ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা রোববার ১ নভেম্বর ২০২০ ১৭ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার রোববার ১ নভেম্বর ২০২০

মহামারির মধ্যে যেভাবে হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছানো যাবে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১১:৪১ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

বিশ^জুড়ে নতুন করোনাভাইরাসের মহামারি এখন সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনায়ও ‘হার্ড ইমিউনিটির’ ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সবারই আশা, এ ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জিত হলে সংক্রমণের গতি শ্লথ হয়ে আসবে অথবা দুঃসহ এই প্রাদুর্ভাবের অবসান ঘটবে।
কিন্তু কী এই ‘হার্ড ইমিউনিটি’। এই তত্ত¡ অনুযায়ী, যদি জনসংখ্যার ব্যাপক অংশের মধ্যে নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে, তখন ভাইরাসটি সহজে সংক্রমিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এ রকমটা হলে কেবল যাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো তারাই নয়, বেশিরভাগ মানুষই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা লাভ করবে।
দুই উপায়ে এই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জন করা যায়। এর একটি হলোÑ স্বাভাবিক সংক্রমণ, আরেকটি হলো টিকার প্রয়োগ। স্বাভাবিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভাইরাসবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে উঠতে হবে।
তবে নতুন করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এ ধরনের স্বাভাবিক সংক্রমণে সুরক্ষার ব্যাপ্তি ঠিক কতটুকু তা এখনও অজানা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, টিকা উৎপাদন ছাড়া কেবল স্বাভাবিক সংক্রমণের মাধ্যমে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের অপেক্ষা করলে তুলনামূলক বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটবে।
মেলবোর্নের ডেকিন বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অনুষদের মহামারি বিশেষজ্ঞ ক্যাথরিন বেনেট বলেন, এই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। যেহেতু আমরা ভাইরাসটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্বন্ধে খুবই কম জানি, তাই হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছানোর জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়া মেনে নিতে পারি না আমরা। অন্যদিকে টিকা বা প্রতিষেধক মিললে বেশ দ্রæতগতিতে এবং তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য উপায়েই বিপুলসংখ্যক মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করা যাবে।
এখন পর্যন্ত নতুন করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক পাওয়া যায়নি। তবে অনেক টিকার বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কিছু কিছু টিকা তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাও শুরু করেছে।
সাধারণত একটি ভ্যাকসিন বা টিকা উদ্ভাবন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উৎপাদন ও শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যায়।
করোনার টিকার ক্ষেত্রে দ্রæতগতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চ‚ড়ান্তভাবে সফল বলে বিবেচিত হওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক উৎপাদনের মাধ্যমে এই সময়সীমা কমিয়ে আনা যাবে বলে আশা বিভিন্ন ওষুধ ও টিকা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, টিকার মাধ্যমে যদি বিশে^র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তা হলেই ‘হার্ড ইমিউনিটি’র কাজ শুরু হয়ে যাবে।
তবে এক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার হারও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার হার যদি ৭০ শতাংশ হয়, তা হলেই সবচেয়ে ভালো হবে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
কীভাবে একটি টিকা সরবরাহ করা হচ্ছে, তার ওপরও এর কার্যকারিতা নির্ভর করে, বলছেন বিশ্লেষকরা। যদি অসমভাবে বণ্টন করা হয়, তা হলে টিকাটি খুব একটা কার্যকর হবে না।
ধরা যাক, একটি ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্র এলাকাগুলোর চেয়ে ধনী এলাকাগুলো বেশি প্রাধান্য পেল। সেক্ষেত্রে নিরাপদ কিছু ‘ক্লাস্টার’ বা ‘গুচ্ছ’ এলাকা বানানো সম্ভব হলেও, বাকি বিরাট অংশের জনগণকে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতেই থাকতে হবে।
টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রথম দিকে স্বাস্থ্যসেবা খাতের সঙ্গে জড়িত কর্মী, ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অগ্রবর্তী দলগুলোর সদস্য এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। অবশ্য এই ‘টার্গেটেড ভ্যাকসিনেশন’ প্রক্রিয়াতেও গণপরিবহন কর্মীদের মতো ‘সুপার স্প্রেডাররা’ বাদ পড়ে যেতে পারে।
মেলবোর্নের লা ত্রোভ বিশ^বিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক জোয়েল মিলার বলেন, ভ্যাকসিন যেন জনগণের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টন করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের। জোয়েল মূলত গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে সরকার ও বিভিন্ন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ ঠিক করতে সহযোগিতা করেন।
মানুষের চলাফেরা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলায় টিকাদান পর্বেও বিধিনিষেধ আরোপের প্রয়োজন পড়তে পারে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকাদানের প্রাথমিক পর্যায়েও টিকা না নেওয়া সেসব মানুষেরই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা
থাকবে, যারা ভ্রমণ কিংবা বেশি মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করবেন।
টিকা গ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা ধাপে ধাপে বাড়ানো হলেও, ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেই কেবল ভাইরাসে আক্রান্তের পরিমাণ কম হবে, বলছেন তারা।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন করোনাভাইরাস ছড়ায় আক্রান্তের কাশি, হাঁচি বা কথা বলার সময় নির্গত ড্রপলেট থেকে। ছোঁয়াচে এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে বিজ্ঞানীরা তাই মাস্ক পরা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং বেশি বেশি হাত ধোয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন। ভ্যাকসিন আসার আগ পর্যন্ত নিজেকে নিরাপদ রাখার এ চর্চা একদিকে সংক্রমণের হার কমাবে, অন্যদিকে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনেও ভ‚মিকা রাখবে, বলছেন তারা।
মহামারি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাকসিন মিললেই বিপদ শেষ, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। শুরুর দিকের টিকাগুলোর কার্যকারিতা ১০০ শতাংশ হবে না বলেও ধারণা তাদের; এ কারণে টিকার পাশাপাশি সংক্রমণ প্রতিরোধে যেসব পরামর্শ ও পদক্ষেপ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে সেগুলো প্রয়োগের গুরুত্বও স্বীকার করে নিয়েছেন তারা।
বলেছেন ডেকিন বিশ^বিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞ বেনেট বলেন, এটা আমাদেরকে কমিউনিটি পর্যায়ে ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেবে। ব্যবস্থার সংমিশ্রণ থাকলে পরিস্থিতি তুলনামূলক অনেক ভালো হবে। তবে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হলেই করোনাভাইরাসও মৌসুমি রোগে পরিণত হবে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে। কিন্তু যত দিন না বেশিরভাগ মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, তত দিন প্রায় সব ঋতুতেই এই ভাইরাসের প্রকোপ থাকবে, বলছে নতুন গবেষণা। ফন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ নামে প্রকাশিত ওই গবেষণার রিপোর্ট বলছে, একটা বড় অংশের মানুষের ক্ষেত্র যখন এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে, তখন সংক্রমণ নিজে থেকেই কমবে। আর তার জেরে করোনাও নির্দিষ্ট মৌসুমে দেখা দেবে। লেবাননে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বেইরুটের গবেষক হাসান জারাকেট বলেন, ‘ইমিউনিটি তৈরি হওয়া পর্যন্ত করোনা থাকবে এবং ছড়াবে। এটা মেনে নিয়েই বাঁচতে হবে। সংক্রমণ এড়াতে মাস্ক পরতে হবে। শারীরিক দূরত্ববিধি বজায় রাখতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতে হবে।’‌
গবেষকরা বলছেন, হার্ড ইমিউনিটি স্তরে পৌঁছানোর আগে সংক্রমণের অনেক ঢেউ আসতে পারে। আগের গবেষণার রিপোর্ট উল্লেখ করে তারা বলেছেন, শ^াসযন্ত্রে আক্রমণকারী সার্স কোভ-২-এর অন্যান্য ভাইরাসের প্রকোপও নির্দিষ্ট ঋতুতেই দেখা যায় নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে। যেমন শীতের সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি ছড়ায় সেখানে।
অন্যদিকে ক্রান্তীয় অঞ্চলে সারা বছরই অল্পবিস্তর সক্রিয় থাকে ওই ভাইরাস। বেশ কিছু মৌসুমি ভাইরাসের চরিত্র নিয়ে গবেষণা করে দেখা হয়। তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, তা নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা চলছে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]