ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৪ আশ্বিন ১৪২৭
ই-পেপার মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

না বলা কথা নিয়ে চলে গেলেন
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১১:২৬ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে আখতার ফেরদৌস রানার লেখা আর জিয়া আনসারীর প্রযোজনায় ধারাবাহিক নাটক ‘জোনাকি জ্বলে’ প্রচারিত হচ্ছিল। এই ধারাবাহিক নাটকে একটি খল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সাদেক বাচ্চু। বায়তুল মোকাররমের কাছেই জিপিও। টিঅ্যান্ডটি কলোনি থেকে প্রায় প্রতিদিন হেঁটে অফিস করতেন সাদেক বাচ্চু। এক দিন অফিসে প্রবেশের মুখে তার ঘাড়ে এসে একটা কলার খোসা পড়ল। ফিরে থাকাতেই তিনি দেখলেন, কয়েকজন ফুটপাথের দোকানদার তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। তাদেরই একজন কলা খেয়ে খোসা ছুড়ে মেরেছে। এই কলার খোসা নিয়ে তিনি কোনো ধরনের হৈ চৈ করলেন না। আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে লম্বা বারান্দা পেরিয়ে নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন। বসে অনেকক্ষণ চিন্তা করলেন, কেন তার গায়ে এই কলার খোসা ছুড়ে মারল। অনেক সময় অফিসে এসেই এক কাপ চায়ের অর্ডার দেন। কিন্তু সেদিন চেয়ারে বসেই চায়ের অর্ডার দেননি। এমনকি পাশে বসা সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করেননি, কেমন আছেন। তার এই চুপচাপ স্বভাব দেখে বরং তার পাশে বসা সহকর্মী প্রশ্ন করল। নিজেকে কিছুটা সামাল দিয়ে তিনি স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখে বলেছিলেন, না কিছু হয়নি। আরেকজন সহকর্মী তো তার অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
এই ঘটনাটি শক্তিমান অভিনেতা সাদেক বাচ্চুর কাছ থেকে শোনা। এই ঘটনায় তিনি প্রথমে কিছুটা দুঃখ পেয়েছিলেন। পরে অবশ্য তার উপলব্ধিতে আসে এটাই তার অভিনয়ের পুরস্কার। ‘জোনাকি জ্বলে’ নাটকে তিনি যে অভিনয় করেছেন তা দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তা না হলে কেনই বা কলার খোসা ছুড়ে মারবে।
সাদেক বাচ্চুর কাছে এসে কেউ কখনও ইন্টারভিউ নিত না, এই দুঃখের কথা আমাকে প্রায় বলতেন। দুঃখ করে এক দিন বলেই বসলেন, আমি কি আসলে ওই বড় মাপের শিল্পী যে আমার ইন্টারভিউ নেবে। তার দৃষ্টিতে বড় মাপের অভিনেতা হচ্ছেÑ আনোয়ার হোসেন, গোলাম মুস্তাফা, খলিল, হুমায়ূন ফরীদি, আনোয়ারা, রওশন জামিল, দিলারা জামান, ইনাম আহমেদ, রাজিবসহ আরও অনেকে। নামের তালিকা কখনও প্রকাশ করতে চাননি। কারণ কারও নাম বাদ গেলে তিনি হয়তো দুঃখ পাবেন, নয়তো রাগ করবেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় করার জন্য অনেক প্রযোজকের কাছে ধরনা দিয়েছেন সাদেক বাচ্চু। কিন্তু বেশ কয়েকজন প্রযোজক তাকে অভিনয় করার সুযোগ দিয়েছেন। তবে সেই সুযোগে তিনি তার অভিনয়ের চরম উৎকর্ষ দেখাতে চেষ্টা করেছেন। জিয়া আনসারী যখন তাকে ‘জোনাকি জ্বলে’ নাটকে খল চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন অনেকেই তা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু জিয়া আনসারী সবার মুখের ওপরে বলেছেন, ‘পথের ধারে নাম হারা ফুল ফোটে কত রাত্রি দিনে, যে তারে চিনতে পারে দাম দিয়ে তারে কেনে...’।
শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে নিজেকে কখনও দাবি করেননি সাদেক বাচ্চু। তার সহজ-সরল ব্যবহার আর অভিনয়ের সহজাত চরিত্র তাকে অনেকদূর নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। মাঝেমধ্যে সাদেক বাচ্চু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে বাজার করতেন। তাকে দেখে অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা বিস্ময় প্রকাশ করত। সাদেক বাচ্চু এক সময় মুখ ফুটে বলেই ফেললেন, আরে আমি তো তোমাদের মতো একজন সাধারণ মানুষ।
সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার অবাধ বিচরণ ছিল তার প্রমাণ শান্তিবাগের চলাফেরা। এখানে একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করলেও তিনি প্রতিদিন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে বের হতেন। ভিকারুন্ননেসা স্কুল ঘুরে একেবারে বেইলি রোড হয়ে বাসায় ফিরতেন। চলার পথে যেই দেখেছে, তাকে সালাম দিয়েছে। আবার কখনও কখনও কেউ অন্যকে দেখানোর চেষ্টা করেছে।
এক দিন রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দিতে মানিব্যাগ বের করতেই রিকশাচালক বলল, স্যার ভাড়া লাগবে না। আপনার মতো মানুষ যে আমার রিকশায় চড়ছেন তাতেই আমি খুশি। সাদেক বাচ্চুকে একবার ঠাট্টা করে বলেছিলাম, আপনি রাজনীতি করেন। সাবলীলভাবে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেছিলেন, যার কাজ তাকেই মানায়। আমার দ্বারা রাজনীতি হবে না। প্রসঙ্গক্রমে অভিনেতা রাজীবের কথা উঠলে সাদেক বাচ্চু আবারও বললেন, এটা যার যার ব্যাপার। রাজীবকে তিনি অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। বলতেন, অন্যদেশে রাজীবের জন্ম হলে বড় ধরনের স্বীকৃতি পেতেন।
অভিনয় কার কাছে শেখা কিংবা অভিনয়ের জন্য কি প্রয়োজন, এসব প্রশ্নের উত্তরে সাদেক বাচ্চু বলেছিলেন, অভিনয় একেবারে সহজাত বিষয়। আর সমাজের বিভিন্ন মানুষের চরিত্র নকল করা। আর সেটা নিজের মধ্যে আত্মস্ত করা। তিনি বলেছিলেন, তবে মঞ্চ একটি বিরাট বিষয়। মঞ্চ পারে একজনকে বড় অভিনেতা করে তুলতে। কারণ সরাসরি দর্শকদের প্রতিক্রিয়া যখন নিজের মধ্যে সঞ্চালন হয় তখন উপলব্ধি করা যায় আসলে অভিনয় করা যাবে কি যাবে না।
করোনার এক মাস আগে সাদেক বাচ্চুর সঙ্গে দেখা, তাও আবার শান্তিবাগের মোড়ে। তার ইচ্ছা ছিল, কিছু কথা বলার। কিন্তু হলো না সেসব কথা শোনার। না বলা কথা নিয়েই চলে গেলেন, না ফেরার দেশে ১৪ সেপ্টেম্বর।






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]