ই-পেপার বিজ্ঞাপনের তালিকা সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২০ ১১ কার্তিক ১৪২৭
ই-পেপার সোমবার ২৬ অক্টোবর ২০২০

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস আজ
বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ে বেকায়দায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:৩২ এএম | অনলাইন সংস্করণ  Count : 106

জলাতঙ্ক রোধে কুকুর নিধনের ফল শূন্য
দেশে বছরে ১শ’র কম লোক মারা যায় জলাতঙ্কে
বেওয়ারিশ কুকুরকে বন্ধ্যাকরণের বিকল্প নেই
তিন রাউন্ড টিকায় কুকুর থেকে সংক্রমণের হার শূন্য : বিশেষজ্ঞ


কুকুরের পক্ষে-বিপক্ষে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কেউ রাজধানী থেকে কুকুর নিধন চান, অনেকে আবার কুকুর বসবাসের পক্ষে লড়ছেন। অপসারণের পক্ষের লোকজন বলছে, একমাত্র কুকুরের মাধ্যমেই জলাতঙ্ক ছড়ায়। তাই জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কুকুর নিধনের বিকল্প নেই। তবে জলাতঙ্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্কের আতঙ্ক আগের চেয়ে কমছে। কুকুর নিধন করে জলাতঙ্ক রোধ সম্ভব নয়। বেওয়ারিশ কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের মাধ্যমে তা নিরসন করতে হবে।
বিশ^ জলাতঙ্ক দিবস আজ। বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর দিবসটি পালন করা হয়। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘জলাতঙ্ক নির্মূলে টিকাদান, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ান’। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধ ও নির্মূলের লক্ষ্যে ২০০৭ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। দিবসকে সামনে রেখে সরকার, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
জলাতঙ্ক নিয়ে কাজ করা স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক কুকুরের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে স্বস্তির খবর হলো চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মারা গেছে ২০ জন, যা গেল বছর ছিল ৫৪ জন। ২০১৮ সালে মারা ৫৮ মারা যায়। যেখানে ২০১১ সালে ছিল মৃতের সংখ্যা ছিল ১শ’র ওপরে। আর কুকুরের কামড়ে গেল বছর আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৩ লাখ। তবে ২০১৮ সালের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। ঢাকায় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, জলাতঙ্কজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২০০৯ সালে আনুমানিক ২০০০-এর অধিক থেকে কমে ২০১৯ সালে সারা দেশে ২০০-তে নেমে এসেছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল মৃত্যুর সংখ্যা ২০০৯ সালে ১৪৮ থেকে ২০১৮ সালে শতকরা ৬৮ ভাগ কমে ৪৯-এ নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার এমডিভি এক্সপার্ট ডা. মো. কামরুল ইসলাম সময়ের আলোকে জানান, দেশ থেকে জলাতঙ্ক নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন কুকুরকে জলাতঙ্ক থেকে নিরাপদ করা। কোনো এলাকার শতকরা ৭০ ভাগ কুকুরকে ব্যাপক হারে টিকা দিলে ওই এলাকার কুকুরের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়। ৩ বছর পরপর তিন রাউন্ড টিকা দিলে কুকুর থেকে মানুষ বা কুকুর ও অন্যান্য প্রাণীতে সংক্রমণের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এই বিশেষজ্ঞের মতে, কুকুর মেরে কিংবা অপসারণ করে জলাতঙ্ক নির্মল করা যাবে না। কুকুর মেরে এর সংখ্যা কমানো যায় না। বেওয়ারিশ কুকুরকে জলাতঙ্কনিরোধী টিকা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা ২০২০-২১ সালে ৪টি জেলায় প্রথম রাউন্ড ও ১৬টি জেলায় দ্বিতীয় রাউন্ড আরও আনুমানিক ৫ লাখ কুকুরকে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এদিকে অনেক গবাদি পশুও জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তবে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১০-১২ সাল পর্যন্ত জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ১৪৭ থেকে ১ হাজার ৪৪৫-এ নেমে এসেছে। ২০১০ সালের আগে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেত। জলাতঙ্ক নির্মূলে ব্যাপক হারে টিকাদান কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৯ পর্যন্ত সব সিটি করপোরেশনে ও ৩৯ জেলায় ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৬৮৫টি কুকুরকে এক রাউন্ড টিকা দেওয়া হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাকি ২৫ জেলায় আরও আনুমানিক ৬ লাখ কুকুরকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশে^ প্রতি ১০ মিনিটে ১ জন ও বছরের ৫৫ হাজার মানুষ এ রোগে মারা যায়। ২০৩০ সাল হবে কুকুর কামড়জনিত জলাতঙ্কমুক্ত বিশ^। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের হিসাবে, ওই হাসপাতালে প্রতিদিন ঢাকা ও আশপাশ এলাকার দুশতাধিক মানুষ কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসে। ২০১৮ সালে কুকুরের আক্রমণে আহত ৮১ হাজার রোগী সেবা নিয়েছে হাসপাতালটিতে। ২০১৯ সালে রোগী ছিল ৭৬ হাজার। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৩৬ হাজার লোক কুকুরের আক্রমণের পর সেবা নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুর কামড়জনিত জলাতঙ্কমুক্ত বিশ^ গড়া। জলাতঙ্ক রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় সর্বোচ্চ। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কুকুর অপসারণ যে উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কুকুর নিধনের বিষয়টি ‘নিষ্ঠুর’ উল্লেখ করে দেশের বিশিষ্ট ১৫ লেখক-শিল্পী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অপসারণকালে মাত্রাতিরিক্ত সিডেটিভ শরীরে প্রবেশ করিয়ে অর্ধমৃত কুকুরগুলোকে মাতুয়াইল বর্জ্য নিক্ষেপস্থলে ফেলে দিয়ে আসছে। এতে বিপুলসংখ্যক কুকুরের মৃত্যু হচ্ছে। তাই কুকুর নিধন নয়, কুকুর প্রতিপালনই দায়িত্ব। নগর কর্তৃপক্ষ অবশ্যই নগর কুকুর ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করার লক্ষ্যে বন্ধত্ব্যকরণ ও ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
সব মিলিয়ে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কুকুর রাখার পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা কর্মসূচি। লিখিত আবেদন পড়েছে দুপক্ষেই। ‘প্রাণবিক ঢাকা’ গড়ে তোলার দাবিতে পথে নেমেছেন কুকুরপ্রেমীরা। পরিস্থিতি বিবেচনায় কুকুর নিধনের পথে না গিয়ে স্থানান্তর ও বন্ধ্যাকরণের পথে হাঁটছে দুই সিটি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৩০ হাজার বেওয়ারিশ কুকুর ধাপে ধাপে ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেওয়ারিশ কুকুর বন্ধ্যাকরণের। ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, কুকুর স্থানান্তর করলে সমস্যার সমাধান হবে না। দেশের ২০১৯ সালের আইনে কুকুর বা বন্যপ্রাণীকে কীভাবে দেখতে হবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ করতে হবে। তাদের জলাতঙ্কের ইনজেকশন দিতে হবে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব কমাতে স্থানান্তর না করে সেগুলোকে বন্ধ্যা করা যেতে পারে। পরিবেশ আইনবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ২০১০ ও ২০১২ সালের আগে অনেকবার কুকুর নিধন করা হয়েছে। এতে কোনো লাভ হয়নি। এর চাইতে বন্ধ্যত্ব করা হলে বৈজ্ঞানিক মানবিক যৌক্তিক সমাধানে আসা যাবে। কুকুর নিধন চলছে গায়ের জোরে। সিটি করপোরেশন যা করছে তা অমানবিক, অবৈজ্ঞানিক ও বেআইনি। সমস্যা সমাধানের সহজ উপায় হচ্ছে কুকুরের বন্ধ্যাত্বকরণ এবং কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া। পশুপ্রেমীরা বলছেন, কুকুর নিধন এবং অপসারণ বেআইনি। পশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার (পিএডব্লিউ) ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রাকিবুল হক এমিল বলেন, কুকুর অপসারণ না করে বন্ধ্যাত্বকরণ টিকা দিলে কুকুরগুলো নগরবাসীকেও বিরক্ত করবে না। তবে যত্রতত্র বেওয়ারিশ কুকুরের ঘোরাঘুরি নিরাপদ সড়কের বড় অন্তরায়। বিশেষ করে বেওয়ারিশ কুকুরের কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা খুবই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও অভিযোগ করছেন অনেকে পথচারী। জানা গেছে, ২০১২ সালে উচ্চ আদালত কুকুর নিধনের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারির পর ওই বছরের মার্চ মাসে অভয়ারণ্য নামে একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) সঙ্গে চুক্তি করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ওই বছর ১ এপ্রিল থেকে তারা কার্যক্রম শুরু করে। চুক্তির শর্তানুযায়ী বেওয়ারিশ কুকুর নিধন না করে বন্ধ্যাকরণ এবং টিকাদানের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় কুকুর নিয়ন্ত্রণ করে।





সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, নির্বাহী সম্পাদক : শাহনেওয়াজ দুলাল, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড-এর পক্ষে
প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫। ই-মেইল : [email protected]