ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০ ১৬ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০

পর্যটন শিল্পের বিকাশে যা প্রয়োজন
আফতাব চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১০:১৫ পিএম | প্রিন্ট সংস্করণ  Count : 16

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে পর্যটন শিল্পের ভ‚মিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশে^ অনেক দেশের জাতীয় আয়ের বড় অংশ আসে পর্যটন শিল্প থেকে। এ ছাড়াও বিদেশিদের কাছে স্বদেশের সৌন্দর্য ও ভাবমূর্তিকে তুলে ধরার সহজ উপায় হলো পর্যটন শিল্পের প্রসার। পর্যটনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে। এভাবে পর্যটন শিল্পে উন্নত সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হয়। পর্যটন শিল্প থেকে বিপুল আয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও আমাদের দেশে পর্যটন শিল্প সেভাবে গড়ে উঠেনি।
গোটা বাংলাদেশেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো প্রচুর দর্শনীয় স্থান রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের কুয়াকাটা যার সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে সারা বছরই দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা আসেন। প্রকৃতির হাতে গড়া সুন্দরবন দেখার জন্য বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা আসে। সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণের আকর্ষণ বিশ^ব্যাপী। আকর্ষণীয় স্থান নীলফামারীর নীলসাগর। শীতকালে মনোহারিনী নীল সাগরে সুদূঢ় সাইবেরিয়া এবং তিব্বতের মতো সফেদ তুষার রাজ্য থেকে নানা প্রজাতির হাজার হাজার পাখি উড়ে আসে। তাদের কোলাহলে সরব থাকে এ নীল সাগরের তীর। তা ছাড়া দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় বহু দুর্লভ পুরাকীর্তি আবিষ্কৃত হওয়ায় পর্যটকদের দৃষ্টি সেদিকে কেড়ে নিচ্ছে। দেশের প্রায় সর্বত্রই রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। রয়েছে জাতির কৃতী সন্তানদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। দেশের উত্তরাঞ্চলে অর্থাৎ কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামন থানার ঐতিহাসিক ‘দিল্লির আখড়া’র খবর আমাদের কজন রাখে। অথচ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা পাঠে এ আখড়া সম্পর্কে জানা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে ২২৬ একর জমি সম্রাট জনৈক ফকিরকে দান করেন এবং এ জমির ওপর সম্রাট একটি উপাসনালয় নির্মাণ করে দেন। পরবর্তীকালে এটাই ‘দিল্লির আখড়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে এবং আজ পর্যন্ত স্থানীয় লোকদের কাছে সে নামেই পরিচিত। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে প্রাচীনকালের হিজল গাছ ঘেরা দিল্লির আখড়া এখনও স্থানীয় লোকদের আকর্ষণ করছে। অনুরূপভাবে দেশের প্রায় জেলাতেই রয়েছে দর্শনীয় স্থান, রয়েছে ঐতিহাসিক মর্যাদা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। যেমনÑ পাবর্ত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই, চট্টগ্রামের ফয়েজ লেইক, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিল, কর্ণফুলী নদীর অপূর্ব দৃশ্য, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, বিশে^র দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর, মাধবকুÐ ও হামহাম জলপ্রপাত, জাফলং, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের সৌন্দর্যের লীলাভূমি চা-বাগান, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, চলনবিলসহ সারা দেশে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। এসব স্থানে যাতায়াত এবং থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা না থাকায় লোক চক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
রয়েছে সিলেটের শাহজালাল, শাহপরান, চট্টগ্রামের বায়জীদ বোস্তামী ও বাগেরহাটের খান জাহান আলীসহ অসংখ্য পীর দরবেশ ও আওলিয়ার মাজার, সিলেটকে ব্রিটিশদের দখলমুক্ত রাখতে গিয়ে সৈয়দ হাদি ও সৈয়দ মেহদীর মাজার যারা ১৭৮২ সালে আশুরার দিনে ব্রিটিশদের হাতে শহীদ হন। রাঙামাটি দেশের অন্যতম পর্যটনের আকর্ষণীয় স্থান। এখানে আছে পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু, কৃষি খামার, শুভলং ঝরনা ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য, পেদা টিংটিং রেস্টুরেন্ট, সাংফাং রেস্টুরেন্ট, চাকমা রাজার বাড়ি, রাজ বনবিহার, উপজাতীয় জাদুঘর, জেলা প্রশাসকের বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধিসৌধ এবং উপজাতিপাড়া ও জীবনযাত্রার দৃশ্য। কাপ্তাই লেকের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ শুভলং ঝরনা ও এর আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য কার না মন কাড়ে। বর্ষায় ঝরনাটি পরিপূর্ণ রূপ মেলে ধরে। চারদিকে বিশাল সবুজ পাহাড়ঘেরা এ ঝরনার পানি পতনের দৃশ্য সত্যিই অপরূপ।
পর্যটনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পর্যটন করপোরেশনকে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমÐিত বহু জায়গা রয়েছে যেখানে
কৃত্রিম উপায়ে হ্রদ সৃষ্টি করে তাতে নৌ-বিহার ও মৎস্য চাষের ব্যবস্থা করা যায়। এসব করতে হলে সরকারিভাবে ভ‚মি দখল করে জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে সরাসরি পর্যটন করপোরেশনের অধীনে আনা যায়। অথবা নির্বাচিত স্থানের মালিকদের সমবায় সমিতি গঠন করে প্রকল্পের মাধ্যমেও করা যায়। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থাও করতে হবে। বিশেষ করে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগ ছাড়া উন্নয়ন প্রচেষ্টা সফল হয় না। পর্যটন নীতি যদি এই হয় যে, সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাবে, তাহলে দেশে পর্যটন শিল্প দ্রæত বিস্তার লাভ করবে, দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিবছরই অধিক হারে পর্যটক আসতে থাকবে। অবশ্য ইদানীং দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারিভাবে আকর্ষণীয় পর্যটন সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে।
পর্যটন শিল্প শুধু বিদেশিদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে এমন নয়। দেশের নাগরিকরাও দেশের দর্শনীয় স্থানসমূহ দেখতে উদগ্রীব হয়। এ থেকেও পর্যটনের আশাতীত হওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু প্রশ্ন একটাই-জীবনের নিরাপত্তা আছে কি না। দেশে নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু আগ্রহেচ্ছু ভ্রমণকারী ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে চায় না। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয় যে, আমাদের দেশে অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে দেশের সর্বত্র অবাধে ভ্রমণ করা যায়। কিন্তু বর্ষাকালে সর্বত্র যাওয়া যায় না। নৌপথে সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকলে ভ্রমণকারীদের বিশেষ অসুবিধা হয় না। বাংলাদেশে সফর করার জন্য বর্তমান সময় অত্যন্ত সুসময়। দেশের স্কুল-কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্যও এটা উপযুক্ত সময়। এ সময় বহু ছাত্রছাত্রী দেশের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে আগ্রহী হয়।
কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার দরুন তাদের অভিভাবকরা তাদের যেতে দেন না। অবশ্য এ ব্যাপারে পর্যটন কর্তৃপক্ষ যদি দেশের ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ সুবিধা দানসহ বাসের ব্যবস্থা করেন, তাহলে শীত মৌসুমে বহু ছাত্রছাত্রী ভ্রমণে উৎসাহিত হবে এবং পর্যটনের আয় অনেক বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের পর্যটন সম্পর্কে যতটুকু প্রচার চালানো হচ্ছে, শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তা অপ্রতুল বলেই মনে হয়। পর্যটনের প্রতি দেশবাসীকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে আরও ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন। সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন যা পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের মূল ভিত্তি। বিষয়গুলোর প্রতি সরকারের বিশেষ করে পর্যটন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]