ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর ২০২০ ১৪ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর ২০২০

পেঁয়াজে কেন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছি না?
বশিরুল ইসলাম
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১১:৩৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 27

ভারত আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়াই মাঝেমধ্যে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিচ্ছে। গত বছরও ভারত যখন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল, তার পরের প্রতিক্রিয়া তো সবার জানা। পেঁয়াজের দামের বিশ^রেকর্ড হয়েছিল। বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়েছিল, এমনকি ভিআইপি মর্যাদায় পেঁয়াজ এসেছিল বিমানে চড়েও। সম্প্রতি ভারত যখন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণার করল এরপর থেকেই অস্থির হয়ে উঠে পেঁয়াজের বাজার। কয়েক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে বর্তমানে দেশে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। পেঁয়াজ নিয়ে এ নাটক নতুন নয়। আমরা পেঁয়াজে স্বনির্ভর হতে পারছি না। আর সে পরনির্ভরতার সুযোগ নিচ্ছে অন্যরা। অথচ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সুযোগ আমাদের রয়েছে। সরকারি হিসাবে, দেশে প্রতিবছর ২৩ লাখ  টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। তবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ থাকে। অথচ চাহিদা রয়েছে ৩০ লাখ টন পেঁয়াজের। বাকি ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়, যার বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে। প্রতিবেশী দেশ, সড়কপথে দ্রুত আনা, কম দাম বিবেচনায় প্রধানত ভারত থেকেই বেশিরভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। এ আমদানি পরিহার করে দেশে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব। এ জন্য দেশের চাহিদার পুরোটা পূরণ করতে হলে দেশেই অন্তত ৩৫ লাখ টন পেঁয়াজের উৎপাদন করতে হবে। তাহলে যেটুকু নষ্ট হবে, তা বাদ দিয়ে বাকি পেঁয়াজ দিয়ে দেশের পুরো চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।
একসময় আমাদের চালের খুবই সঙ্কট ছিল। ভারত, ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করতে হতো। এখন আমাদের সঙ্কট নেই। ধারাবাহিকভাবে দেশে বেড়েছে চালের উৎপাদন। এ কারণে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে চাল উৎপাদনে বিশে^র তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। গরু নিয়েও আমাদের অভিজ্ঞতা তিক্ত। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে গরু রফতানি বন্ধ করে দেয়। এখন সরকারের বিশেষ উদ্যোগে দেশে পর্যাপ্ত গরু উৎপাদন হচ্ছে। সঙ্কট থেকে যে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে, তার বড় উদাহরণ বাংলাদেশের গবাদিপশু খাত। পাঁচ বছর আগেও দেশের চাহিদার বড় অংশ মিটত প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করে। এখন আমাদের গরুর চাহিদা আমাদের খামারিরাই মিটিয়ে দিচ্ছে। দেশে একসময় ইলিশের অভাব ছিল। এখন সঙ্কট নেই। পৃথিবীতে ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন শীর্ষে। অন্যান্য মাছের চাহিদাও চাষের মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে। মাছ চাষেও আমরা চতুর্থ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে দশ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছেÑ পেঁয়াজ কেন এখনও ভোগাচ্ছে! আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে?
আমার মতে চাল, গরু, মাছ সমস্যার সমাধান আমরা যেভাবে করেছি, সেভাবে পরিকল্পনা করলে শতভাগ পেঁয়াজ দেশেই উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পেঁয়াজের গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন যে জাতগুলো উদ্ভাবন করেছে, সেগুলো নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর মাঠপর্যায়ে ব্যাপকহারে কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। শীতকালের চাষকৃত পেঁয়াজ দিয়েই আমাদের ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয়। যেহেতু দরকার মাত্র ৩০ শতাংশ, তাই একটা নির্দিষ্ট জোন বা এলাকায় চাষ করলেই চলে। কোন কোন এলাকায় চাষ করা হবে আর কীভাবে কৃষকদের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে আগ্রহী করে তুলতে হবে, সেটার জন্য পথ খুঁজে বের করতে হবে সংশ্লিষ্টদের। আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে বারি পেঁয়াজ-২ এবং ৩ বিশেষভাবে চাষ করার জন্য উদ্ভাবন করেছে বিজ্ঞানীরা। এসব পেঁয়াজের বীজ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহের ভেতর জমিতে বুনতে হয়। গ্রীষ্মকালীন চারা মাঠে লাগানোর ৮০ থেকে ৯০ দিনের ভেতর পেঁয়াজ সংগ্রহ করার উপযোগী হয়ে যায়। ফলে জুলাই-আগস্ট মাসের ভেতর সংগ্রহ করে ফেলা সম্ভব। যা শীতকালীন পেঁয়াজ সংগ্রহ করার চার মাস আগেই পাওয়া যায়। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ বর্ষাকালেও চাষ করা যায়। এক্ষেত্রে বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে চারা উৎপাদন করতে হয়। উঁচু জমি হলে ভালো হয়। যাতে জমিতে পানি জমতে না পারে। জুলাই থেকে আগস্ট মাসে চারা করে সেপ্টেম্বর মাসেই চারা মূল জমিতে লাগানো যায়। এতে করে অন্তত দুই মাস আগেই পেঁয়াজ সংগ্রহ করা যায়। বর্ষাকালে লাগালে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ জাতগুলো ৫০ থেকে ৫৫ দিন পরেই সংগ্রহ করা যায়। এর ফলে দেশে শতভাগ পেঁয়াজ উৎপাদন সম্ভব।
দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী প্রধান এলাকা পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, মাগুরা, বগুড়া ও লালমনিরহাট। এসব এলাকায় কৃষকদের গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে বেশি উৎসাহ দিতে হবে। সর্বোপরি, সঠিক নিয়মানুযায়ী গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করা গেলে আমদানি নির্ভরশীলতা শূন্য শতাংশে নেমে আসবে। সেই সঙ্গে আমরা পেঁয়াজ উৎপাদনেরও স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করব। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর পেঁয়াজের জাত উন্নয়নের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো। তাহলে দেশি পেঁয়াজ দিয়েই আমরা দেশের
চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব।

ষ জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত)
 শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]