প্রকারভেদে ল্যাম্পের মূল্য- ৮৫০-১৭০০ টাকা, শোপিস ১৫০-৩০০ টাকা, পানির বোতল ৩৫০-৮৫০, মগ ২৫০-৪০০, জগ ৫০০-১০০০ টাকা, ডেস্ক কলমদানিসহ ফ্লাগ ৮৫০-১৫০০ ও এক্সট্রে ১২০-৫০০ টাকায় বিক্রয় হতে দেখা যায়।

হিরন আহমেদের জন্ম ধামইরহাট উপজেলার ৩ নং আলমপুর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড দেউলবাড়ী গ্রামে। মনের মাধুর্য দিয়ে তিনি গ্রাফিক্সের কাজ করেন। কোথাও কোন কিছু দেখে ভালো লাগলে তা তিনি মনের ভেতরে গেথে রাখেন এবং ভাবেন তুলির আঁচড়ে আরেকটু রূপ দেওয়া যায় কিনা। সেই যে ভাবনা আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি।

হৃদ্ধতায় ভরা আলাপচারিতার মাঝে হিরন আহমেদ বলেন, একটা জিনিস আমার বারবার মনে হয়, কেউ কোন কিছু হুকুম করলে তাতে আমার রাগ হয় বিরক্তি হয়। নিজেকে মুক্তচিন্তার একজন মানুষ বলে মনে করি। একা একা ভাবি, আমার কিছু একটা করা উচিত। মনের মাধুরী দিয়ে নতুন কিছু একটা সৃষ্টি করা উচিত যা দৃষ্টিনন্দন এবং খুব সহজেই সাধারন মানুষ গ্রহণ করবে। শৈশবের এই ভাবনা থেকেই আমার এই সৃষ্টি। এটি আমার নেশাও বলতে পারেন। প্রথমে আমি ২৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করি। বর্তমানে এ শিল্পের পেছনে (যন্ত্রপাতি কিনতে) আমার প্রায় এক লক্ষ টাকা ইনভেস্ট হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালে প্রথম ঢাকায় অনলাইন সপথেকে মেশিন ক্রয় করে তা গুগল থেকে ডিজাইন করি এবং গ্রাফিক্সের কাজ করি। বিভিন্ন ডিজাইনের গ্রাফিক্সের ডিস্ক কিনে ইচ্ছেমত ডিজাইন তৈরি করে অনলাইনে বিভিন্ন উদ্যোক্তা গ্রæপের সাথে সংযুক্ত থেকে বর্তমানে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এছাড়াও আমার বাঁশ বিলাস নামে একটা ফেসবুক পেজ আছে সেখানে ঢাকা-বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার পাই। কুরিয়ারের মাধ্যমে আমি এসব স্থানে অর্ডারকৃত মালামাল বিক্রয় করি।

কথার ফাঁকে হিরন আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকার যুবকদের সংখ্যা অনেক বেশি। ছোট কাজের প্রতি তাদের যথেষ্ট অনীহা লক্ষ্য করা যায়। ছোট কাজ করবো এই ভেবে তাদের মধ্যে অহংকার কাজ করে। তাতে তারা শুধু বেকারই থাকছেন না দেশের বোঝা হয়েও থাকছেন। সে কারণে আমি বলি ছোট-বড় সকল কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাহলে আত্মনির্ভরশীল হওয়া তো দূরের কথা কেউ বড় হতে পারবে না।

হিরন আহমেদের স্বপ্ন এলাকায় তরুণ ছেলে মেয়েদের নিয়ে এ শিল্পকে আরো বিস্তৃত করতে কিন্তু তাতে তো অনেক অর্থের প্রয়োজন। সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে বেকার তরুণরা যেমন খুঁজে পাবে জীবিকার উৎস ঠিক তেমনি স্বনির্ভর হবে দেশ।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]